শেখ মিন্নাতুল মকসুদ অর্চি
অর্ক বসে আছে গ্রাম্য অজ-পাড়া গাঁয়ের একটা ভূতুড়ে রেলস্টেশনে। এ গ্রামে এসেছিলো সে এবং তার তিনজন বন্ধু।গ্রাম্য পরিবেশ অনেক দিন পর দেখার সুযোগ হবে এটা ভেবেই অর্ক তার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে গ্রামে চলে এলো। আসলে শহরের ইট-পাথরের দালানের মাঝখানে কোথায় যে তার মন টা আটকে গেছে সে তা খুঁজেই পাচ্ছে না।তাই গ্রামে এসেছিলো মন সজীব করতে।হটাৎ করেই প্লেন ছাড়া গ্রাম সম্পর্কে না জেনেই গ্রামে আসাটা সবচেয়ে বড় ভূল।তবে তারা এসেছিলো একটা প্রাইভেট কার নিয়েই।কিন্তু দূরভাগ্য বশত অর্কর বন্ধুরা প্রাইভেট কার দিয়ে আবার শহরে চলে গেলেও অর্ক শহরে যেতে পারে নি।এখন বসে বসে গ্রাম দেখার মাসোল দিতে হচ্ছে। এমন জন-মানবহীন রেল-স্টেশন অর্ক আগে দেখে নি।জনশুন্য রেল-স্টেশনে একজন স্টেশন মাস্টার পর্যন্ত নেই।স্টেশনের বামদিকে পল্লীগ্রাম বাংলা আর ডাকদিকে বিস্তৃত ঘন জঙ্গল। রেল-স্টেশনটাও অনেক পুরনো ভাঙা, ভিতরে গাছ লতাপাতায় ভরে গেছে। জঙ্গল আর রেল-স্টেশনটা ভূতুড়ে কিনা তাই গ্রামের কোনো মানুষ বিশেষ প্রয়োজন না হলে এখানে আসে না।এই রেল-স্টেশনে নাকি একটা মাত্রই ট্রেন থামে। আর তারও কোনো সময় নেই,যখন খুশি তখন আসে।একজন স্টেশন মাস্টার আছেন তিনি মাঝেমধ্যে সপ্তাহে একবার আসেন এখানে।জনশূন্য জায়গায় অর্ক বসে বসে চিন্তা করছে কি করা যায় তখন হটাৎ করেই কে একজন বলে উঠলো, শহরের ভাইজান, একটু হুনবেন আমার কতা।
অর্ক চমকিত স্বরে বলে উঠলো, কে?
লোকটি: ভাইজান আমারে আফনি চিনবেন না,আমি রহিম মিয়া।
অর্ক: তুমি কি কিছু বলতে চাও আমাকে?
রহিম: জ্বি চাই।
অর্ক: কি বলতে চাও আমার মত নরাধম মানুষকে। নিশ্চয়ই আমি তোমার কোনো কাজে আসবো না।
রহিম: জ্বে,মানে আমি ঐ জঙ্গলে র শেষের যে গ্রামটা আছে ওখানে থাকি।আপনার সাথে দেহা করবার আইলাম।ভাইজান একলা জঙ্গলের মধ্যে বইসা আছেন,ডর করে না? জঙ্গলে তো জ্বিন -পেরেত আছে।রহিমের কথা শুনেই বুঝা যাচ্ছে কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া রহিম এই জঙ্গলে অর্কর কাছে আসে নি।জ্বিন- পেত্নির বিশ্বাসে সে ভীষণ বিশ্বাসী। বর্তমান বিশ্বে যেখানে মানুষ অনেকজন ঈশ্বর বিশ্বাস করছে না সেখানে এরা জ্বিন প্রেত মানে, এতেই বুঝা যায় এরা কতটুকু বিচ্ছিন্ন শহর সমাজ থেকে। অর্ক বললো, বলো তোমার সমস্যার কথা, কি কথা বলার জন্য এত কষ্ট করে আমার কাছে এলে।
রহিম বড় বড় চোখ করে বললো, আফনে কেমনে বুঝলেন আমি আফনেরে কিছু কথা কয়নের জন্যে আইছি? হঙলে তাইলে ঠিক কইছিল সবাই কি বলেছে কে জানে!অর্ক মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন বোধক চিহ্ন এঁকে বললো, আচ্ছা তুমি কি বলবে তা আগে বলো।আর ঠিক স্পষ্ট করে বলো তো তুমি কি চাও? তুমি বিনা সংকোচে আমারে বলতে পারো।
রহিম: বলবো ভাইজান,আফনে হুনবেন আমার কতা?
অর্ক: হ্যাঁ শুনবো। উন্নত বিশ্ব এখন মানুষ দরকারেও একে অন্যের সাথে কথা বলছে না আর তুমি ইচ্ছাকৃত ভাবে কথা বলতে চাইছো আমি তা শুনবো না,বলো তুমি কি বলবে?
রহিম গ্রাম্য মূর্খ একটি ছেলে।কথা বার্তা কিছুই গুছিয়ে বলতে পারে না তার উপর অর্ককে দেখে তার ভিতর কি ভয় ঘুরপাক খাচ্ছে কে জানে! তবুও সে শান্ত গলায় বললো, ভাইজান আমি আফনের কাছে একটা দিন চাই ভাইজান।আফনেরে আমার লগে এক জায়গায় যাইতে হইবো আর মেলা কথা আছে সেগুলো হুনতে হইবো। কথাগুলো বলে হটাৎ করেই রহিম অর্ক এর পা ধরে কেঁদে বলে উঠলো, ভাইজান আমাগো গেরাম ডারে আফনে বাঁচান।
অর্ক লাফিয়ে উঠে বললো, আরে আরে পা ছাড়ো বলছি।পা ধরেছো কেন? আমি কি তোমার কথা শুনবো না বলেছি,এই উঠো বলছি।
রহিম আনন্দিত স্বরে বললো, আমাগো বাঁচাইবেন! তবে চলেন আমার লগে।
অর্ক কি করবে ভেবে পেলো না, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে রহিম তাকে।যাওয়াটা কি তার উচিত হচ্ছে কিন্তু না গিয়েইবা কি করবে অর্ক।তাছাড়া অর্ক ও একটা ঘোরের মধ্যে আছে।একবার ভাবলো, না যাবে না যদি ট্রেন মিস করে আরেকবার ভাবলো না জীবনে কত ট্রেনই তো মিস করলো সে আরেকবার না হয় এই সহজ সরল রহিম ও গ্রামের মানুষ গুলো আর তাদের ভিতর লুকিয়ে থাকা রহস্যের জন্য ট্রেন মিস করবে সে।অর্ক শান্ত গলায় বললো, চলো,রহিম যেতে যেতে তোমার কথা শুনি।
আনন্দে রহিমের চোখ গুলো চকচক করে উঠলো। কান্না থামিয়ে চোখের জল মুছে একটা বোকা হাসি হেসে বললো, চলেন ভাইজান,চলেন।
দুজন ই হাটছে পাশাপাশি। এক সময় রহিম তার কথা গুলো বলা শুরু করলো, জানেন ভাইজান আমাগো গেরামে একটা মাইয়া আছে তার কথাই বলবো আফনারে।মাইয়াডার নাম হইলো হাসি।আমাগো গেরামের আছিল না।বাপ-মার ঠিকানা ও কেউ জানে না হটাৎ কইরা একদিন এই আমাগো গেরামে আইসা পড়লো। ছোট্ট আছিলো তবে বড় সুন্দর আর মায়াবী আছিল বইলা সবাই তারে এই গেরামে ঠাই দেয়।সারাক্ষণ হাসতো বইলা তারে আমরা মানে গেরামবাসী নাম দেই হাসি।একদিন হাসির দাদী আইলে তারেও আমরা গেরামে ঠাই দেই। তারপর থেইকা সবাই তারারে আমরা আত্মীয় বইলাই জানি।গ্রামের সবাইরে সে আপন কইরা নিছিলো।সে বড় মায়াবতী মেয়ে আছিল।আমাগো কষ্ট দূর করনের লাইগাই হয়তো আল্লাহ তারে আমাগো কাছে পাঠাইছিলো।সে আওনের পর থ্যাইকা অনেক বছর আমাগো গেরামে কষ্ট -দুঃখ,মহামারী আসে নাই।সে বড় মায়াবতী ছিলো গো ভাইজান।সে আগে থ্যাইকাই ভবিষ্যৎ জাইনা ফেলত।তবে ওটা সে নিজেও জানতো না।হাসি মধ্যে মধ্যে ঘুমের মধ্যে হাসতো আবার মধ্যে মধ্যে ঘুমের মধ্যে কাঁদতো।যখন ঘুমের মধ্যে হাসতো তখন গেরামে ভালো কিছু হইতো আর যখন ঘুমের মধ্যে কাঁদতো তখনই গেরামে কারো না কারো কিছু বিপদ হইতো।তবে ঘুমের মধ্যে এই কান্না -হাসির কতা ‘হাসি’ নিজেও জানতো না। তারে কইলে সে বিশ্বাস ও করতো না। আমাগো মা-চাচী কেউ না কেউ প্রতি রাইতেই থাকতো তার সাথে।হাসি ছোট থাকা কালে রাইতে হাসতোই বেশি কাঁদতো একেবারে কম।তবে মাসে – বছরে যখনই কাঁদতো কিছু না কিছু অমঙ্গল হইতো।ধীরে ধীরে হাসি বড় হইয়া উঠলো, যুবতী হইয়া উঠলো। আমাগো গেরামের কাসেম ভাইরে তাহার মনে ধরলো। গেরামের সবাই খুশি খুশি কাসেম ভাইয়ের লগে হাসির বিবাহ দিলো।সংসারের সুখে সুখী হইয়া হাসি সর্বক্ষনই হাসিতো।এক বছর পর হাসির কোল আলো করিয়া তাহার মেয়ে কিরণ আসিলো।কাসেম ভাই ও হাসি এবং গেরামবাসী সুখে সুখে কাটাইতে লাগিলো। দেখতে দেখতে আরও পাঁচ বছর চইলা গেলো। এই পাঁচ বছর অনেক সুখ- দুঃখ ঘটিলো গেরামে।কিরনও বড় হইয়া উঠলো কিছুটা। তবে এই পাঁচ বছরে হাসি নিজের মায়ার কতা কিছু কিছু ঠাওর করতে পারলো।সে হাসলে গেরামে সুখ আসে,কাঁদলে কষ্ট বাড়ে এই কতাডা তারে চিন্তিত কইরা রাখলো।কোনো কষ্টের ঘটনার জন্য হাসি নিজেরে দোষী মানতে লাগলো। তবে সে হাসলে সুখ আসে এইডাই তার শান্তি।কিন্তু একদিন কি জানি কি হইলো, হাসির এবং আমাগো জীবনে কিয়ামত হইয়া গেলো। একদিন দুপুর বেলা হটাৎ বলা নাই কয়া নাই হাসি ঘুমাইয়া পড়লো। এবং ঘুমের মধ্যে কাইন্দা বুক ভাসাইয়া ফেললো। ঘুমের মধ্যে তার বিলাপের সুর বহু দূর পর্যন্ত শুনা গেলো। অনেক দূর থ্যাইকা ও মানুষ আইসা অবাক হইয়া তার ঘুম কান্না হুনলো।হটাৎ ঘুম থ্যাইকা উঠে কাসেম ভাই ও কিরনরে খুঁজতে আরম্ভ করলো কিন্তু কান্না থামাইলো না।কাঁদতে কাঁদতে হাসি জঙ্গলের দিকে চইলা গেলো। সবাই কত প্রশ্ন করলো সে কোনো প্রশ্নের জবাব ই দিলো না।সবাই তার পিছন পিছন আইলো এবং সত্য ঘটনা টা চোখে দেখলো। হাসি জঙ্গলে আইসা দেখলো কাসেম ভাই ও কিরন মাটিতে পইড়া মইরা আছে।তাদের দুইজন রেই সাফে কাঁটসে।এই দৃশ্য দেইখা হাসি আর সইতে পারলো না লগে লগেই মাটিতে পইরা গেলো। তার পর থ্যাইকা কি যে হইলো হাসি মরে নাই কিন্তু জীবিত ও নাই।হাসি এখন সারাদিন একটা বিছানায় শুইয়া থাকে।হাটতে পারে না,লরতে পারে না,কথা কইতে পারে না,হাসতে পারে না,শক্ত কিছু খাইতে পারে না,খালি দুধ,পানি এগুলো খাওয়াই আমরা।শুধু ড্যাবড্যাব কইরা উপরের দিকে তাকায়া থাকে আর তার চোখ দুটা দিয়া পানি পরে।আমাগো গেরামে এখন সুখ নাই,শান্তি নাই,খাওন পরন কিছুই নাই।’হাসির’ হাসির সাথে আমাগো সুখ ও চইলা গেছে এখন শুধু আমরা হাসির চোখের পানির সাথে মিলায়া নিজেরা কান্দি।হাসির দাদী মরনের সময় কইয়া গেছে,শহর থ্যাইকা এমন কেউ আসবো সে হাসির মুখের হাসি ফিরায়া দিবো।হাসি আবার হাসবো। আর সেই মানুষ টা আফনে ভাইজান। আমরা জানি সেই মানুষটা আফনে।ও ভাইজান আফনে হাসিরে ভালা করবেন তো? ও ভাইজান তার মুখের হাসি ফিরাইয়া দিবেন তো? ভাইজান ও ভাইজান।এতক্ষনে অর্ক এর ঘোর কাটলো। সে এতক্ষন কি শুনলো এসব! এগুলো কি সত্য? অর্ক মনে মনে বললো, How can it possible! তারপর আস্তে করে বললো, আমরা এখন কোথায়? আমি কি হাসিকে এক পলক দেখতে পারি।
রহিম: হ ভাইজান।অবশ্যই পারেন।হাসিরে দেখানোর জন্যই তো আফনারে এই গেরামে আনলাম।একটু দেখেন না ভাইজান হাসির কি হইলো। হাসি এখন আর হাসে না,হাটতে পারে না,কতা কইবার পারে না,ভালো মন্দ খাইতে পারে না তাইলে বাইচা রইলো কেমনে?
অর্ক হাসিদের বাড়িতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলো ওখানে উঠান ভর্তি মানুষ। মানুষ গুলো যদিও চিৎকার চেচামেচি করছিলো অর্ককে দেখে একদম স্তব্ধ ও নির্বাক হয়ে গেলো। হ্যাঁ, এখানে সবাই অর্ককে দেখার জন্যই অপেক্ষা করছিলো।যে অর্ক ‘হাসির’ হাসি ও এই গ্রামের সুখ এনে দিবে।জন স্রোতের স্তব্ধতা ভেঙে এবার নিরব সুরের গুঞ্জন উঠলো। অস্পষ্ট স্বরে অর্ক শুনতে পেলো অনেকেই বলছে, এই সেই বৈদ্য যে হাসি মায়ের হাসি ফিরাইয়া দিবেন। হায়রে কত কাল ধইরা হাসি মায়ের হাসিমাখা মুখখানা দেখিতে পাইনা।হটাৎ ওদের মধ্যে একজন বয়স্ক লোক লাঠিতে ভর দিয়ে এসে বললো, আমরা জানতাম তুমি একদিন ঠিক আসবে।আমরা তোমার আসার পথ চেয়ে বসেছিলাম বাবা।দয়া করে তুমি আমাদের হাসিকে ঠিক করে দাও।আমরা আবার আগের মতো বাঁচতে চাই।
ওদের অর্কর উপর এই বিশ্বাস দেখে অর্ক অবাক না হয়ে পারলো না।অর্ক ডাক্তার না,কবিরাজ ও না তবে কি করে সে হাসিকে ঠিক সুস্থ করে ফেলবে।তবুও ওদের আশা দেখে অর্ক তার মনে সাহস যোগায়।হয়তোবা হাসি ভালো হবে না তবুও অর্ক এক পলক দেখবে হাসিকে।ঐ বুড়ো মানুষ টি এই গ্রামের মাতবর । একমাত্র তিনিই এই গ্রামে ভালো করে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারেন।অর্ককে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে ঠিকই কিন্তু অর্ক এখান থেকে শহরে যাবে কি করে তা নিয়ে উনাকে খুবই চিন্তিত মনে হলো। তারা অর্ককে নিয়ে ‘হাসি’ নামের রহস্যময় নারীটির কাছে নিয়ে গেলো। এই এতক্ষণে অর্ক এর হাসিকে দেখার সৌভাগ্য হলো। কী আশ্চর্য! রূপসী নারী হাসি।এই এত বছরে তার সৌন্দর্য কোনো অংশেই কমে নি।তাকে দেখে মনেই হয় না সে দীর্ঘ বছর ধরে একই জায়গায় একই ভাবে শুয়ে আছে। তার ফর্সা গায়ের রং, লাল ঠোঁট, পলকবিহীন ডাগর দুটো চোখ আর ঘন কালো লম্বা চুল এলিয়ে শুয়ে থাকার ভঙ্গি দেখে মনে হয় যেন কোনো মোমের পুতুলকে কাচের মমিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। হাসিকে দেখার পর অর্কর বুঝতে দেরি হলো না যে হাসি কোমাতে চলে গেছে।অর্ক অনেকক্ষন ভেবে তারপর বললো, হাসিকে কি ডাক্তার দেখানো হয়েছে? বড় কোনো শহরের ডাক্তার?
মাতবর সাহেব: না, বড় কোনো শহরের ডাক্তার দেখাই নি,তবে অনেক কবিরাজ, গ্রামের ডাক্তার দেখানো হয়েছে।কোনো কাজ হয় নি।সবাই এমন পাথর রূপ দেখে চলে গেছে।এমনে আমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি করি নি।অর্কর হাসির ঘর থেকে আবার বাহিরে চলে এলো। বাহিরে এসে বললো, আপনারা তাকে শহরে চলে যান।বড় কোনো ডাক্তার দেখান।হয়তো বা হাসি ঠিক হয়ে যেতে পারে।
ওদের মধ্যে কেউ কেউ বললো, শহরের ডাক্তার তো মেলা টেহা লাগবো, অত টেহা পামু কই?
এই কথাটাও একদম অগ্রাহ্য করা যায় না।যে গ্রামের মানুষ দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে পারে না,একটা ভালো কাপড় পরতে পারে না তারা কি করে এই এত টাকার চিকিৎসা করাবে!অর্কর কাছে সবাই আবার হাত জোর করে বললো, কিছু করেন ভাইজান। আফনেই পারবেন।
অর্ক কিছুক্ষণ চিন্তিত স্বরে বললো, আচ্ছা চিকিৎসার টাকাটা যদি আমি দেই।
রহিম: টেহা,টেহা নিমু আফনের কাজতেন!ক্যান, ভাইজান, টেহা নিমু ক্যান! না,না টেহা নিমু না।
অর্ক: আহা,না হয় ধার হিসেবেই নাও।যদি হাসি কোনো দিন ঠিক হয়ে যায় তখন না হয় ফিরত দিও।
তারপর অনেক কষ্ট করে অর্ক গ্রামবাসীকে টাকা নিতে রাজি করে।টাকাও ঠিক নয় এত টাকা তো অর্ক এক সাথে পাবে কোথায়।আসলে অর্কর কাছে তার মায়ের একটা হিরার গহনা ছিলো। যেটা অর্কর মা অর্ককে দিয়েছিলো ঠিক করিয়ে নেওয়ার জন্য।তারাতাড়ি করে গ্রামে চলে আসার কারনে গয়নাটা অর্ক মাকে দিতে পারে নি।অর্ক জানে এটা তার মার প্রিয় গহনার একটি, যখন এটা ছিড়ে গিয়েছিলো তখনই তিনি অনেক মন খারাপ করেছিলেন। কিন্তু অর্কর না দিয়েও কোনো উপায় নেই।অর্কর মার এমন গহনা আরও আছে কিন্তু এমন হাসি সারা পৃথিবীতেই আর দ্বিতীয় টি নেই।এই গহনাটি অর্কর মা পেলে,না পেলে কিচ্ছু যায় আসে না কিন্তু হাসি ভালো হলে এই গ্রামের সবার অনেক কিছু যায় আসে।গহনা আর তার ফোন নাম্বারটা দিয়ে অর্ক তাদের শহরে গিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করতে বলে।আরও কিছু কথা অর্ক তাদের সাথে বলছিলো এমন সময় একজন দৌড়ে এসে বললো, ভাইজান আফনের টেরেন চইলা গেছে গা,অহন কি হইব?
জনস্রোতের মাঝে আবার কথার গুঞ্জন উঠলো, এহন কি হইব? কেমনে যাইবো ভাইজান?
বুড়ো মাতবর সাহেব বললেন, বাবা জ্বি,তোমারে অনেক কষ্টের মাঝে ফেলে দিলাম,ক্ষমা করে দিও।তোমার মূল্যবান একটা দিন নষ্ট করে দিলাম।
অর্ক মনে মনে বললো, আমার মূল্যহীন জীবনে এই একটা দিনই হয়তো বা সবচেয়ে মূল্যবান। এই একটা দিনে আমি যা পেয়েছি তা আমার সারা জীবনের সঞ্চয়।
অর্ক তখন আস্তে করে বললো, আর কি কোনো উপায় নেই শহরে যাবার?
রহিম: হ, আছে একটা উপায়।আরও মেলা দূরে একটা বাসস্ট্যান্ড আছে। তয় আফনে অত দূর যাইতে পারবেন না।আইজ রাতটা আমাগো লগেই গেরামে থাইকা যান ভাইজান, কাল যায়েন।
অর্ক: না,আমি আজ থাকবো না।শহরে চলে যাবো।আর,হাটাহাটির অভ্যাস আমার আছে।
গ্রামের মানুষ অনেক আবদার করলো থাকার কিন্তু অর্ক থাকতে রাজি হলো না।শেষ পর্যন্ত তারা অর্কর সাথে রহিমকে পাঠালো বাসস্ট্যান্ডে।
রাস্তায় রহিম আবারও বললো, ভাইজান আমাগো লাইগা আফনের একদিন খারাপ হইলো। মাপ কইরা দিবেন।আসলে হাসির হাসি আমাগো বড়ই দরকার।হাসির হাসি দিয়া আমরা আবার হাসতে চাই গো ভাইজান।
অর্ক মনে মনে বললো, কই এই একটা দিনে তো আমি কিছুই হারাই নি।তবে কি পেয়েছি আমি এই একদিনে।কি করেছি আমি? আমার এই একদিনের এত কিসের দাম! শুধু হাসির মুখে এক পালসা হাসি ফুটানোর চেষ্টা করেছি।না আমি সত্যিই চাই হাসি হাসুক।অন্তত একটা দিনের জন্যও হাসি হাসুক।হাসির হাসিতে গ্রামের সমস্ত কালিমা,সমস্ত দুঃখ মুছে যাক।গ্রামের মানুষ গুলো একটা দিনের জন্যও ফিরে পাক তাদের হারানো সুখ।অর্ক তখন অন্যমনস্ক হয়ে ভাবলো, এই একটা দিনে আমি কি করেছি? পরোপকারীতা,মানুষের উপকার করার চেষ্টা! এই এক দিন কি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন হতে পেরেছে?


