মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল অ্যান্টার্কটিকার হিমশীতল ওয়েডেল সাগরে ঝুঁকিপূর্ণ একটি এলাকায় গবেষণা করার সময় নতুন একটি দ্বীপ আবিষ্কার করেছে, যা এর আগে বিশ্বের কোনো মানচিত্রেই এটি চিহ্নিত ছিল না । বিস্ময়কর প্রকৃতি কখনো কখনো বরফাবৃত অ্যান্টার্কটিকায় এমন সব রহস্য উন্মোচন করে যে বিজ্ঞানীরাও অবাক হয়ে যান । তাদের এই আবিষ্কারটি এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে । আলফ্রেড ভেগেনার ইনস্টিটিউটের জার্মান গবেষণা বা বরফভাঙা জাহাজ পোলারস্টার্নে থাকা ৯৩ জন সদস্যের আন্তর্জাতিক দলটি গত ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে অ্যান্টার্কটিকার উত্তর-পশ্চিম ওয়েডেল সাগর এলাকায় সমুদ্রের স্রোত, বরফ গলে যাওয়া এবং জলরাশির মানচিত্র তৈরি করছিল । হঠাৎ খারাপ আবহাওয়ার কারণে গবেষণা কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে তারা জয়েনভেল্লি আইল্যান্ডে আশ্রয় নেয়ার সময় একটি দ্বীপ দেখতে পান এবং এই অংশটি নৌ-মানচিত্রে আগে কেবল একটি রহস্যময় ও বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল । প্রথমে এটিকে ময়লা জমে থাকা একটি হিমশৈল (আইসবার্গ) মনে হচ্ছিল । পরে যখন বরফ ও হিমবাহ গলতে শুরু করে তখন জানা যায় যে, এটি আসলে একটি ভূখণ্ড বা পাথুরে দ্বীপ । অ্যান্টার্কটিকায় দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের বরফ স্থিতিশীল ছিল । কিন্তু গত ১০ বছরে এর অনেক পরিবর্তন ঘটেছে । জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অ্যান্টার্কটিকায় বাতাসের ধরণ বা গতিপথ বদলে যাচ্ছে । ফলে, ঠান্ডা পানি ও বরফ সরে যায় এবং সমুদ্রতলের গভীর উষ্ণ জল উপর দিকে উঠে এসে বরফ গলিয়ে দিতে সাহায্য করে । ঠিক যেন চুলার মত কাজ করে । বিজ্ঞানীরা দ্বীপটির আকার ও অবস্থান মানচিত্রায়নের জন্য একটি ড্রোন এবং একটি ইকো সাউন্ডার ব্যবহার করেছেন । ইকো সাউন্ডার হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র যা পানির নিচে দূরত্ব মাপার জন্য শব্দ তরঙ্গ নির্গত করে । বিজ্ঞানীদের হতবাক করে তাদের অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, দ্বীপটি আশ্চর্যজনকভাবে বড়— এর দৈর্ঘ্য গিজার মহা পিরামিডের (দি গ্রেট পিরামিড অফ গিজা) প্রায় সমান বলে অনুমান করা হয় । গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬ মিটার উঁচু, প্রস্থ ৪০ মিটার এবং দৈর্ঘ্যে ১৩০ মিটার । এই প্রথমবারের মত ভূখণ্ডটির জরিপ এবং নথিভুক্ত করা হলো । তবে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত নন যে, কেন দ্বীপটিকে নৌ-মানচিত্রে বিপদসীমার মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছিল । অথচ অন্যান্য ডেটা সেটে এটিকে উপকূলরেখা হিসেবে দেখানো হয়নি । আরো বিস্ময়ের বিষয় যে, মানচিত্রে নতুন আবিষ্কৃত দ্বীপটির অবস্থান প্রকৃত অবস্থান থেকে প্রায় এক মাইল দূরে দেখানো ছিল । স্যাটেলাইট চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বরফে ঢাকা থাকার কারণে দ্বীপটিকে তার আশেপাশের ভাসমান অসংখ্য হিমশৈল থেকে আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব ছিল । নতুন আবিষ্কৃত এই দ্বীপটির এখনো কোনো নাম দেয়া হয়নি । গবেষক দল জানিয়েছে, দ্বীপটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার পর ভবিষ্যতে এর নামকরণ করা হবে । কিন্তু এদিকে অনেক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এর নাম রাখার পরামর্শ দিয়েছেন যেমন: (ক) আইসবার্গ (খ) লুমারল্যান্ড (গ) পাখিদের মিলন দ্বীপ । ভেনিস উপকূলের কাছে আরেকটি গোপন ক্ষুদ্র দ্বীপের আবির্ভাবের পর এই নতুন দ্বীপ আবিষ্কার হলো । তবে, আবিষ্কৃত এই দ্বীপ ঘিরে অনেক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং এর মালিকানা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে । সবচেয়ে কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্ন হচ্ছে: যে বিজ্ঞানীরা এই দ্বীপ খুঁজে পেয়েছেন, তারা বা তাদের দেশ কি এই দ্বীপটির মালিকানা দাবি করতে পারবেন? আন্তর্জাতিক আঞ্চলিক জলসীমা ও সার্বভৌমত্ব বা সমুদ্র আইন (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী, এর উত্তর হচ্ছে না । আইনে বলা আছে, একটি উপকূলীয় দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সর্বোচ্চ ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (এক্সক্লুসিভ ইকোনোমিক জোন বা ইইজেড) বলা হয় । যদি এই সীমার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয়, তাহলে ঐ নতুন দ্বীপের উপর কেবলমাত্র সেই নিকটবর্তী দেশেরই সার্বভৌম অধিকার থাকবে । ২০০ নটিক্যাল মাইলের পর বাইরের সমুদ্র এলাকাকে আন্তর্জাতিক জলসীমা বা উচ্চ সাগর (হাই সীস) বলা হয় । এটি সমগ্র মানবজাতির সম্পদ (কমন হেরিটেজ অফ ম্যানকাইন্ড) হিসেবে বিবেচিত হয় । ফলে, এই জলসীমায় কোনো দেশ বা ব্যক্তি এককভাবে এর মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে না । তাই, এখানে সৃষ্ট কোনো নতুন দ্বীপে কোনো ব্যক্তি নিজেকে সেই দ্বীপের রাজা ঘোষণা করতে পারেন না । আন্তর্জাতিক জলসীমায় যদি কোনো ব্যক্তি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে নিজেকে রাজা ঘোষণা করে, তবে ইউএনসিএলওএস এর আইন অনুসারে সেই দ্বীপের নিজস্ব কোনো জলসীমা বা সার্বভৌমত্বের মর্যাদা থাকে না । বিশ্বের কোনো দেশই সেই তথাকথিত দ্বীপ বা রাজ্য বা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না । বিজ্ঞানীদের মতে তিনটি কারণে যেমন: (ক) সমুদ্রের গভীরে থাকা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বের হওয়া লাভা ধীরে ধীরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঠে এসে জলের সংস্পর্শে ঠান্ডায় জমে গিয়ে সেটি দ্বীপ সৃষ্টি করে (খ) পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্লেটগুলোর সংঘর্ষ বা সরে যাওয়ার ফলে বিশেষ করে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে সমুদ্রের তলদেশের ভূমি উপরে উঠে দ্বীপ তৈরি করে (গ) সমুদ্রের স্রোতের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে বালি ও মাটি জমে ছোট ছোট দ্বীপ বা চরের সৃষ্টি করে ।
লেখক: ফার্মাসিস্ট, তথ্যসূত্র: ডিডব্লিউ.কম, দিসান.আইই।


