আবু সাঈদ
শহরের ফুটপাতে তখন জনস্রোত। ঈদের আর মাত্র দুদিন বাকি। রঙিন আলোকসজ্জায় ছেয়ে গেছে চারপাশ, বড় বড় শপিং মলগুলো থেকে ভেসে আসছে আতর আর নতুন কাপড়ের ঘ্রাণ। কিন্তু এই ঝলমলে আলোর নিচেও কিছু অন্ধকার থাকে, যা কেবল মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত বাবারাই চেনে।
আহমেদ সাহেব (ছদ্মনাম) দাঁড়িয়ে আছেন ফুটপাতের এক কোণায়। পকেটে হাত দিয়ে শেষবারের মতো নোটগুলো গুনলেন। সব মিলিয়ে বারোশ টাকা। গত তিন মাস ধরে পকেট মানির অংশের টাকা বাঁচিয়ে আর ওভারটাইম করে জমানো পুুঁজি। তার নিজের পাঞ্জাবিটা তিন বছরের পুরোনো। কলারের দিকটা কিছুটা ফেঁসে গেছে, রংটাও চটে তামাটে হয়ে গেছে। ভেবেছিলেন এবার একটা সস্তা সুতির পাঞ্জাবি কিনবেন।
কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাত বছরের ছেলে আয়ানের চোখের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আয়ান একটা নীল রঙের ঝলমলে পাঞ্জাবির দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে যে তৃপ্তি, যে আর্তি,তার সামনে নিজের তামাটে পাঞ্জাবির অভাবটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল।
আহমেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনের কোণে একটা প্রশ্ন উঁকি দিল, আল্লাহ কি আমার এই ত্যাগটুকু দেখেন? এই যে নিজের সাধগুলো বিসর্জন দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা, এর কি কোনো মূল্য আছে?
ঠিক সেই মুহূর্তে হৃদয়ের জানালায় কড়া নাড়ল আল-কুরআনের সেই অমিয় বাণী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন:
وَ یُطۡعِمُوۡنَ الطَّعَامَ عَلٰی حُبِّهٖ مِسۡكِیۡنًا وَّ یَتِیۡمًا وَّ اَسِیۡرًا ﴿۸﴾
আর তারা আল্লাহর প্রতি তাদের ভালবাসার কারণে মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীদের খাবার দান করে।
اِنَّمَا نُطۡعِمُكُمۡ لِوَجۡهِ اللّٰهِ لَا نُرِیۡدُ مِنۡكُمۡ جَزَآءً وَّ لَا شُكُوۡرًا ﴿۹﴾
তারা বলে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আমরা তোমাদের খাবার দিচ্ছি; আমরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।
(সূরা আল-ইনসান, আয়াত নং:৮ ও ৯)
আহমেদ সাহেব ভাবলেন, আমি তো কেবল বাবা হিসেবে দিচ্ছি না, আমি দিচ্ছি এক নিরুপায় আত্মার খুশির জন্য। উৎসবের এই ভোগবাদী সমাজে যেখানে সবাই কেবল নিজের জন্য সঞ্চয় করতে ব্যস্ত, সেখানে নিজের জন্য না কিনে অন্যের জন্য কেনা এই ছোট কাজটুকুই তো ইবাদত।
আমাদের জীবনের এই অভাবগুলো নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষদের জীবনও ছিল এমন ত্যাগের গল্পে ঠাসা। একদিনের কথা ভাবুন—হযরত আলী (রা) এবং হযরত ফাতিমা (রা) এর ঘরে চরম অভাব। তারা পরপর তিন দিন রোজা রাখলেন। ইফতারের সময় যখন তারা খেতে বসবেন, ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ল এক মিসকিন। তারা নিজেদের খাবারটুকু তাকে দিয়ে দিলেন।
দ্বিতীয় দিন ইফতারের সময় এল এক এতিম, তৃতীয় দিন এল এক বন্দী। টানা তিন দিন তারা শুধু পানি দিয়ে ইফতার করলেন, কিন্তু নিজেদের খাবারটুকু হাসিমুখে অন্যের হাতে তুলে দিলেন। তাদের এই অভাবের সংসারে যে ত্যাগ ছিল, তা কেবল উপাসনা ছিল না, তা ছিল ভালোবাসার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই ত্যাগ এতটাই পছন্দ করেছিলেন যে, আসমান থেকে সূরা ইনসানের আয়াত নাজিল করে তাদের এই মহত্ত্বকে কিয়ামত পর্যন্ত অমর করে দিলেন।
আহমেদ সাহেব ভাবলেন, আমার অভাব তো তাদের তুলনায় কিছুই নয়। আমি তো অন্তত আমার সন্তানকে খুশি করতে পারছি।
বর্তমান সময়ে ঈদ মানেই যেন কে কার চেয়ে দামী পোশাক পরবে, কার জৌলুস কত বেশি, তার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এই ভোগবাদ আমাদের শিখিয়েছে নিজের জন্য ভোগ করাই সুখ। কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে পরের জন্য ত্যাগ করাই আনন্দ।
আহমেদ সাহেব আয়ানের জন্য সেই নীল পাঞ্জাবিটা কিনলেন। পকেটের শেষ টাকাটা যখন দোকানদারের হাতে দিচ্ছিলেন, তখন তার ভেতরে এক নির্মল শীতলতা কাজ করছিল। নিজের জন্য কেনা হলো না, এই আক্ষেপটা মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উবে গেল যখন দেখলেন আয়ান পাঞ্জাবিটা বুকে জড়িয়ে ধরে বলছে, আব্বু, ঈদে আমাকে একদম রাজপুত্রের মতো লাগবে, তাই না?
ছেলের এই নিষ্পাপ হাসির সামনে পৃথিবীর সমস্ত রেশমি কাপড় তুচ্ছ। ভালোবাসা আসলে কোনো বস্তুর নাম নয়, ভালোবাসা হলো ত্যাগের সেই অনুভূতি যা কেবল অভাবের সংসারেই বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে।
বাড়ি ফেরার পথে আহমেদ সাহেব আয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। তার ছেঁড়া কলারের পাঞ্জাবিটা আজ আর তাকে ছোট করছে না। বরং তার মনে হচ্ছে, তিনি আজ এক মহা-বিজয়ী।
ঈদের দিন সকালে যখন আয়ান নতুন নীল পাঞ্জাবি পরে জায়নামাজ নিয়ে বাবার সাথে ঈদগাহে যাবে, তখন আহমেদ সাহেবের পুরোনো পাঞ্জাবিটাই হবে সবচেয়ে উজ্জ্বল। কারণ সেই সুতোর ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে একজন বাবার নিঃস্বার্থ প্রার্থনা আর ত্যাগের ঘ্রাণ।
আল্লাহ তো কেবল বাহ্যিক জৌলুস দেখেন না, তিনি দেখেন হৃদয়ের সেই কোণটুকু যেখানে অন্যের সুখের জন্য নিজের শখকে কোরবানি দেওয়া হয়। ঈদ মানে কেবল নতুন জামা নয়, ঈদ মানে হলো ত্যাগের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দেওয়া।


