back to top
Monday, April 20, 2026

মুসলিমদের উৎসব 

মোহাম্মদ বিন এমদাদ

মদিনার তপ্ত বালুকারাশিতে তখন বসন্তের হাওয়া। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় দীর্ঘ তেরো বছরের জুলুম আর কষ্টের অধ্যায় শেষ করে ইয়াসরিবে (মদিনায়) পদার্পণ করেছেন। মদিনার আনসার সাহাবীরা তাদের সর্বস্ব দিয়ে মুহাজির ভাইদের আগলে রেখেছেন। চারদিকে ভ্রাতৃত্ব আর ভালোবাসার এক নতুন পৃথিবী গড়ে উঠছে।

হিজরতের পর প্রথম বছর অতিক্রান্ত হতে চলল। একদিন সকালে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)লক্ষ্য করলেন, মদিনার অলিগলি আজ অন্যরকম চঞ্চল। ছোট ছোট শিশুরা রঙিন পোশাকে দৌড়াদৌড়ি করছে, যুবক ও বৃদ্ধরা নির্দিষ্ট ময়দানে জড়ো হচ্ছে। বাতাসে এক উৎসবের আমেজ। ঢাক-ঢোল আর বাদ্যের হালকা শব্দও কানে আসছিল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। তাঁর পবিত্র চেহারায় ছিল চিন্তার ছাপ। তিনি কেবল একজন ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, ছিলেন উম্মতের দরদী শিক্ষক। তিনি চাইলেন সাহাবীদের কাছেই বিষয়টি পরিষ্কার করতে।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকজন সাহাবীকে ডেকে কোমল স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আমার সাহাবীরা! তোমরা আজ কী পালন করছো? এই দুটি দিন কিসের উৎসব, যাতে তোমরা খেলাধুলা ও আনন্দ করছ?

উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে যারা আগে থেকেই মদিনায় বসবাস করতেন, তারা বিনীতভাবে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এ দুটি দিন হলো ‘নওরোজ’ এবং ‘মেহেরজান’। আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন ইসলাম গ্রহণ করেননি, অর্থাৎ সেই জাহেলি যুগ থেকেই আমরা এই দিনে উৎসব পালন করে আসছি। আনন্দ করা, ভালো খাবার খাওয়া এবং নানা রকম খেলাধুলার মাধ্যমে আমরা দিনটি উদযাপন করি।”

তাদের উত্তরে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল কেবল পূর্বের অভ্যাসের প্রতিফলন। তারা ভেবেছিলেন, হয়তো ইসলামে আনন্দের কোনো স্থান নেই, কেবল ইবাদত আর গম্ভীরতাই সব। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মনে ছিল ভিন্ন এক চিন্তা। তিনি চাইলেন এই প্রাচীন ও শেকড়হীন উৎসবের পরিবর্তে এমন কিছু দিতে যা হবে স্বর্গীয় এবং অর্থবহ।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটো মমতা আর ঐশ্বরিক নূরে ঝিলমিল করছিল। তিনি তাদের নিরাশ করলেন না, বরং খুশির সংবাদ শোনালেন। তিনি বললেন:

“আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে এই দুটির (নওরোজ ও মেহেরজান) পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। তা হলো ‘ঈদুল আজহা’ ও ‘ঈদুল ফিতর’।”

এই একটি ঘোষণা সাহাবীদের মনে আনন্দের বন্যা বয়ে দিল। তারা বুঝতে পারলেন, ইসলাম কেবল বিধিনিষেধের ধর্ম নয়; ইসলাম মানুষকে উৎসব পালন করতে শেখায়, তবে তা হতে হবে মার্জিত এবং স্রষ্টার স্মরণে সিক্ত।

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

সাহাবীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “উত্তম কেন?” নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনাচরণের মাধ্যমে শিখিয়ে দিলেন এর উত্তর। জাহেলি উৎসবের কোনো লক্ষ্য ছিল না, ছিল কেবল প্রবৃত্তির পূজা। কিন্তু মুমিনের ‘ঈদ’ হবে ইবাদতের ফসল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই ঘোষণার পর মদিনার ঘরে ঘরে ঈদের প্রস্তুতি শুরু হলো। সাহাবীরা তাদের পুরনো উৎসবগুলো ত্যাগ করলেন অবলীলায়। কারণ তারা জানতেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা উপহারের চেয়ে দামী কিছু হতে পারে না।

ঈদুল ফিতর এলো দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর। সাহাবীরা সারাদিন রোজা রাখতেন, রাতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন। যখন শাওয়ালের চাঁদ দেখা দিল, মদিনার আকাশ-বাতাস যেন তাকবীরের ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়ে দিলেন, এই দিনটি শুরু হবে না কেবল খাবার দিয়ে, বরং তা শুরু হবে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ দিয়ে—গরিবদের মুখে হাসি ফুটিয়ে।

এরপর এলো ঈদুল আজহা। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতি নিয়ে আসা এই ঈদ সাহাবীদের শিখিয়ে দিল যে, আল্লাহর জন্য জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করার মধ্যেই প্রকৃত আনন্দ।

শিক্ষার্থী, জামিয়া হুসাইনিয়া আরাবিয়া, মেলান্দহ, জামালপুর।

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments