back to top
Monday, April 20, 2026

ঈদের আনন্দ

রুমিয়া হক শর্মী 

শৈশব মানেই জীবনের এক সোনালি অধ্যায়, যে অধ্যায়ে চাওয়া-পাওয়া বা প্রত্যাশা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু আনন্দটা ছিল ভরপুর। ঈদ আসলেই মনটা কেমন অস্থির হয়ে থাকত। নতুন জামা কেনার পর সেটাকে যত্ন করে লুকিয়ে রাখতাম। মনে হতো, কেউ যদি ঈদের আগে দেখে ফেলে তাহলে বুঝি ঈদটাই মাটি হয়ে যাবে! তাই নতুন জামাটা আলমারির কোণে, কখনো বালিশের নিচে, আবার কখনো ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে রাখতাম। আর যদি ভুল করে কারও জামা ঈদের আগেই দেখে ফেলতাম, তখন সবাই মিলে তাকে খ্যাপাতাম “তোর জামাটা তো পুরোনো হয়ে গেল!” সে কী হাসি, সে কী আনন্দ! ছোটবেলায় ঈদ আমাদের কাছে ছিল বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দিন। ঈদ মানেই হৃদয়ের এক অন্যরকম অনুভূতি। ঈদের চাঁদ না দেখলে যেন সেই আনন্দে শতভাগ পূর্ণতা আসত না। রমজানের শেষ দিনগুলোতে ইফতার শেষ করেই আমাদের প্রধান কাজ ছিল চাঁদ খোঁজা। ২৯ রোজার সন্ধ্যা হলেই আমরা ছুটে যেতাম আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ দেখতে। গ্রামের খোলা মাঠ, রাস্তার ধারে বা বাড়ির ছাদ যেখান থেকে আকাশটা ভালো দেখা যায়, সেখানেই জড়ো হতাম। আমাদের পুরো দলকে নেতৃত্ব দিত রেহান ভাই (ভাইয়া বর্তমানে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক)। আমরা সমবয়সী কয়েকজন মিলে যেন একটা ছোট “চাঁদ দেখা কমিটিই” গড়ে তুলেছিলাম। সবার চোখ তখন আকাশের দিকে। কেউ বলত, “ওই যে চাঁদ!” আবার কাছে গিয়ে দেখা যেত সেটা আসলে একটা তারা। তবুও সেই খোঁজাখুঁজির মধ্যেই ছিল এক অদ্ভুত আনন্দ। চাঁদ খুঁজে না পেলে একটু হতাশ হতাম ঠিকই, কিন্তু আবার মনে মনে ভাবতাম কাল চাঁদ উঠুক আর নাই উঠুক, পরশু তো ঈদ হবেই। এই ভাবনাটাও আমাদের আনন্দ দিত। আর যখন নিশ্চিত খবর পেতাম যে চাঁদ দেখা গেছে, তখন তো আনন্দের আর সীমা থাকত না। আমরা সবাই মিলে চিৎকার করে বলতাম, “চাঁদ উঠেছে! চাঁদ উঠেছে!” কখনো কখনো ছোট্ট একটা মিছিলও বের করতাম। সেই আনন্দে যেন পুরো পাড়া মুখর হয়ে উঠত। রাতে ঘুমানোর কোনো সুযোগই থাকত না। হাতে মেহেদি লাগানোর ধুম পড়ে যেত। মেহেদি লাগানোর জন্য বাড়ির বড় বোনদের কাছে সবাই গিয়ে ভিড় জমাতাম। কেউ সুন্দর করে নকশা করত, আবার কেউ শুধু হাত ভরে মেহেদি লাগিয়ে দিত। হাসি-আনন্দ, গল্প আর ঠাট্টা-তামাশায় কেটে যেত পুরো রাত। ঈদের দিন ভোরে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতাম। নতুন কাপড় পরার আগেই বাড়ির সবাই মিলে বাড়ির আশপাশ আর আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতাম। মনে হতো যেন পুরো বাড়িটাই ঈদের আনন্দে নতুন করে সেজে উঠছে। গোসল করে নতুন জামা পরে তৈরি হতাম সালামি নেওয়ার জন্য। একজন, দু’জন, তারপর আরেকজন সবার কাছ থেকে ২, ৫, ১০ টাকার নতুন নোট পেয়ে ছোট্ট হাতটা ধীরে ধীরে ভরে উঠত। যখন প্রায় ১০০ টাকার মতো হয়ে যেত, তখন মনে হতো ধনী মানুষ আমিই! তখন হয়তো টাকা ছিল কম, কিন্তু আনন্দ ছিল অগাধ। সালামি নেওয়া শেষ হলেই শুরু হতো আরেক আনন্দ হিসাব করার পালা। কে কত টাকা পেল, কার কত উঠলো সবাই মিলে বসে সেই হিসাব কষতাম। আজ অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। জীবন বদলেছে, সময় বদলেছে। হয়তো সেই আনন্দ আর আগের মতো নেই। কিন্তু ছোটবেলার সেই ঈদের সকাল আর সালামির আনন্দ সেগুলো মনে পড়লে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর আনন্দের সঞ্চার করে। আম্মার যত্ন করে রাখা শখের ক্রোকারিজ, ঈদের দিন শোকেস থেকে বের করা হতো। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই ঈদের আনন্দকে কত বিশেষ করে তুলতো! ঈদের নামাজ শেষে সবার সাথে কোলাকুলি, তারপর দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেমাই, পায়েস আর নানা রকম খাবার খাওয়া এগুলোই তো ছিল আসল আনন্দ। তখন দাওয়াতের কোনো আলাদা আয়োজন লাগতো না, ঈদের দিন সবাই সবার মেহমান। ঈদের সময় সবাই মিলে খুব আনন্দে সময় কাটত হইচই, ঘোরাঘুরি আর নানা খেলায় দিন কেটে যেত। সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে আকাশের চাঁদ নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করতাম। চাঁদ কার সঙ্গে যাচ্ছে, তা নিয়েও মজা হতো। তারপর তারা গোনার প্রতিযোগিতা শুরু হতো। সবাই রাতের খাবারের পরে একসাথে বসে বিটিভি দেখার আনন্দ ছিলো অন্যরকম, সবার প্রিয় হানিফ সংকেত পরিচালিত ইত্যাদি অনুষ্ঠান সেই সাথে ঈদের নাটক, ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান সবই পরিবারকে একত্রে আনন্দ দেওয়ার জন্য ছিলো। সেই সময়ের বিটিভি শুধু বিনোদনের মাধ্যমই নয়, পরিবারের সম্পর্ক ও স্মৃতিকে আরও গভীর করেছিলো। আজ বড় হয়ে বুঝি, ঈদের আসল আনন্দটা ছিল সেই সরলতায়, সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই। কিন্তু ঈদের চাঁদ উঠলেই আজও মনে পড়ে যায় সেই শৈশবের দিনগুলো যখন আকাশের ছোট্ট এক টুকরো চাঁদ আমাদের আনন্দকে পূর্ণ করে দিত। শৈশবের সেই ঈদ আর কখনো ফিরে আসবে না, তাবে সেই স্মৃতিগুলো আজও হৃদয়ের গভীরে রয়ে যাবে।

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments