back to top
Monday, April 20, 2026
Homeসাহিত্যগল্পনাড়ির টান

নাড়ির টান

শেখ সুলতানা মীম

ঝকঝক শব্দ তুলে মৃদু ছন্দে ছুটে চলেছে ট্রেন। যেন তার নেই কোনো ক্লান্তি, নেই কোনো থামার ইচ্ছে। অদৃশ্য এক দায়িত্ববোধ তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—প্রতিটি মানুষকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার এক অবিরাম প্রয়াস। জানালার পাশে বসে মিন্টু সেই ছন্দের মধ্যে হারিয়ে যায়। বাইরে অন্ধকার নামছে ধীরে ধীরে, আর ভিতরে তার মনে জেগে উঠছে নানা স্মৃতি, নানা অনুভূতি।এইসব ভাবতে ভাবতেই চোখ দুটো আস্তে আস্তে বুজে আসে তার। কিন্তু ঘুম আসে না—আশা আর হতাশার দোলাচলে তার মন অস্থির।আজ সে ঢাকার ব্যস্ত, নির্দয় শহরটাকে পেছনে ফেলে ট্রেনে উঠেছে—বাড়ির উদ্দেশ্যে। মিন্টুর বয়স মাত্র পনেরো। অথচ এই ছোট বয়সেই জীবন তাকে এমন সব কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে, যা অনেক বড় মানুষের পক্ষেও সহ্য করা কঠিন।দু’ বছর আগের কথা। ঈদের আনন্দে ভরা এক সকালে সে বাবা-মায়ের সাথে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু সেই আনন্দের পথই হয়ে উঠেছিল জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই হারিয়ে যায় তার পৃথিবী—বাবা আর মা। সেই দিনটার পর থেকে মিন্টুর জীবন যেন অন্য এক পথে মোড় নেয়।অসহায় মিন্টুকে আশ্রয় দেওয়ার মতো জায়গা হয়নি কোথাও—না দাদা বাড়িতে, না নানা বাড়িতে। সবাই মনে করেছে, “সে তো ছেলে মানুষ, কোথাও না কোথাও কাজ করে নিজের মতো বেঁচে নিতে পারবে।” কিন্তু কেউ ভাবেনি, তার মনটাও তো একটা শিশুর—যে ভালোবাসা চায়, একটু নিরাপত্তা চায়।যে বয়সে তার স্কুলের বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করার কথা ছিল, বন্ধুদের সাথে মাঠে দৌড়ঝাঁপ করার কথা ছিল, সেই বয়সে মিন্টু কাজ করে ময়লার ভাগাড়ে, কখনো ইটভাটার আগুনের পাশে। প্রতিদিন জীবন তার কাছে এক যুদ্ধের মতো। তবুও সে হার মানে না। কারণ সে জানে—এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে তাকে লড়তেই হবে।তবুও মানুষ তো শুধু বেঁচে থাকার জন্য বাঁচে না—তার মনেও থাকে টান, থাকে অনুভূতি। ঈদ এলেই যখন চারদিকে আনন্দের ঢেউ ওঠে, মানুষ যখন পরিবারে ফিরে যায়, তখন মিন্টুর বুকের ভেতরেও এক অদ্ভুত শূন্যতা আর টান অনুভূত হয়।সেই যে দু’ বছর আগে সে ঢাকা এসেছিল, তারপর আর কখনো বাড়ি ফেরা হয়নি। তাই এবার সে সাহস করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যাই হোক, এই ঈদে সে বাড়ি ফিরবেই।তার মনে হাজারো প্রশ্ন—নানা বাড়ি কি তাকে গ্রহণ করবে? দাদা বাড়ি কি একটু জায়গা দেবে? কেউ কি তাকে আপন করে নেবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তার জানা নেই। তবুও আশার আলো নিভে যায়নি পুরোপুরি।কারণ “নাড়ির টান” নামের যে অদৃশ্য বন্ধন, তা মানুষকে বারবার নিজের শিকড়ের দিকে টেনে নিয়ে যায়। সেই টানেই মিন্টু আজ ট্রেনে চড়ে বসেছে।তার মনের এক কোণে লুকিয়ে আছে ভয়—যদি কেউ তাকে জায়গা না দেয়? যদি আবার তাকে ফিরতে হয় এই কঠিন শহরে? কিন্তু আরেক কোণে জন্ম নিচ্ছে সাহস—যদি একটু ভালোবাসা পায়, যদি কেউ তাকে নিজের মানুষ বলে ডাকে!ট্রেনটা এগিয়েই চলছে—অন্ধকার চিরে, স্বপ্ন আর অনিশ্চয়তার মাঝ দিয়ে। মিন্টুও এগিয়ে চলেছে—এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে হয়তো আছে আশ্রয়, হয়তো আছে নতুন করে বেঁচে ওঠার সুযোগ।

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments