back to top
Monday, April 20, 2026
Homeসাহিত্যগল্পশেকড়ের টানে

শেকড়ের টানে

নুজহাত তাবাসসুম ইপ্সিতা 

​শহরের যান্ত্রিকতা, ফাইলের স্তূপ আর এসি রুমের কৃত্রিম ঠাণ্ডায় গত সাতটা বছর কীভাবে কেটে গেল, তাশদীদ নিজেও জানে না। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর দায়িত্বের চাপে আর প্রমোশনের নেশায় নিজের গ্রাম, ধুলোমাখা পথ আর মায়ের হাতের পিঠার স্বাদ যেন ফিকে হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার আর না। সাত বছর পর নাড়ির টানে তাশদীদ ফিরছে তার শিকড়ে— নিজের গ্রামে, এবারের ঈদটা পরিবারের সাথে কাটাতে।

​গাড়িটা যখন পিচঢালা মেইন রোড ছেড়ে মাটির রাস্তায় নামল, জানালার কাঁচ নামিয়ে দিতেই তাশদীদ এক বুক তাজা বাতাস নিল। এই বাতাসে সেই পরিচিত সোঁদা মাটির ঘ্রাণ। রাস্তার দুই পাশে সোনালি ধানের শিষগুলো যেন মাথা নুইয়ে তাকে স্বাগত জানাচ্ছে।

​হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা:

​ওই যে বিশাল বটগাছটা দেখা যাচ্ছে, ওটার ডালে একবার তার ঘুড়ি আটকে গিয়েছিল। সেদিন বাবা মই নিয়ে এসে ঘুড়িটা নামিয়ে দিয়েছিলেন।

​বর্ষার দিনে এই কর্দমাক্ত পথেই সে আর তার বন্ধুরা মিলে ফুটবল খেলত। বাড়ি ফিরলে মায়ের সেই মিছেমিছি বকুনি আজও কানে বাজে।

​মনে পড়ে গেল, বাঁশঝাড়ের আড়ালে সরু একফালি চাঁদ দেখার জন্য কী ব্যাকুলতাই না থাকত সবার মাঝে!

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

​বাড়ির উঠোনে গাড়ি থামতেই সাদা পাঞ্জাবি পরা বৃদ্ধ বাবা লাঠি হাতে এগিয়ে এলেন। মা রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে দৌড়ে এলেন। তাশদীদ গাড়ি থেকে নেমে যখন মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করল, তখন মায়ের চোখের কোণে জমানো সাত বছরের তৃষ্ণা জল হয়ে ঝরে পড়ল।

​মা শুধু বললেন, “বাপরে, এবার কি থাকবি কয়েকদিন? নাকি আবার ওই যন্তরপুরীতে চলে যাবি?”

​তাশদীদের গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠল। সে মৃদু হেসে বলল, “না মা, এবার অনেকদিন থাকব। তোমার হাতের সব রান্না না খেয়ে যাচ্ছি না।”

​বিকেলে তাশদীদ বের হলো গ্রামের মেঠো পথে। এখন সে বিসিএস ক্যাডার, বড় অফিসার। কিন্তু এই গ্রামের মানুষের কাছে সে এখনো সেই ‘তাশু’। পথে দেখা হলো ছোটবেলার বন্ধু রহমতের সাথে। রহমত এখন কৃষি কাজ করে। তাশদীদের কাঁধে হাত রেখে রহমত যখন হাসিমুখে বলল, “কিরে বড় সাহেব, আমাগো কথা কি মনে আছিল?”— তখন তাশদীদ বুঝল, শহরের পদমর্যাদা আর ক্ষমতা এই অকৃত্রিম ভালোবাসার কাছে কতটা তুচ্ছ।

​রাতে পুকুরঘাটে বসে চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে তাশদীদ অনুভব করল— সাফল্য মানে কেবল বড় চাকরি বা ভালো বেতন নয়। সাফল্য মানে হচ্ছে সেই শিকড়কে ভুলে না যাওয়া, যা তাকে আজ এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। সাত বছর পর এই ঈদটাই যেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঈদ হতে যাচ্ছে।

​”মানুষ পাখপাখালির মতো যেখানেই উড়ুক না কেন, দিনশেষে নিজের বাসার শান্তিতেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়।”

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments