back to top
Wednesday, January 21, 2026
Homeবিবিধভুতুড়ে নদীর বাঁক

ভুতুড়ে নদীর বাঁক

গাজী আবু হানিফ

১.
একটি সমতল জায়গা।তার পাশে আছে নদী।একপাশ উঁচুনিচু। অন্যপাশে সমতল ধানের মাঠ।নদীর চরে হোগলা কাশফুল। তালতমাল,হিজলও বনেদী পাতলা পাতলা ছোটবড় গাছ।তবে নদীর দু’ধারে ঘন ঝোপঝাড় রহিয়াছে। সব মিলিয়ে স্থানটিকে মায়াময় ও প্রাণবন্ত লাগে।আর দূর থেকে তাকালেই তালগাছের দৃশ্যবলী মন কাড়িয়া নেয়।আর বাবুই পাখির বাসা ঝুলতে দেখা যায়। এ ছাড়া ধান শালিক ভাত শালিক, গাঙচিল, মাছরাঙা ও নানা জাতের বকপাখি এখানে উড়িতে দেখা যায়।
তবে এ স্থানে লোকের বেশ আনাগোনা হয়।কিন্তু হাটের মত নয়।এখানে কাজের লোকেরা ছুটাছুটি করে বেশি। কেউ নদীতে মাছ ধরে,কেউ কৃষি কাজ করে, কেউ গরুছাগল চড়ায়,কেউ ঘাস কাটে।
আগন্তুক কেউ কাশফুলের ঝোপের ভেতর ছবি তুলে।অনেক দূরদূরান্ত থেকেও উঠতি বয়সের যুবক-যুবতী ও গাঁয়ের নারী পুরুষেরা সকাল- বিকালে এখানে বেড়াইতে আসে।আর কাশ ফুলের মনোরম শোভা প্রাণ ভরিয়া হৃদয় অন্ত করণে উপভোগ করিয়া থাকে।
নদীর চর বলিয়া কথা।বালির উঁচুনিচু স্থান। নদীতে ভাটা পড়িয়াছে। মরাজল ধীরে ধীরে বহিছে।
আর রাখালেরা গরুগুলি কে চরে দিয়া গাছের নীচে খেলা করে। কৃষক মাঠে কাজ করিয়া ঘাম ভেজা ক্লান্ত শরীরে বাড়িতে চলিয়া যায়। আবার ঝোপের ভিতরে আছে তালসহ নানা জাতীয় গাছ।আশেপাশে কয়েককিলোমিটার বাড়িঘর নেই। বিকেল হইতেই সকলে কাজ গুটাইয়া বাড়িতে চলিয়া যায়। কখনও দিনের বেলায়ও স্থানটি ফাঁকা হইয়া যায়। তখন একা থাকিলে ভয়ে মনের ভেতর একটা কাঁপুনি দেয়।কিছু না দেখিলেও নিরবতার কারণে স্থানটিকে ভুতুড়ে লাগে।তবে এক-দুইজন লোক থাকিলে এখানে কেউ ভয় অনুভবই করিবে না।

সেই গাঁয়ের আদি কৃষক জমিরউদ্দীন। বাপদাদা চৌদ্দ গোষ্ঠী কৃষক। তাই বংশানুক্রমে কৃষি তাহাদের মূল পেশা।বেশ জমি জমাও রহিয়াছে।আট ছেলে তিন মেয়ের জাহাজের মত বিরাট পরিবার।প্রথম প্রথম সকলেই একত্রে খানাপিনা করিত।ভাত তরকারি ডেগ ভরিয়া রান্না হইত।জমিরউদ্দীন একটি বেতের বড় লাই দিয়া বাজার-সদাই করিত।বাজারে গেলে সবাই তাকে চাচা চাচা বলে ডাকিয়া সওদা দিতে উৎসুক থাকিত।কেননা,উনি অনেক টাকার বাজার-সদাই করে। হাসু ও বাচ্চু কোনো কোনো সময় বাপের সাথে বাজারে আসে।আর না আসিলে রাস্তা থেকে লাই আগাইয়া নেয়।

ভাইয়েরা অল্পস্বল্প লেখাপড়া করে কৃষি কাজে লাগিয়া গিয়াছে।তবে বড়জন টেইলারি করে।তার ছোট জন পল্লী চিকিৎসক। তার ছোটজন তরকারি ব্যবসা করে। তার ছোটজন কাপড়চোপড় লুঙ্গি গামছা বাজারে বাজারে নিয়া হাটবারে বেঁচে। তার ছোটজন গাভী পালন করে। আর দুধ কিনিয়া বিক্রি করে।
তবে নদীর তীর হইতে মাঠের ভেতর একটি আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা আছে।এই রাস্তা দিয়া দূর গ্রামের লোকজন হাটবার দিন আসাযাওয়া করিয়া থাকে।
নদীর তীরেও ঝোপঝাড় বেষ্টিত পায়ে চলার রাস্তা।
চরের ভিতর হিন্দুদের একটি পুরাতন মঠ আছে।মঠটি রোদবৃষ্টিতে ছত্রাক পড়িয়া কালোবর্ণের হইয়া গেছে। তবে বড় তালগাছগুলোকে ছাড়িয়া তাহার সরু চিকন মাথা আকাশ ফুঁড়িয়া রহিয়াছে। চাঁদণি ও আবছা রাতে এই মঠটিকে বিশাল আকৃতির দানব বলিয়া মনে হয়।কেউ কেউ সাঝের বেলায়ই এখানে বিরাট ছায়া দেখিতে পাইয়াছে।
মঠের পাশে শ্মশান। কেউ কেউ বলে শ্মশানের কারণেই এখানে নানা আজগুবি ঘটনা ঘটিয়া থাকে।দিনদুপুরে নারী কন্ঠের চিৎকার শুনিতে পাওয়া যায়।

জমিরউদ্দীন তাহার মেঝ ছেলে ছমিরকে নিয়া জমিতে নিড়ানি দিতেছে।পেছনে আছে বিরাট তালগাছ।একটু হাওয়া এলেই ঝনঝন করিয়া নড়িয়া ওঠে।একলা থাকিলেও এ আওয়াজে ভেতরটা ঠিকই মোচড় দিয়া উঠে।দুপুরের আজান পড়িতেই তাহার ছেলে জমি থেকে উঠিয়া বাড়িতে চলে যায়। কেননা,এতদূরে কাজ করিতে হইলে হুক্কা টানিতে হয়।আজ আর হুক্কা তামাক আনে নাই।জমিরউদ্দীন আর একটি ফাঁড়ি তুলিয়া যাইবে।

তাই ছেলেকে বলিল:তুই চলে যা,বাপজান।আমি সামনের ফাঁড়িটা তুইল্লা আমু।
ঠিক আছে,বাপজান।তুমি তাড়াতাড়ি আইসা পইর।আমি গিয়া হুক্কা সাজাইয়া রাখমু।
আচ্ছা –
ছেলে চইলা যাওয়ার পর জমিরউদ্দীন একা।আশেপাশে কেউ নাই।তার ভেতর তালগাছের ঝনঝন আওয়াজে ভয় দিতে লাগিল।জমির আগাছা বাছিতেছে।আর আজেবাজে নানা কথা ভাবিতেছে।ভুতের কথা মনে হইল।ভুত ভাবিতে ভাবিতে কেমন যেন একটা ভয় ভাব তাকে কাবু করিয়া ফেলিল।জমি থেকে উঠিয়া রাস্তার পাশে উঠিল।শরীরটা ঘাম দিয়া দূর্বল অইয়া গেল।কড়া রোদ।বাতাস নাই।চোখের দুটি বিরাট হাতি দেখিতে পাইল।তাহার পানে চোখ বড় করিয়া আসছে।জমিরউদ্দীন এসব দেখিয়া কোন সময় যে বেহুস হইয়া গেছে বুঝতেই পারল না।
বাপ বাড়িতে যায় না,দেখিয়া ছমির অনেকক্ষণ দেরী করিয়া তাহার মায়ের কথায় খোঁজ নিতে আসিয়া দেখে জমিরউদ্দীন রাস্তার উপর পইরা রইছে।চিল্লা ফাল্লা কইরা বাড়ি থাইকা তক্তা আইন্যা ভারের মত ঝুলাইয়া তাকে বাড়িতে নিল।ঝাড়ফুঁক করিল।মাথায় পানি ঢালিল।অনেকক্ষণ পর জ্ঞান ফিরিল।সবার মনে স্বস্তি আসিল।সেই কথা সে ভুলে নাই। তবে এটি যে তার শরীর দূর্বলের কারণ এটি জমিরউদ্দীন বুঝিয়াছে।কয়েকদিন আর কাজে আসিল না।বাড়িতে বিশ্রাম নিতেছে।

বিরাট কৃষক বাড়ি।আট ছেলের জন্য আটটি ঘর তুলিয়াছে।বড় পাঁচজন বিয়ে থা করে সন্তান সন্তদি নিয়া আলাদা হইয়া গিয়াছে। বড় দেউড়ি কুঁড়েঘর।
বাড়িটা রাস্তা হইতে ২০০মিটার দূর।ইহাতে বাড়ির আদব রক্ষা হয়।বউঝিয়েরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করিতে পারে।ঘরের পিছনে আছে লম্বা পুকুর। আছে গোয়ালঘর ও পাকের ঘর।পাশে জমিরউদ্দীনের অন্যান্য ভাইয়েরাও আছে।বলিতে গেলে তাহারা নিজেরা মিলেই একটি পাড়া হইয়া গিয়াছে।

আট ছেলের জন্য বাড়িটিকে আটটি খন্ড করা হইয়াছে।
ছোট দুই ছেলে দুই মেয়ে আছে জমিরউদ্দীনের সাথে।বাকী সবাইকে আলাদা করিয়া দেওয়া হইয়াছে। প্রায় ১০০ বিঘা জমি তাহাদের। বিরাট গৃহস্থি বাড়ি।সকলেরই দুই তিন হাল করিয়া গরু আছে।গরুতেও বাড়িটা ভরিয়া আছে।যাহাকে বলে গোয়ালভরা গরু,গোলাভরা ধান,পুকুর ভরা মাছ।আর সেই কৃষক বাড়ি।
অঘ্রাণে যখন ধান কাটা পড়িয়া যায়,তখন পুরো বাড়িটাতে একমাস ব্যাপী কাজ লাগিয়া থাকে।একটার পর একটা জমির ধান কাটা,লওয়া আর খড় শুকানো,খড়ের কুঞ্জি দেওয়া,মনে হয় কাজ শেষ হইতেই চায় না।রোদে,বৃষ্টিতে সকলের মুখই রোদে পোড়া লাগে।আর শরীর দেখতে শক্তপোক্ত লাগে ।আর সরিষার তেলে মাথা, শরীর চকচক করে।
শোবার জন্য আছে কাঁথা,তেলতেলে বালিশ।শীত এলে ঘরের চৌহাটের নীচে খড় পাকাইয়া দিয়া রাখে,যাহাতে ঠান্ডা ঘরে ঢুকিতে না পারে। কাঁথা গ্রামবাংলার মানুষের আদি সম্বল।প্রত্যেক বাড়ির পরিবেশই এমন।
মাটির হাঁড়ি-পাতিল। আর কলস দিয়া রাস্তার মাথা হইতে খাবারের পানি আনিতে হয়।সেই টিউবওয়েলের কাছে গাঁয়ের মেয়েদের লাইন পড়িয়া থাকে।আবার কেউ পুকুরের পরিস্কার পানি সিদ্ধ করিয়া পান করে। আজকের মত এত সুপেয় পানির ব্যবস্থা ছিল না।ছিল না এত টিউবওয়েল। কোনে কোনো এক গ্রামে একটি টিউবওয়েল চেয়ারম্যান মেম্বারগণ বসাইতো।

২.
লোকজনের চরের এই স্থানটি নিয়া বাপদাদার আমল হইতেই এমন উজবুক কৌতুহল আর নানা কথাবার্তা ভয়ভীতির কথা,গল্প মুখে মুখে রটনা হইয়া আসিতেছে।জমিরউদ্দীনও তাহার বাবা ওসমানউদ্দীনের মুখে ভুতের নানা কথা শুনিয়াছে। আবার কখনো কখনো বাস্তবেও ভয় পাইয়া ঐ স্থানে বেহুস হইয়া কেউ কেউ পরিয়া থাকিতে দেখিয়াছে। তবে এমনিতে এ স্থানটি যে এত ভয়ংকর তা বুঝিবার কোনো জো নেই।
রাতের বেলা এ স্থানে কেউ মাছ ধরিতে যায় না।
গেলে দলবলে যায় আর দিনের বেলা ব্যতিক্রম।কেউ কেউ আবার কোনো সময়ই এই স্থানে ভয় পায় নাই। কেউ বলে কল্পনা কেউ বলে বাস্তব। তবে বৃদ্ধ জমিরউদ্দীন জানে এখানে সমস্যা আছে।তাই তার ছেলেমেয়ে বউ-বাচ্চা, নাতিনাতনিদেরকে বলিয়া রাখিয়াছে, এই স্থানে সাবধানে চলিতে।আর গেলেও সূরা কেরাত পড়ে শরীরে ফুঁক দিয়া যেন যায়।জমিরউদ্দীনও যে ভয় পায় নাই তাহা নহে।একবার অঘ্রাণ মাস।ধানে পাকা রং ধরিয়াছে।পাকিতে আরও সপ্তাহ খানেক লাগিবে।আর ধান পাকা ধরিলেই কৃষক জমির কাছে দিনে একবার হইলেও আসিবে।আবার চড়ুই ও বাবুইপাখিও নড়াইতে হয়। ঝাঁকে ঝাঁকে বাইল্যা মানে বাবুই পাখি ধান কাটিয়া নিয়া যায়।
শনি মঙ্গলবার এখনও গ্রামগঞ্জের লোক বউঝিয়েরা বাপেরবড়ি ও স্বামীরবাড়িতে যাওয়া-আসা করিতে চায় না।ইহাতে বাচ্চাকাচ্চা ও সুন্দরী যুবতীর উপর ভুতের কুনজর পড়িতে পারে। আর ভুতেও যে ধরে নাই, তাহা নহে।অনেক মাওলানা,কবিরাজ ভুতে ধরা এমন রোগীকে ঝাড়ফুঁক করিয়া ভালোও করিয়া থাকে।ইহা কুসংস্কার হইলেও ধর্মীয় দৃষ্টিতে সত্য। ভুত মানুষকে আছড় করিয়া থাকে।

আজ সকালে অনেক লোক নদীতে মাছ ধরিবার জন্য গিয়াছে। মাছের মাইর পড়ছে।
সবাই যে যার মত করিয়া যার যার মাছ ধরার জাল,পলো,লইয়া ছুটিছে।এই নদীর নাম সালদা।এখানে আসিয়া ইহা সাপের মত বাঁকিয়া গেছে।পানি ঘোলা।এ নদী ভারতের ত্রিপুরা হতে এসেছে। স্থানটির নাম কালামুইড়া।এখন অনেক বাড়ি-ঘর ও বসতী এবং আশ্রয়াণও সরকার স্থাপন করেছে।তবে ঘরগুলো দূর থেকে দেখিতে বেশ মনোরম লাগে।
নদীর তীরে ঝোপঝাড় কাঁচা রাস্তা। তবে এই বাঁকে একটি গভীর কুঁড়ও আছে।এই কুঁড়ে বন্যার সময় সালদার গভীর স্রোতে অনেক নৌকাও ডুবিয়া গেছে।
জমিরউদ্দীনও তার ছোট দুই ছেলে নিয়া মাছ ধরতে ছুটিয়াছে। সাথে নিয়াছে একটি বেড় জাল।দুইজন দুই মাথায় বাঁশের কঞ্চিতে ধরিয়া টানে।আর পানি পাক খাইয়া জালে ঢুকিতেই জাল টানিয়া তোলে।এতপ বেশ মাছ পাওয়া ধরা পড়ে। গুঁড়া মাছ বেশি পাওয়া যায়। তবে পুঁটি, টেংরা, পালগলস,দারখিলা,মলাইয়া,ইছা মাঝে বইচা ও টাকি মাছ পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ বড় শৈল ও বোয়াল মাছ পাইয়াছে। লোকজন দলবাঁধিয়া লাইন ধরিয়া পর পর একসাথে জাল ফেলে।এতে নদীর ঘোলা পানিতে মাছ সহজেই ধরা পড়িতেছে।জমিরউদ্দীন ও তার দুই ছেলে হাসু ও বাচ্চু মিয়াও বেশ মাছ পাইতেছে।

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

কতক্ষণ পর পর লোকজন চিৎকার করিয়া উঠে।অন্য গ্রাম হইতে একদল লোক পলো লইয়া নদীর দুইদিক দিয়া বড় মাছের আশায় ঝাঁপাইয়া হেইত হেইত করিয়া সামনে আগাইতেছে।আবার ডুলায় মাছও লইতেছে।
এই কালামুইড়া কুঁড়ের কাছে আসিতেই একটি লোক কোন সময় যে জলের পাকে ডুবিয়া গেছে তাহা কেউ বুঝিতে পারে নাই ও দেখে নাই। দুপুরে যখন সকলে যে যার বাড়িতে চলিয়া গেল,তখন সবাই বলাবলি করিতে লাগিলো জয়েন উদ্দীন কই,বলাবলি করিতে করিতে সকলে খোঁজ করিতে নদীর তীরে চলিয়া আসে।তখন কুঁড়ের কাছে তেমন লোকজন নাই।অনেকেই বলাবলি করিতেছে তাকে কুঁড় পর্যন্ত দেখিয়াছে।তাই কুঁড়ের কাছে গিয়া দেখে পলোটি ভাসিয়া আছে।তখন লোকজন পানিতে নামিয়া খুঁজিতে লাগিল।খুঁজিতে খুঁজিতে এক সময় পানির নীচে তাকে পাওয়া গেল।কেউ বলছে পলোতে একটি মাছ পড়ছিল। সে মাছ ধরতে হাতাহাতি করছে।আমরা দূর থাইকা দেখছি।
আমরাতো সামনে চইলা আইছি।তার দিকে কোনো খেয়াল নেইনি।সকলে ধরাধরি করিয়া লাশ নিয়া বাড়িতে আসিল।আর জনরব পড়িয়া গেল কুঁড়ে মানুষ চাইছে।জয়েন উদ্দীন কুঁড়ে পইরা মারা গেছে।সারা বাড়ি লোকে ভরিয়া গেল।আর বাড়িটা ও এলাকায় একটা শোকের ছায়া ও ভয় নামিয়া আইল।

এই স্থানটির প্রতি লোকজনের আরও ভয় বাড়িয়া গেল।কুঁড়ের কাছে আসিলেই শরীরে একটা কাঁপুনি দেয়।আবার মঠের কাছেও একটি পাগল এক রাতে পইরা মইরা রইছে।চকিদার পুলিশকে খবর দিয়া লাশ উঠাইয়া নিছে।কিন্তু এ লাশের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নাই।

৩.
জমিরউদ্দীনের বেশির ভাগ জমি কালামুইড়া কুঁড়ের আশেপাশে। তাই তাদেরকে বেশির ভাগ সময় সেখানে যাওয়াআসা করতে হয় জমি দেখার জন্য। আবার কেউ কেউ ঘাস কাটিবার জন্যও যায়।রাখাল গুলি চরে গরু দিয়া গাছতলায় খেলা করে। যদিও কুঁড়ে লোক মারা গিয়াছে। তথাপিও স্থানটিতে লোকজনের যাওয়া-আসা বন্ধ নেই। স্থানটিতে গেলে বেশ আনন্দ পাওয়া যায়। কোনোরূপ ভয় লাগে না।তবে একাকী থাকিলে ভয় লাগে।

তবে সে বছর গ্রাম জুড়ে কলেরা শুরু হইয়া গেছে। সন্ধ্যা হইলেই সবাই হাটবাজার শেষ করিয়া যার যার ঘরে চলিয়া যায়।আর গ্রামে মিলাদ,ঢোল পিটানো হয়,ভয় তাড়াইবার জন্য। কত যে ঝাড়ফুঁক তাবিজ গ্রামের পথের মাথায়, বাড়ির গাছে বাঁধিয়া রাখা হইছে।আর কিছু লোক দূরে ডাক্তারের কাছে গিয়া চিকিৎসা লইত।হাসপাতাল কি গ্রামে আছে? চিকিৎসা ছিল অপ্রতুল।কয়েক গ্রামেও একজন পল্লী চিকিৎসক পাওয়া যাইত না।আবার ঐ ডাক্তারকে সারাদিন এলাকা ঘুরিয়া বেড়াইতে হইত।

প্রত্যেক গ্রামেই লোক মারা যাওয়ার খবর আসিতেছে। কোনো ঘরে একজন,কোনো ঘরে দুই জন,পাঁচজন লোকও এক দুই রাতের মধ্যে মইরা গেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে সারাদেশে এ কলেরা ছড়াইয়া গেছে। আর নতুন কবরের হিড়িক। এমন অবস্থায় সকলে ঘাবড়াইয়া গেল।
জমিরউদ্দীনের পরিবারও ব্যতিক্রম নয়।এ বাড়িতেও এক সপ্তাহে নারীপুরুষ সহ দশজন লোক মারা গেল।জমিরউদ্দীনের বড় ছেলে,তার বউ,মেঝ ছেলে ও নাতিনাতনি অনেকেই মরে গেছে। বাড়ি জুড়ে শোকের ছায়া বিরাজ করিতেছে।রাত হলেই গ্রামগুলো নিঝঝুম হইয়া যায়।তেলের বাতি ও হারিকেনের আলো দিয়ে মানুষ রাতে চলাফেরা করিত।আর কেউ কেউ পাটকাঠি দিয়া মশাল বানাইয়া এ বাড়ি ও বাড়ি যেত।রাস্তায় থাকতো বাঁশের সাঁকো। কি করুণ দিন কেটেছে। আজকের মত বিদ্যুতের আলো,মোবাইল, পাকা রাস্তা, দালানকোঠা কিছুই ছিলো। তা বেশিদিন আগের কথা নয়।আজ থেকে ৫০ /৬০ বছর আগে মানে ১৯৭১ সালের আগে পরেও এমন পরিবেশ ছিল। তবে ১৯০০ সাল,যখন ব্রিটিশ ছিল ও তার আগের সময়টুকু কেমন ছিলো ভাবলে গা কেঁপে ওঠে।
তখন সারাদেশেই একটা ভুতুড়ে অবস্থা বিরাজ করতো।গাড়িঘোড়া বলতে ছিল পায়ে চাপার রিকশা।
এমন কথা ভাবতে ভাবতে চোখ বাহিয়া জল পড়িল জমিরউদ্দীনের।বৃদ্ধ হইয়া গেছে। তবু শরীরে বেশ শক্তি। কিন্তু মন ভারাক্রান্ত হইয়া গেছে। বয়সের ভারে মাঝেমধ্যে মনটা হাহাকার করিয়া ওঠে। পুত্র ও পুত্রের বউ, নাতিনাতনির শোকে মনটা কাবু হইয়া গেছে। কখন পরপারের ডাক আসিয়া যায়? তবে এবার নিয়্যত করিছে একটুকু জমি বিক্রি করিয়া হইলেও হজ্জে চলিয়া যাইবে।

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments