back to top
Wednesday, April 15, 2026
Homeসাহিত্যগল্পঅসম্পূর্ণ উপন্যাস 

অসম্পূর্ণ উপন্যাস 

মুহাম্মদ কাউছার আলম রবি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ২১ কিমি পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে এখনো বোধহয় রবি আর হিমির হাসির প্রতিধ্বনি জমা হয়ে আছে। চবি ক্যাম্পাসের শাটল ট্রেনের ঝিকঝিক আওয়াজটা তাদের কাছে ছিল কোনো এক অপার্থিব সিম্ফোনি।
​রবি ছিল বাংলা সাহিত্যের সেই মলাটবদ্ধ ডায়েরির মতো, যার কলম ধরলেই শব্দগুলো জীবন্ত হয়ে উঠত। আর হিমি? হিমি ছিল সেই কবিতার একনিষ্ঠ শ্রোতা। রবি যখন কলাভবনের ঝাউতলায় বসে নিজের লেখা নতুন কোনো গল্পের পাণ্ডুলিপি পড়ত, হিমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। রবির চেয়ে চার বছরের ছোট হওয়ায় পড়াশোনার জটিল চ্যাপ্টারগুলো রবির কাছেই সহজ হয়ে ধরা দিত হিমির কাছে।
​তাদের বিকেলের ঠিকানা ছিল জিরো পয়েন্ট অথবা কোনো নির্জন পাহাড়ের টিলা। রবি যখন উদাত্ত গলায় তার সদ্য লেখা কবিতাটা আবৃত্তি করত:
​”তুমি আমার সেই অসম্পূর্ণ উপন্যাসের শেষ পাতা,
যেখানে বিরহ নয়, কেবলই মিশে থাকে হাজারো নীরবতা।”
​হিমি রবির কাঁধে মাথা রেখে বলত, “আমাদের গল্পটা কিন্তু কখনো অসম্পূর্ণ হবে না রবি।”
​শাটল ট্রেনের জানালায় মাথা রেখে দুজনে কত সন্ধ্যা পার করেছে, কতবার ট্রেনের দুলুনিতে জীবনের হাজারো পরিকল্পনা বুনেছে। ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে তারা ঘুরে বেড়িয়েছে দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। পাহাড়ের মেঘ আর সমুদ্রের নোনা জল ছিল তাদের এই পবিত্র প্রণয়ের সাক্ষী।
​গ্র্যাজুয়েশন শেষ হলো। বাস্তবতার রুক্ষ পৃথিবীতে দুজনেই নিজের জায়গা করে নিল, জুটে গেল সম্মানজনক চাকরিও। সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পরিণয় আসবে। কিন্তু বিধাতা তখন আড়ালে বসে অন্য এক চিত্রনাট্য লিখছিলেন।
​বিয়ের কথা পাড়তেই আকাশ ভেঙে পড়ল দুজনের মাথায়। পারিবারিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম সুতোয় টান পড়ল। জানা গেল, তারা একে অপরের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। যে সম্পর্কের পবিত্রতা সমাজ মেনে নিতে পারলেও আমাদের সমাজ বাস্তবতার ‘রক্তের টান’ আর ‘নিকট আত্মীয়তার’ দেয়াল টপকাতে পারল না। যে পাহাড়ের টিলায় তারা সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই পাহাড়ের চেয়েও ভারী হয়ে দাঁড়ালো তাদের পারিবারিক পরিচয়।


​রবির যে হাতে গল্প জন্ম নিত, সেই হাত দিয়ে সে শেষবার হিমির অশ্রু মুছে দিতে পারল না। অদ্ভুত এক সামাজিক নিয়মের বেড়াজালে বন্দি হয়ে গেল তাদের বছরের পর বছর লালন করা প্রেম।
​আজ রবি আর হিমি একই শহরের ধুলোবালি মাখলেও তারা যেন অন্য গ্রহের বাসিন্দা। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল নৈশব্দ। রবি হয়তো আজও গভীর রাতে ডায়েরি নিয়ে বসে, কিন্তু গল্পের শেষ পাতায় আর হিমির নামটা লেখা হয় না। আর হিমি? সে হয়তো এখনো কোনো ভিড় ঠেলে শাটল ট্রেনের সেই পরিচিত জানালার সিটটা খুঁজে বেড়ায়, যেখানে এককালে রবির কবিতার খাতাটা সযত্নে রাখা থাকত।
​পাহাড়ের প্রতিধ্বনি আজও হয়তো রবির সেই কবিতার সুরটা মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু সেই সুর শোনার মতো মানুষটি আজ আর নেই। এক অপার্থিব হাহাকার আর অতৃপ্ত বেদনা নিয়ে চবি ক্যাম্পাসের সেই ঝাউগাছগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেমনটা দাঁড়িয়ে আছে দুই বিচ্ছেদী আত্মার নীরব দীর্ঘশ্বাস।

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

উৎসর্গঃ
প্রিয় মানবী মানসী অস্পরী অনন্য কে।

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments