Sunday, June 16, 2024
spot_imgspot_imgspot_img

চুরি

চুরি -শর্মিলা আক্তার বহ্নি

– শর্মিলা আক্তার বহ্নি

এক

গ্রীষ্মের দুপুর। চারপাশ খাঁ খাঁ করছে। আকাশে কয়েকটি কাক কা কা করে উড়ে যাচ্ছে। গ্রামটা একদম স্তম্ভিত হয়ে আছে। মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে দু’এক জন লোক পুকুরে গোসল করতে নেমেছে। পুকুরের পাশে প্রকাণ্ড একটি জামরুল গাছ। তার নিচে বসে আছে চার বন্ধু সিধু, নরেন, বাবু আর হাশেম। প্রতিদিনই এখানে তাদের গল্প চলে। কবে কার গাছ থেকে কোন ফলটা চুরি করবে, কোন গাছটাই ভালো আম হয়েছে, কোন সময়ে বাগানে লোক থাকেনা এসব আলোচনারই একমাত্র স্থান পুকুর পাড়ের জামরুল গাছটা। হাশেম বললো এই সিধু চলনা তোর দাদুর গাছ থেকে কয়টা আম পেড়ে আনি, আজকেই শেষবার। সিধু মাথা নেড়ে বললো নারে এবার ধরা পড়লে পিঠের চামড়া তুলে দেবে বাবা। হাশেম বলল আরে আজ ধরা পড়বোনা, এখন সবাই ঘুমাচ্ছে আর খানিকটা পর রাস্তা একদম ফাঁকা হয়ে যাবে, আর তাছাড়া আমি আর বাবু তো পাহারা দিচ্ছিই। তোর দাদু কিচ্ছু টের পাবে না। বাবু মাথা নেড়ে বলল হ্যাঁরে, শুধু আজকের দিনটা, তুই আর না করিস না চল। সিধু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল ঠিক আছে চল তবে আজকেই শেষ কিন্তু মনে রাখবি। রোজ রোজ তোদের জন্য ধোলাই খেতে পারব না। দাদুও কথা শোনাই আমি নাকি চুরি করে এটা ওটা খেয়ে বেড়ায়। হাশেম একগাল হাসি দিয়ে বললো তোর দাদু ভুল কি বলেছে আর। আমরা তো দিনরাত সেটাই করি। আর সত্য কথা শুনলে আমার তেমন রাগ হয়না। সিধু হাশেমকে থামিয়ে বলল, হয়েছে থাক এত ভালো সাজতে হবেনা আমার বাবার কেলানী খাইলে বুঝতিস। আচ্ছা নরেন তোদেরও তো অনেক গুলো আম গাছ আছে, তোদের গাছ থেকেতো দু’এক দিন আম পেড়ে খাওয়াতে পারিস। নরেন বলে, সে কথা আর বলিসনা, একটা আম পাড়লে আমার একটা হাতই কাটা যাবে। সবাই হি হি করে হেসে উঠলো নরেনের কথায়। হাশেম মজা করে বললো চুরি করা হাত কাটা গেলে চোরের অমঙ্গল হয়। এবার আরো জোরে হাসির রোল পড়ে গেলো হাহাহাহা। সিধু বললো আচ্ছা থাক এখন উঠে পড় দেরি হয়ে গেলে কিন্তু দাদু এসে পড়বে। আমি কিন্তু আজ আর গাছে উঠতে পারব না। তাছাড়া কাল গাছ থেকে তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে একটা আদলা ইটের উপর পড়ে গিয়ে আমার হাঁটুতে বড্ড লেগেছে। হাঁটুর চামড়া উঠে গিয়েছে একদম। ব্যাথায় টনটন টনটন করছে আমি আর কিছুতেই গাছে উঠবোনা। আর তোরা তো আমাকে ফেলে কাল হুড়মুড় করে পালিয়ে গেলি বেঈমানের দল। নরেন বলে উঠলো আচ্ছা আজ আর কেউ পালাবো না তোকে রেখে এই নাক মলছি, কান মলছি, কথা দিচ্ছি হা হা হা। গল্প করতে করতে তারা আম বাগানের ভিতর ঢুকলো। ১০,১২ টা বিশাল বিশাল আম গাছ। সব গাছগুলোই সিধুর দাদুর অনেক পুরনো আমগাছ। গাছগুলো বেশ মোটা। তবুও কেমন সুর সুর করে উঠে পড়ে সিধু।

বাগানে গিয়েই দেরি না করে হাশেম গাছে উঠে পড়লো তারপর চটপট করে আট দশটা আম পেড়ে নিচে নেমে এলো। যাক বাবা,তোর দাদু এখনো আসিনি তাড়াতাড়ি চল এখান থেকে। আমগুলো নিয়ে ওরা সোজা চলে গেল নদীর ধারে। নদীর পাশেই হাশেমদের বাড়ি। হাশেম বাড়ি থেকে একটা ছুরি, কিছু লবণ আর কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা নিয়ে নিলো। লবণের সাথে লঙ্কা গুলো চটকে তারা আমগুলো খাবে। এভাবে আম খেতে তাদের বেশ ভালো লাগে। প্রতিদিনই একইভাবে তারা আম খায়। নরেন আর বাবু মিলে আমগুলো কাটলো। তখনো ভর দুপুর, বাসাই ফেরার কথা ভুলেই যায় ওরা। হাশেম তো প্রায়ই লোভের বশে বলেই ফেলে লবণ কাঁচা লঙ্কার সাথে কাঁচা আম মাখা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার। কাঁচা আম মাখা দেখলেই যে জিব্হায় জল চলে আসে। সিধু হেসে বলে তোদের সুস্বাদু খাবার খাওয়াতে গিয়ে রোজ রোজ কত মিথ্যে কৈফিয়ত দিতে হয় আমার। কবে না জানি দাদুর কাছে ধরা খেয়ে যাই। কথা বলতে বলতে তারা আম মাখা খেলো। লবন ও কাঁচা লঙ্কা মাখানো আমগুলো নিমেষের মধ্যে খেয়ে শেষ করে ফেললো। আম খেয়ে সবার জিব্বাই ঝাল লেগে গেছে। বাবু হাশেমকে বললো যা তো একটু চিনি নিয়ে আয়। এসব নিয়ে অনেক হাসাহাসির পর তারা সেখানে বসেই গল্প করতে লাগলো।
ক্লান্ত দুপুরে কৃষক, পথিক ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে‌। পাখিরাও ক্লান্ত হয়ে যায় দুপুরের পরে। কিন্তু ওদের কোন ক্লান্তি নেই। বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া নেই তাদের। মাথার উপর দিয়ে পাখিরা উড়ে যায়, গাছ থেকে কিছু শুকনো পাতা ঝরে পড়ে সেদিকে তাদের খেয়াল পযর্ন্ত নেই। ওদের ক্লান্তিহীন গল্প চলে গাছের ছায়ার তলে অনাবিল আনন্দে।

দুই

এদিকে সিধুর দাদু খাওয়া-দাওয়া গোসল সেরে আম বাগানে এসে হাজির হলো। এসেই তিনি লক্ষ্য করলেন গাছ তলায় অনেক কাঁচা ডাল আর আমের পাতা পড়ে আছে। তার আর বুঝতে বাকি রইলোনা এটা কাদের কাজ। তিনি একা একাই বলে উঠলেন সেই হতচ্ছাড়ারা আবার আম পেড়ে নিয়ে গেছে। ওদের কাজ ছাড়া আর কারো কাজ হতে পারে না এটা। সিধু ছেলেটা ওদের সাথে মিশে বড্ড খারাপ হয়ে গেছে। ইদানিং প্রায়ই যার তার গাছ থেকে ফল পেড়ে কোথায় লুকিয়ে বসে খায়। বাড়িতেও থাকেনা ঠিকমতো। ওর বাবাকে আরেকবার ভালো করে বলতে হবে ব্যাপারটা, যাতে ওই বজ্জাতদের সাথে না মিশতে দেই। বলতে বলতে তিনি গাছের নিচে পাতা চরাট এর উপর উঠে বসলেন। হাতের লাঠি টা পাশেই ঠেস দিয়ে রাখলেন। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি আমবাগানেই কাটিয়ে দেন। খবরের কাগজ পড়েন অথবা গল্পের বই পড়েন বাগানে বসেই আর মাঝেমধ্যে কেউ আসলে কিছুক্ষণ পুরনো দিনের গল্প করেন। প্রতিবছর আমের সময় এলেই তিনি আম পাহারা দিতে বাগানে বসে থাকেন। গাছের নিচে পাতা চরাট টা বেশ বড়ই, চারটা বাঁশের খুঁটি আর উপরে কাঠ দেওয়া। গত বছর এটা বানিয়ে দিয়েছে সিধুর বাবা। দুজন লোক খুব অনায়াসেই শুয়া যাবে। তার উপর একটা শীতল পাটি পাতা। সিধুর দাদা সিদ্দিক সাহেব সেখানে শুয়েই বাগান পাহারা দেন। ঘুম পেলে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়েন। খাওয়া গোসল ছাড়া খুব একটা বাড়ি চান না তিনি। রাতটাও আমবাগানে কাটাতে চান কিন্তু ছেলের অনিচ্ছার কারণে তিনি কোনরকম রাতটা বাড়িতে থেকেই খুব ভোরে আবার বাগানে চলে আসেন। সিদ্দিক সাহেবের একমাত্র ছেলে সিধুর বাবা ‘সফিক সাহেব’। স্বলভাষী ও গুরুগম্ভীর টাইপের লোক তিনি। ভীষণ রাগী ও নিশ্চুপ।

তিন

কিছু সময় গল্প করার পর তারা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সিধুর পায়ের ব্যাথাটা ক্রমশ বাড়ছে তাই সে আর বেশি ঝাপাঝাপি করতে পারলো না। প্রতিদিন ওরা নদীতে দু-তিন ঘণ্টা ধরে গোসল করে নিয়ম করে। পাল্লা দিয়ে এপার থেকে সাঁতরে ওপারে যায়। আম চুরি, স্কুল পালানো, নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি তাদের প্রতিদিনের রুটিন। আজ ওরা খানিকটা গোসল করে উঠে পড়লো তারপর যে যার বাড়ির দিকে রওনা দিলো। সিধু মাথা নিচু করে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলো। বাগানের কাছে আসতেই সিদ্দিক সাহেব তাকে ডাক দিলো এই সিধু, সিধু এদিকে আয় দেখি। সিধু মাথা তুলে দেখলো চরাটের উপর দাদু বসে আছে। সিধু চেঁচিয়ে বললো এখন আসতে পারছিনা পায়ে খুব ব্যথা করছে আমি বাড়ি যাচ্ছি। সিদ্দিক সাহেব গলা উঁচিয়ে বলে উঠলো- চুরি করে আম খেতে গেলে পায়ে তো ব্যথা করবেই হতচ্ছাড়া। বাড়িতে যা বুঝবি মজা। সারাদিন শুধু আম আম আর আম। সিধু দাদুর কথায় কোন পাত্তা না দিয়ে হনহন করে হাঁটা শুরু করলো। সিধু হাঁটছে আর মনে মনে ভাবছে এতক্ষণে নিশ্চয়ই বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে। মাকে কিছু একটা বলে বুঝিয়ে দিলেই হবে। যত অন্যায় করিনা কেনো মা কিছুক্ষণ বকা দেওয়ার পর ঠিক আবার ভালোবেসে কাছে ডাকে। তবে বাবার কাছে রক্ষা নেই।

কিছুদূর যেতেই সে থমকে দাঁড়ালো। যেন রাস্তার মাঝে কি একটা অদ্ভুত জিনিস দেখে ফেলেছে সে। সিধু যা দেখে থমকে দাঁড়ালো সেটি হলো তার বাবা। সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো মাথা নিচু করে। মনে মনে বলল বাবা এখনো বাড়ি থেকে যায়নি ইস, যদি আরেকটু দেরি করে আসতাম তাহলে আর বাবার মুখোমুখি পড়তে হতো না। এসব ভাবতে ভাবতে মাথা উঁচু করে দেখে সামনে কেউ নেই। কি হলো? বাবা আমাকে কিছু না বলেই চলে গেল যে। সিধু পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো বাবা অনেকটা দূর চলে গিয়েছে। সে এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো যে বাবা কখন তার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে সে কিছুই টের পায়নি। ভাবতে লাগলো, বাবা আমাকে দেখে দাড়িয়ে পড়লো ঠিকই কিন্তু কিছু না বলেই চলে গেলো এটাতো তো হয়না। তবে কি আমি ভুল দেখলাম? না ভুল দেখিনি তো আমি আমার রাগী বাবাকে খুব ভালো করে চিনি। যাক এখন এর মতো বেঁচে গেছি।
সিধু বাড়ির ভিতরে ঢুকে কলের পানি দিয়ে আবার খানিকটা গোসল করে নিলো। নদীতে গোসল করে বাড়ি আসতে আসতে তার গা অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ পিছন থেকে পিঠের উপর একটা বজ্রপাত হয়ে গেল, পিট বাঁকা হয়ে রইলো অনেকক্ষণ। সোজা হলো না। কিলটা বেশ পোক্ত ছিলো। চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে দেখে মা। কি আশ্চর্য! মা এসে কিছু না বলেই পিঠের উপর দুড়ুম করে কিল বসিয়ে দিলো, ব্যথায় যে পিট টা সোজা করতে পারছিনা। তারপর সিধুর বাম কানটা ধরে বলল কোথায় ছিলি সকাল থেকে? ফের আবার কার গাছ থেকে আম চুরি করে খেয়ে এলি শুনি? সিধু উফ উফ লাগছে মা কানটা আগে ছাড়ো তারপর বলছি। তারপর কোনরকমে মার হাত থেকে কানটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললো- চুরি করিনি আজ। মা কে মিথ্যা বলতে গিয়ে সিধুর কথা বেঁধে বেঁধে গেলো। সোমলতা কিছু না বলে চলে গেলেন।

সিধু গোসল করে ঘরে এসে কেবলমাত্র বিছানায় শুয়েছে অমনি জানালার পাশ থেকে শোনা গেল নরেনের গলা। শুধু তাকিয়ে দেখলো নরেন জানালায় উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিধু খাট থেকে নেমে খোঁড়াতে খোঁড়াতে জানালার কাছে গেলো। গিয়ে বলল, এখন আমি যেতে পারবনা তোরা যা আমি বিকালে আসবো। এখন বাড়ি থেকে বের হবার কোনো সুযোগ নেই মার কড়া নজরদারি চলছে নরেন তবুও হাল ছাড়লো না। আবার বলল আয় না তোর মা দেখতে পাবেনা। ঠিক সেই সময় সোমলতা খাবারের থালা নিয়ে ঘরে ঢুকলো। সোমলতা সিধুর মায়ের নাম। তাকে দেখেই নরেন বিদ্যুতের গতিতে নিচে বসে পড়ল, সোমলতা সেটা লক্ষ্য না করলেও সিধুকে এসে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো কি আবার বুঝি বেরিয়ে পড়ার সময় হয়েছে? এবার কার গাছ থেকে কি চুরি করে খাওয়া যায় সেটাই ভাবছিস নিশ্চয়? সিধু বললো না আমি একটু পাখি দেখছিলাম বাইরে। সোমলতা বললো পাখি তো রোজ দেখিস। তোদের জন্য পাখিগুলোও প্রাণের ভয়ে থাকে। তোদের অত্যাচারে বনের পাখিরাও অতিষ্ট। এখন অত বাইরে যাওয়ার ফন্দি আটতে পাখি দেখে কাজ নেই এবার খেয়ে নে। সিধু আস্তে আস্তে হেঁটে খাটের কাছে এলো। তাকে খুড়িয়ে হাঁটতে দেখে সোমলতা জিজ্ঞেস করল, এই সিধু তোর পায়ে কি হয়েছে রে? আজ চুরি করতে যেয়ে নিশ্চয় ধরা খেয়ে পালাতে গিয়ে কেটে গেছে। সিধু বলল না কিছু হয়নি। তারপর সে খাবারের থালার সামনে এসে বসলো, তার এখন মোটেও খিদে নেই আম খেয়ে পেট ভরে গিয়েছে। কিন্তু উপায় নেই খিদে না থাকলেও জোর করে খেতে হবে না হলে মা ঠিক ধরে ফেলবে যে আমি কিছু না কিছু চুরি করে খেয়েছি। সিধু হাত ধুয়ে খেতে শুরু করল। সোমলতা পাশের ঘরে গিয়ে আবার ফিরে এসে সিধুকে বলল পা টা সোজা কর দেখি, সিধু আস্তে আস্তে পা টা সোজা করল তারপর সমলতা সেখানে খানিকটা মলম লাগিয়ে দিলো। সিধু উফ করে চেঁচিয়ে উঠলো, মা কি লাগিয়ে দিলে খুব জ্বালা করছে তো। সোমলতা বলল চুপ থাক কিছুক্ষণ পর ঠান্ডা হয়ে যাবে, দেখবি ব্যাথাও কমে গেছে। পায়ে ব্যথা নিয়ে তো আর চুরি করতে যাওয়া যায় না তাই তাড়াতাড়ি সারয়ে তুলছি। সিধু বুঝতে পারলো মা তাকে চুরি করা নিয়ে ধিক্কার করে এসব কথা বলছে। বলুক তাতে কি! এসব কথা রোজ শুনে সে। সোমলতা ঘর থেকে চলে গেলো। সিধু খাওয়া শেষ করে একটু বিছানায় আরাম করে শুয়ে পড়লো। বহুদিন পর সে দুপুরবেলা বিছানায় শুয়েছে। শেষ কবে সে দুপুরে ঘুমিয়েছে তার মনে পড়ে না। মনে পড়ার কথাও না। পায়ে ব্যথা না থাকলে এতক্ষণে কখন যে মাকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে পড়তো। কিছুক্ষন শুয়ে থাকার পর সিধু ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। সিধুর ঘুমানোর পর আরও দু’বার জানালার কাছে এসে নরেন ডেকে গেছে কিন্তু সিধু ক্লান্ত হয়ে গভীরভাবে ঘুমাচ্ছে। কিছু টের পর্যন্ত পাচ্ছেনা। তৃতীয়বার আবার ডাকতে এলেই সোমলতা তাকে দেখে ফেলে। কিছু বলার আগেই নরেন দৌড় দিলো। সিধু, নরেন, বাবু, হাশেম এরা চারজনই পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। সিধু, নরেন আর বাবুর বয়স ১০ বছর। হাশেম ওদের থেকে এক বছরের বড়। ক্লাস থ্রিতে একবার ফেল করাই এখন সিধুদের সাথেই পড়ছে।

চার

সিধুর যখন ঘুম ভাঙলো তখন ঠিক ৬ টা বাজে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখন আর বাইরে যাওয়া যাবে না। মনে মনে ভাবল আজ বিকালে তার অনুপস্থিতিতে নরেন, বাবু আর হাশেম মিলে হয়তো কিছু একটা চুরি করে খেয়েছে। নিশ্চয়ই আমার জন্য রেখে দেবে ওরা, কাল সকালে স্কুলে গেলে আমাকে দেবে।

সন্ধার পর সিধু পড়তে বসলো।সোমলতা উঠানের উনুনটা ধরিয়ে রান্না করতে বসলো। আজ আম ডাল রান্না করবে সঙ্গে আলুর ভর্তা। আম ডাল সিধুর বাবার খুব পছন্দের। তাই আমের সময় প্রায়ই সোমলতা আম ডাল রান্না করে।

সিদ্দিক সাহেব বাগান থেকে বাড়ি ফিরে এসে সোমলতাকে জিজ্ঞেস করলো সিধু কি বাড়িতে আছে নাকি বেরিয়ে পড়েছে? সোমলতা উত্তর দিলো সিধু ঘরে পড়ছে বাবা। সিদ্দিক সাহেব একটু নিঃশ্বাস ফেলে বললো, যাক বা বা ও বাড়িতে থাকলে আমার আম বাগানটা নিরাপদে থাকে আর আমিও নিশ্চিন্তে থাকি। সিধু ঘর থেকে দাদুর সব কথা শুনতে পেলো, মনে মনে একটু রাগ হলো তার‌। তারপর ভাবলো দাদু তো ঠিক কথায় বলেছে। সত্য কথা শুনে রাগ করতে নেই। সিধুর দাদু আস্তে আস্তে গিয়ে সিধুর ঘরে ঢুকলো। সিধু টের পেলো কিন্তু পিছনে ফিরে তাকালো না। তার লাঠির খট খট শব্দে খানিকটা দূর থেকেই টের পাওয়া যায় যে উনি আসছেন। এসে সিধুর খাটের উপর বসলেন। কি পড়ছিস সিধু? দে দেখি বইটা এদিকে দে পড়া ধরি। অনেকদিন পড়া ধরা হয়না। সিধু আগে থেকেই জানতো দাদু ঘরে এলেই তার পড়ালেখার দক্ষতা যাচাই করবে। পড়া ধরার এই ব্যপারটা সিধুর একদম পছন্দ হয়না। রাগ করে মনে মনে বলে চললো- ঠিকমতো চোখে দেখতে পায়না তবুও চশমা লাগিয়ে যেভাবেই হোক আমার পড়ার দক্ষতা তার যাচাই করা চাই। আমি যে লেখাপড়ায় এত অদক্ষ তা বারবার প্রমাণ করার কি আছে। দাদু এখন পড়া ধরলে আমি কিছু পারবোনা। তারপর দাদু যা যা বলবে, তা মা উঠান থেকে সব শুনে ফেলবে।

সিধু আস্তে আস্তে বইটা দাদুর দিকে এগিয়ে দিলো।বইটা হাতে নিয়ে তিনি অনুসন্ধিনসু দৃষ্টিতে বইয়ের দিকে তাকাতেই, উঠান থেকে কে যেন ‘সিদ্দিক সিদ্দিক’ বলে ডেকে উঠলো। তিনি বইটা রেখে বললেন কে? বাইরে থেকে উত্তর এলো আমি শিলু। সিদ্দিক সাহেব আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঘর থেকে বের হতে হতে বললেন আরে শিলু তুই এসেছিস? খুব ভালো করেছিস‌। কত বছর পর তোকে দেখলাম। দুজনে হাত ধরে মুখের দিকে চেয়ে আছে। সিধুও দাদুর পিছুপিছু বাইরে এলো ঘর থেকে। সিদ্দিক সাহেবের মনে আজ আনন্দের শেষ নেই। বহুবছর পর পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা। আয় ঘরে আয়! আজ তোর সাথে মন খুলে গল্প করবো‌‌। তারপর সিধুর দিকে তাকিয়ে বললো- শোন দাদাভাই এই শিলু আমার বাল্যকালের বন্ধু। কত যে খেলা করেছি একসাথে, মাঠে গিয়েছি, রাতে একসাথে ঘুমিয়ে কত গল্প করেছি। কত কথা জমা রয়েছে এই বুকটার ভেতরে। এসব বলতে বলতে তিনি চশমাটা খুলে চোখ মুছলেন। তিনি আবেগপ্রবণ একজন মানুষ। কান্না ধরে রাখতে পারেন না। অল্পতেই হু হু করে কান্না করে ফেলে। সিধুর খুব মন খারাপ হলো। ভাবলো তবে কি হাশেম নরেন বাবু এরাও এক সময় আলাদা হয়ে যাবে? সিধু দাদুর চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের দুই বন্ধুর গল্প শুনছে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে। তখনো সোমলতার রান্না শেষ হয়নি। উঠানের দক্ষিণ পাশটাই দুইটা মাটির চুলা। অন্ধকারের মাঝে মাটির চুলার রাঙা আগুন টগবগিয়ে জ্বলছে। বারান্দায় একটা চৌকি পাতা। সেখানে বসেই গল্প করছে তারা আর সিধু নিরবে গল্প শুনছে। সিধু দাদুর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললো- দাদু তোমার বন্ধু কি আজ আমাদের এখানেই থাকবে? দাদু খুব জোর একটা হাসি দিয়ে বললো, ও এখানে থাকবে ছাড়া আর কোথায় থাকবে। আমরা বাল্যকালের বন্ধু, আজ আমরা দুজনে সারারাত ধরে গল্প করবো। একথা শুনে সিধুর খুব ভালো লাগছিলো আর মনে মনে অনেক খুশি হলো। কারণ বাড়িতে কোন আত্মীয় এলে বাবা তাকে কিছু বলেনা। এই লোকটা থাকলে সিধুর বেশ সুবিধায় হবে আর বাবার বকুনি খাওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে। আনন্দে সিধুর মনটা নেচে উঠলো।

পাঁচ

পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো তখন শিলু এসে বলল, থাকো দাদুভাই আমি তাহলে আসি। সিধু বলল আবার আসবেন দাদু। লোক হাসি দিয়ে বললো ভালো থেকো সবসময়। কিছুক্ষণ পর লোকটা চলে গেলো সিধুও স্কুলের দিকে যাচ্ছিলো। রাস্তায় নরেন, বাবু আর হাশেম দাঁড়িয়ে আছে। সিধুকে দেখেই ওরা বলে উঠলো কি রে তোর আসতে এত দেরি হলো কেন? সিধু বললো আগে বল কাল বিকালে তোরা কি চুরি করে খেয়েছিস? নরেন বলল কিছুই খাইনি তুইতো ঘুমাচ্ছিলি আর হাশেম ওর বাবার সাথে মাঠে চলে গেলো তাই আর কিছু খাওয়া হয়নি। তাতে কি আজ খাবো। একটা ক্লাস করে পালিয়ে বকুলদের সিঁদুরে আম গাছ থেকে আম পেড়ে খাবো। গাছটা একদম আমে ভরে গেছে। টকটকে লাল আম থোকা থোকা ঝুলে আছে। কাল বিকাল আমি আর বাবু গিয়ে দেখে এসেছি। জায়গাটা একটু জঙ্গলের মতো, ধরা পড়ার কোনো ভয় নেই। এসব বলতে বলতে তারা স্কুলে পৌঁছালো।

নরেনের কথা মতো একটা ক্লাস পরে তারা স্কুলের পাঁচিল টপকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলো বকুলদের সেই বড় সিঁদুরে আমগাছটার নিচে। সিঁদুরে আম দেখতে এতটাই লোভনীয় হয়ে থাকে দেখে যেন লোভ সামলানোই কষ্ট। সিঁদুরের মতো লাল টকটকে থোকা থোকা আম গুলো দেখতে বেশ চমৎকার লাগছে। নরেন আর হাশেম বইগুলো মাটিতে রেখে গাছে উঠে পড়লো। সিধু চারদিক তাকিয়ে দেখলো ঘন জঙ্গলে দূরের কিছুই দেখা যায় না। তবে বাম দিকে তাকালে দেখা যায় খানিকটা দূরে বকুলদের বাড়ি।বাড়িতে কোন লোকজন চোখে পড়ছে না। বকুলদের বাড়ির লোকসংখ্যাও কম। বকুলের মা বাবা আর বকুল এই তিনজন নিয়েই তাদের ছোট পরিবার। বকুলের মা খুবই ভালো মানুষ। কিন্তু বকুলের বাবা জমের মতো কড়া, নিষ্ঠুর ব্যক্তি। বাচ্চারা ভয়ে তার থেকে দূরে থাকে। এক কথার মানুষ তিনি। সিঁদুরে আম গাছটার পাশে একটা বহুদিনের পুরনো জীর্ণশীর্ণ একটা কবর। কবরের চারপাশের দেওয়ালের খানিকটা ভেঙে পড়েছে। শ্যাওলা জমে আছে দেয়ালের গায়ে। অনেক বছরের পুরনো কবরের দেয়ালের ইটগুলো তাদের অস্তিত্ব হারিয়েছে। চারপাশে বুনো গাছপালায় ভরা জাপসা বন। নরেন কয়েকটা আম পেড়ে নিচে ফেললো। সিধু নিচু হয়ে আমটা তুলতে গিয়েছে আর তখনই পিছন থেকে কে যেন তার পিঠে লাঠি দিয়ে এক ঘা বসিয়ে দিলো। সিধু মাগো-মাগো বলে চেঁচিয়ে উঠলো। নরেন ও হাশেম তাড়াহুড়া করে গাছ থেকে নেমে পড়লো। বাবু মাটিতে রাখা বইগুলো নিয়ে প্রথম দৌড় দিলো তারপর সিধু নরেন আর হাশেম একসাথে দৌড় দিলো। সিধু একবারও পিছন ফিরে তাকালো না। যে লোকটা তার পিঠে আঘাত করেছে তাকেও সে ভালো করে দেখতে পাইনি। কারন লোকটা তখনো তাদের পিছন পিছন দৌড়ে আসছিলো। ভয়ে সিধু পিছনের দিকে না তাকিয়ে শুধু সামনেই দৌড়াচ্ছে প্রাণপণে। নরেন হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, বকুলের বাবা খুব সাংঘাতিক লোক। ধরতে পারলে আমাদের আস্ত রাখবে না। দ্রুত পালা!! কিছুদূর দৌড়ে যেয়ে সিধু দেখতে পেল একটা কালো কুচকুচে কেউটে সাপ সো সো করে তার সামনের দিকে আসছে। সিধুর পায়ের শব্দে সাপটা দাঁড়িয়ে পড়লো। সিধু নরেনকে ডাক দিলো, নরেন এদিকে আয় জলদি। নরেন থেমে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো কি হলো আয়। পিছন ফিরে দেখলো বকুলের বাবা আর তাদের পিছন পিছন আসছে না। সিধু নরেন কে এদিকে আসতে বললো ভয়ার্ত চোখে। নরেন সিধুর কাছে এলে সিধু নরেনকে সাপটা দেখালো। বাবু আর হাশেম ও সেখানে এলো। হাশেম বললো তোরা এখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে সাপ দেখছিস? কামড়ে দিলে বুঝবি। নরেন এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা আদলা ইট এনে খুব সাবধানে সাপটার মাথায় বাড়ি দিয়ে তার কাল্লাটা ছেচে থেতলো করে দিলো। দু’তিন বার মারার পর বললো যা মরে গেছে এবার। তারপর হাতের ইটটা দূরে চেলে ফেলে দিলো। হাসেম বলে উঠলো খামোখা সাপটা মারলি? আমাদের কি কোন ক্ষতি করেছে? নরেন বললো আমাদের ক্ষতি করিনি তবে অন্যদের তো ক্ষতি করতে পারতো। আর একবার যদি এই কেউটে সাপ কারো কামড়ায় তাহলে সে সাথে সাথে মারা যাবে। সিধু এতক্ষণ চুপ করে ছিলো তারপর সে নরেনকে বললো- বাহ্! নরেন তোর তো দেখছি সাপ মারার ভালো দক্ষতা আছে। নরেন হেসে বললো চল এবার। সিধু বললো এখনো তো স্কুলে ছুটি হওয়ার ‘দুই’ ঘন্টা বাকি আছে এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে থাকবো? নরেন আবার হেসে উত্তর দিলো- কোথায় আবার, নদীর ধারে থাকবো। তারপর তারা চারজন নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করলো।নদীর ধারে এসে তারা প্রতিদিনের মতোই বড় একটা কড়াই গাছের নীচে বসলো। কিছুক্ষণ গল্প করার পর তারা স্কুলের শার্ট খুলে মাথার নিচে দিয়ে বইগুলো পাশে রেখে গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়লো। ক্লান্ত হয়ে কখন যেন চারজনই গাছের তলে ঘুমিয়ে পড়লো। শীতল ঝিরঝির বাতাসে তাদের বইয়ের পাতাগুলো একটা একটা করে ওল্টাতে লাগলো।

Facebook Comments Box
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments