Sunday, June 16, 2024
spot_imgspot_imgspot_img
Homeসাহিত্যপ্রবন্ধ/নিবন্ধএমভি সালাউদ্দিন এবং ইন্সুরেন্স কোম্পানি

এমভি সালাউদ্দিন এবং ইন্সুরেন্স কোম্পানি

ঢাকা থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশ্য এমভি সালাউদ্দিন লঞ্চটি যাবে। ঢাকার সদরঘাট থেকে এমভি সালাউদ্দিন লঞ্চটির যাত্রা শুরু হল। যাত্রীদের মধ্যে কেউ বেড়াতে যাবে। কেউ তার এলাকায় ছুটি কাঁটাতে যাবে। কেউ আত্মীয় স্বজনকে দেখতে যাবে। কেউ অফিসিয়াল কোন কাজে এবারই প্রথম লঞ্চে করে চাঁদপুর যাচ্ছে। হরেক রকম যাত্রীদের লঞ্চটি পরিপূর্ণ। উৎসব আমেজে লঞ্চটি চলছে। শহরের মত লঞ্চের জ্যাম থাকে না। নদীর খোলা জলরাশিতে লঞ্চটি দ্রত গতিতে চলছে। যাত্রীদের মনে নানান ধরণের চিন্তা ভাবনা।

লঞ্চটি পুরুষ যেমন আছে মহিলা শিশু ও আছে। সাঁতার জানা লোক যেমন আছে সাঁতার না জানা লোকও আছে। কেউ লঞ্চের ছাদের উপর বসে আছে। কেউ ভিতরে। কেউ অপরিচিত মানুষজনের সাথে পরিচয় হওয়ার জন্য কথা চালাচালি করছে। যারা পরিচিত তারা তাদের অতীত স্মৃতিচারণা করছে। যারা জীবনে প্রথম লঞ্চ ভ্রমণ করতে এসেছে তারা লঞ্চ ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করছে। বাহিরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে পুলকিত হচ্ছে। কারো মনেই কোন ভয় নেই। আতঙ্ক নেই। সবাই খুশি মনে যার যার কথাবার্তা কাজ কর্ম করছে। লঞ্চটি সদরঘাট থেকে নারায়নগঞ্জ আসার পরেই দুর্ঘটনায় পতিত হল। লঞ্চটি ধাক্কা লাগল বড় কার্গো জাহাজের সাথে। কার্গো জাহাজেটি ছিল অনেক বড় এবং দ্রতগতির। কার্গো জাহাজের চালক লঞ্চটিকে লক্ষ্য করেনি।

কার্গো জাহাজের ধাক্কায় যে লঞ্চটি ডুবে যাচ্ছে সেটিও খেয়াল করেনি। লঞ্চটির চালক কার্গো জাহাজের দ্রæতগতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে পারে নি। প্রায় চালকই এই ভূলটা করে থাকে। বাস, পিকআপ এর মত হঠাৎ লঞ্চ বা বড় জাহাজ বন্ধ করতে পারে না। কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে গেল। যারা সাঁতার পারে তারা লঞ্চ থেকে ঝাাঁপ দিয়ে তীরে উঠল। মহিলা বৃদ্ধ এবং শিশুরা লঞ্চের সাথে জলে তলিয়ে গেল। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা উদ্ধার করতে আসল। উদ্ধার তৎপরতার মধ্যে বীমা কোম্পানির লোকদের আনাগোনা বেড়ে গেল। উনারা প্রতিনিয়ত খোঁজ নিতে থাকেন কি হয়েছে না হয়েছে। বীমা কোম্পানির এহেন আচরণে সবাই একটু অবাক হল।

এটা ঠিক যে, লঞ্চটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে। অনেক লোক মারা গেছে। তাদের উদ্ধার তৎপড়তা চালাতে হবে। জীবিত উদ্ধার করা না গেলে অন্তত মৃত লাশগুলো উদ্ধার করে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। বীমা কোম্পানির লোকদের লাশ উদ্ধারের চেয়ে তাদের আগ্রহ অন্য দিকে বেশি। যারা জীবিত উদ্ধার হল তাদেরকে বীমা কোম্পানির লোকেরা বাহবা দিতে লাগল। যারা নিখোঁজ বা মৃত তাদের নিয়েই বীমা কোম্পানির লোকদের মাথাব্যাথা বেশি মনে হল। যখন কোন লঞ্চ ডুবে যায় তখন লঞ্চে কতজন যাত্রী ছিল তার পরিসংখ্যান খুব একটা পাওয়া যায় না। আনুমানিক ধরে নেওয়া হয়। কে কখন কোথায় যাতায়াত করেছে অনেক পরিবারের সদস্যরাই জানে না। ফলে আত্মীয় স্বজনরাও অনেক সময় জানেন না যে, তাদের নিকট আত্মীয় লঞ্চে ডুবে মারা গেছে। লঞ্চে আনুমানিক যাত্রী ছিল একশ জনের মত। তার মধ্যে দশজন মারা গেছে। বাকিরা উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজদের সংখ্যা এখনও জানা যায়নি।

এই রকম করেই নিউজ গুলো আসে। দিন কয়েক পরেই নিউজগুলো হারিয়ে যায়। এমভি সালাউদ্দিনের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। এমভি সালাউদ্দিনকে নদীর তলদেশ থেকে উঠিয়ে আনা হল। সচরাচর যেটা দেখা যায় যে, নদীর তলদেশ থেকে দুর্ঘটনায় উঠিয়ে আনা লঞ্চের ভিতরে শিশু মহিলা বা বৃদ্ধদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। দুর্ঘটনার সময় তারা লঞ্চ থেকে বের হতে পারে না। ফলে তাদের সলিল সমাধি হয়। এমভি সালাউদ্দিন লঞ্চের দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হল। তদন্ত কমিটিতে কার্গো জাহাজকে দুষারুপ করা হল। পাশাপাশি লঞ্চের চালকদের ও যে দুষ ছিল সেটাও তদন্ত প্রতিবেদনে দাখিল করা হর। তদন্ত প্রতিবেদনটি এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত।

তদন্ত কমিটি লঞ্চের দুর্ঘটনার বিষয়টা এখানেই শেষ করে দিলেন। তদন্ত কমিটিকে যারা তদন্ত করেন তারা অন্য একটি খবর তুলে আনল। যেই খবরটি শুনে একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুস সুস্থ স্বাভাবিক থাকতে পারবে না। খবরটি হচ্ছে, বীমা কোম্পানি লোকদের দুর্ঘটনায় এত আনাগোনা ছিল তাদের স্বার্থেই। লঞ্চটি বীমা করা ছিল। যাত্রীদের অনেকের নামেই বীমা করা আছে। ্এখন যাত্রীরা যদি মারা যায় তাহলে তাদের বীমা দাবি পরিশোধ করতে হবে। বেশিরভাগ বীমা কোম্পানি গ্রাহকদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে দেরি করে বা হয়রানি করে। বীমা করানোর সময় যতটা মধুর সুরে কথা বলে। বীমা দাবী আনতে গেলে মধু আর মধু থাকে না। পত্রিকায় যে খবরটি উঠে আসে তা হল, বীমা কোম্পানির লোকেরা ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর পূর্বেই এক দল ডুবুরি নামায়। ডুবুরিদের কাজ হল মৃত মানুষগুলির পেট কেঁটে দেওয়া। যাতে করে ফুঁলে লাশগুলি উপরে উঠতে না পারে। লাশের পেট কেঁটে দিলে লাশগুলো জলের উপরে উঠে আসতে পারে না।

নদীর প্রচন্ড স্রোতে লাশগুলো ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। কোন কোন লাশ কুমিরে খেয়ে ফেলে। বীমা কোম্পানির লোকেরা শুধুমাত্র বীমা দাবি পরিশোধ করবে বলে লাশগুলোকে জলের উপরে উঠতে দেয় না। তারা তাদের ডুবুরি দিয়ে লাশগুলোকে নদীর তলদেশেই দাফন কাফনের ব্যবস্থা করে দেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, তদন্ত কমিটি কেন এই সব ভয়ংকর পরিকল্পনাগুলো দেখতে পায় না বা তাদের তদন্তে উঠে আসে না। তদন্ত কমিটি নদীর তলদেশে গিয়ে তদন্ত করে না। এসির হাওয়ায় ঝুলন্ত চেয়ারে দুল খেতে খেতে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন। পত্র পত্রিকা থেকে বিভিন্ন নিউজ সংগ্রহ করেন।

কয়েকজন প্রতক্ষ্যদর্শীর স্বাক্ষাৎকার নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে ফেলেন। তদন্ত কমিটির মেয়াদ অল্প কয়েকদিন থাকে। সঠিক সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে না পারলে সমালোচনা শুনতে হয়। তাছাড়া বীমা কোম্পানির লোকদের হাত অনেক বড় থাকে। তারা তদন্ত কমিটির কয়েকজনকে কিনে নেন। বিশ জনের মৃতদেহ যদি বীমা কোম্পানি ঘায়েব করতে পারে তাহলে পাঁচ লক্ষ করে এক কোটি টাকা ঘায়েব করতে পারেন। তদন্ত কমিটি খেলেই কত খাবে। পাঁচ লাখ। উর্ধ্বে হলে দশ লাখ। দশ লাখ টাকা খরচ করে যদি নব্বই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ সেইভ করা যায় তাহলে বীমা কোম্পানির ক্ষতি কি? এই ঘটনার পরে কি ঘটে? অনেক লাশ খুঁজে পাওয়া যায় না।

আপনজন জানেই না যে, তাদের আত্মীয় মারা গেছে। সপ্তাহ, মাস বছর যায় তাদের আত্মীয় ফিরে আসে না। তাদের জীবনে কি ঘটেছে কেউ জানে না। বাংলাদেশে নিখোঁজ মানুষদের তালিকা করলে দেখা যাবে কম করে হলেও বিশ লক্ষ মানুষ নিখোঁজ। এই নিখোঁজ মানুষগুলির জীবনে কি ঘটেছে? যদিও ঘটনাটি গল্পের ছলে বলা। তবে বাস্তবে এমনটাই ঘটে। প্রতিটা লঞ্চ দুর্ঘটনার পড়ে এই ঘটনাগুলোই ঘটে। আমরা দুর্ঘটনা চাই না। বীমা দাবি ও চাইনা। কারো মৃত লাশও কামনা করি না। যদি কেউ মারা যায় তাহলে তার লাশটা যেন পরিবারের কাছে ফেরত দিতে পারি। যদি সম্ভব হয় তাহলে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারটিকে সাহায্য করতে পারি।

লেখক: কামরুল হাছান মাসুক
গ্রাম/পো: খেওড়া, থানা: কসবা, জিলা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Facebook Comments Box
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments