10.7 C
New York
Thursday, April 18, 2024
spot_img

সব মেঘে বৃষ্টি হয় না॥ এক কিষানপুত্রের আত্মজবান

বই পড়তে আমার ভালো লাগে। তাই বেছে বেছে বই পড়া আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। শুধু অভ্যাস না, অনেকটা নেশাও বলা যায়। বইমেলার পুরো মাঠ চষে বেড়িয়ে স্টলে স্টলে ঘুরে হাত দিয়ে স্পর্শ করে বই কেনাও আমার অভ্যাস।

আমার পছন্দে নির্দিষ্ট কোনো লেখক নেই। আমি হলাম সর্বভুৃক পাঠক। যখন যে বইটা ভালো লাগে সেটা পড়ে ফেলি।

২০২২ বইমেলায় স্টলে স্টলে ঘুরে বই কিনতে গিয়ে ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’র সামনে এসে দাঁড়াতেই একটা বইয়ের প্রচ্ছদে ‘সব মেঘে বৃষ্টি হয় না’ নাম দেখে চোখ আটকে গিয়েছিল। আসলেই তো। সব মেঘে তো বৃষ্টি হয় না।

বইটির লেখক আমার তেমন পরিচিত নয়। মাঝেমধ্যে পত্র-পত্রিকায় দু-একটা লেখা পড়েছি কি পড়িনি মনে করতে পারলাম না। কৌতূহলী হয়ে বইটা হাতে নিয়ে অভ্যাসমতো ফ্ল্যাপের লেখাগুলো পড়তে লাগলাম। লেখক পরিচিতি পড়ে জানলাম, আমার কাছে তেমন পরিচিত না হলেও এই লেখকের আরও দশটা বই বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। সূর্যঘড়ি, স¦রচিত নির্বাসন, স্বর্গগ্রামের মানুষ, পিতৃশোক ও দীর্ঘশ^াসের গল্প এবং নাকাল এবং আরও কিছু উল্লেখযোগ্য বইয়ের নাম দেওয়া আছে লেখক পরিচিতি শেষে। ফ্ল্যাপ পড়া শেষ হলে বইয়ের প্রথম পাতা উল্টে বইয়ের মূল শিরোনামের সাথে ‘এক কিষানপুত্রের আত্মজবান’ উপ-শিরোনাম দেখে একটু চমক লাগল। আত্মজবান শব্দটা অন্যরকম মনে হলো। এতে বইটা পড়ার কৌতূহলের মাত্রা বেড়ে গেল। আর তাই অন্য কিছু না ভেবে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ১৭৬ পৃষ্ঠার বইটি ২৫০ টাকা দিয়ে কিনে নিলাম।

বইটির নাম ‘সব মেঘে বৃষ্টি হয় না’ রাখা হয়েছে কেন?

অনেকেই বলেন, আত্মজৈবনিক বই লেখা বড্ড সহজ। ইচ্ছে হলেই চোখ বুজে স্মৃতিচারণা করলাম আর লিখে ফেললাম। মনে রাখা দরকার, আত্মজীবনী আর আত্মজৈবনিক উপন্যাস এক কথা নয়। আত্মজীবনীতে কল্পনা শক্তির প্রয়োজন নেই; কিন্তু আত্মজৈবনিক উপন্যাসের জন্য অবশ্যই কল্পনা আর ধী শক্তি থাকতে হয়। বাস্তবতা আর কল্পনার মিশেলে লেখক আত্মজৈবনিক উপন্যাস লেখেন। সত্য আর কল্পনার অভূতপূর্ব সম্মিলন ঘটে আত্মজৈবনিক উপন্যাসে। আর আত্মজীবমূলক উপন্যাসে লেখকের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা হুবহু বর্ণিত হয়। ইচ্ছে করলেই যে কেউ আত্মজীবনী লিখতে পারে না। এ কাজটি এত সহজ নয়। আত্মজীবনী লেখককে তার জীবনের ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই বর্ণনা করতে হয়। এজন্য তার প্রচুর সাহসের প্রয়োজন। ‘সব মেঘে বৃষ্টি হয় না’ কথাসাহিত্যিক বাসার তাসাউফের আত্মজবানে বলা একটা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে লেখক তার জীবনের সব কথাই অকপটে বলে দিয়েছেন। তবে আত্মজীবনী লেখতে যে একটা সফল জীবনের প্রয়োজন, অনেক ঘটনা, অনেক সমৃদ্ধ স্মৃতি থাকা প্রয়োজন, লেখকের বয়স ৭০ বা ৮০ হতে হয়, এমনটা মনে হয়নি। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে আত্মজীবনী লিখেছেন এই লেখক। এখনো তার জীবনের অর্ধেকটাও পার হয়নি। জীবনে সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারিত হতে এখনো বাকি অনেক সময় বাকি আছে আর এই মাঝ বয়সেই তিনি লিখে ফেলেছেন আত্মজীবনী! কী এমন ঘটনা ঘটেছে তার জীবনে যে আত্মজীবনী লিখতে উদ্ধুদ্ধ হলো। কৌতূহল আর আগ্রহ নিয়ে বইটা পড়া শুরু করলাম।

সাধারণত এ ধরনের বইয়ে কোনো বিখ্যাত মানুষের লেখা ভূমিকা থাকে। কিন্তু এই বইয়ে ভূমিকা লিখেছেন লেখক নিজে। ভূমিকা পড়েই বইটির নাম কেন ‘সব মেঘে বৃষ্টি হয় না’ বোঝা গেল। সব মেঘে যেমন বৃষ্টি হয় না তেমনি সব জীবনও সফল হ না। কিছু কিছু জীবন আছে ব্যর্থতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। তবে সফল জীবনের মতো ব্যর্থ জীবনেও একটা গল্প থাকে। যে গল্পটা কেউ বলে না। এ ক্ষেত্রে বাসার তাসাউফ একটু ব্যতিক্রম। তিনি ব্যর্থ জীবন নিয়ে আত্মজীবনী লিখেছেন। তিনি ভূমিকায় লিখেছেন, “…যুগে যুগে সফল মানুষদের জীবন ও কর্ম নিয়ে অজস্র আত্মজীবনীমূলক বই লেখা হয়েছে, তৈরি হয়েছে অসংখ্য নাটক-সিনেমাও। কিন্তু অসফল ও ব্যর্থ মানুষদের জীবন নিয়ে তেমন বই লেখা হয়নি, তৈরি হয়নি তেমন কোনো নাটক-সিনেমা। অথচ অসফল ও ব্যর্থ মানুষদেরও একটা জীবন থাকে আর সেই জীবনে একটা গোপন গল্পও থাকে। অনেক সময় অসফল মানুষদের কথা কেউ বলে না, কেউ শুনে না। তাদের গল্পগুলো অপঠিত থেকে যায়। আমি একজন অসফল মানুষ। আমার আব্বা একজন দরিদ্র কিষান ছিলেন। ফলে অনেক নিগূঢ়তা ও নিষ্ঠুরতা অতিক্রম করে জীবন চলার পথে আমাকে চলতে হয়েছে, পার হতে হয়েছে অসর্পিল ও কণ্টকাকীর্ণ অনেক পথ। কিন্তু গন্তব্য আজো রয়ে গেছে অচিনপুরে। সব পথেরই নির্র্দিষ্ট একটা সীমানা থাকে। কিন্তু আমার জীবন চলার পথের যেন কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আমি চলেছি তো চলেছি, না পেরিয়েছি সীমানা, না পেয়েছি গন্তব্য। জীবন চলার পথ অতিক্রম করে গন্তব্য পৌঁছাতে পারলে মানুষ অমরত্ব লাভ করে। অমরত্বে আমার লোভ ছিল না কোনোদিন। তাই হয়তো জীবনপথের দুর্গম সীমানা আমি পার হতে পারিনি।”

প্রধান চরিত্র

‘ভোর হয়েছে। কিন্তু এখনো সূর্য উঠেনি। প্রকৃতিজুড়ে এখনো রাতের আবহ রয়ে গেছে। চারদিকে আবছা আঁধার আর সুনসান নীরবতা। এমনিতেই কবরস্থানের পরিবেশ হয় নিঝুম ও নির্জন। শুধু টুপটাপ শিশির পতনের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। আব্বার কবরের নির্জলা মাটিতে গজিয়ে ওঠা সবুজ ঘাসের ওপরে শিশিরের চিহ্নটুকু মুছে দিয়েছে আমার চোখ থেকে নিসৃত নীরব অশ্রুকণারা…।’

(সব মেঘে বৃষ্টি হয় না, পৃষ্ঠা নং- ১১)

শুরুতেই লেখক ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই বইয়ের প্রধান চরিত্র তার পিতা। প্রথম অধ্যায়ে তার কিষান পিতার মৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে শুরু হলেও একজন সাধারণ কিষান কীভাবে জীবনসংগ্রামে উপনীত হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন তা বর্ণনা করার পাশাপাশি কিষানের অভাবী সংসারে স্ত্রী, সন্তান ও অন্যান্য চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোরও বর্ণনা করেছেন সুচারুরূপে। এছাড়া একটা নিন্মবিত্ত পরিবারের নানা অভাব-অনটনের মধ্যে লেখক কীভাবে বেড়ে উঠেছেন তাও বর্ণনা করেছেন।

‘…আব্বা আমাদের ভরণ-পোষণ করতে মাটি কাটার কাজ ছাড়াও আরো অনেক রকম কাজ করেছেন। ইশ^রপুরের হিন্দুদের সাথে গিয়ে রাত ভর মাছ ধরেছেন, কামলা হয়ে সিলেটে গিয়ে ধান কেটেছেন। তখন আমাদের গ্রাম থেকে অনেকেই ধান কাটতে সিলেটে যেত। সিলেটে ধান কাটতে যাওয়াকে ‘ধানী যাওয়া’ বলত গ্রামের লোকেরা। তখন সিলেটে ধানের ভালো ফলন হতো। সেই এলাকায় লোকবল কম ছিল বলে আমাদের এলাকা থেকে লোকজন গিয়ে টাকার বিনিময়ে তাদের ধান কেটে দিয়ে আসত। সিলেটে ধানী চলে গেলে আব্বা এক দেড় মাস বাড়ি ফিরত না। যতদিন আব্বা বাড়ি না ফিরত ততদিন আমাদের সামলাতে আম্মার কী যে কষ্ট হতো! আব্বা সিলেটে যাবার আগে আম্মার কাছে যে চাল কিনে দিয়ে যেতেন কয়েকদিন খাওয়ার পরই তা ফুরিয়ে যেত। তখন চালের চেয়ে আটার দাম কম ছিল। তাই কয়েক মুঠো চাল বাঁচাতে আম্মা আটা দিয়ে রসগোল্লার মতো একধরনের খাবার তৈরি করে আমাদের খেতে দিতেন। আটার তৈরি রসগোল্লা খেয়ে আমরা দিন কাটাতাম আর আব্বা কবে চাল নিয়ে আসবে সেই অপেক্ষায় থাকতাম। এমন নয় যে আব্বা বাড়ি ফেরার সময় পকেট ভরে টাকা আর বস্তা ভরে চাল নিয়ে আসতেন। অহর্নিশি ধান কেটে যে টাকা পেতেন তা দিয়ে নিজে বেঁচে থাকতে যতটুকু দরকার শুধু ততটুকু খরচ করে বাকি টাকা দিয়ে চাল, ডাল, তেল, লবণ কিনে নিয়ে আসতেন। ভাগ করে আমরা ডাল-ভাত খাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করে নিয়েছিলাম। আম্মার ভাগে তো ডাল-ভাতও মিলত না। আম্মা না খেয়েই পেট ভরে খেয়ে ওঠার ভান করাটা শিখে নিয়েছিলেন…।’

(সব মেঘে বৃষ্টি হয় না, পৃষ্ঠা নং- ৪১-৪২)

আমরা সবাই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে জীবনের গল্প বলি। নিজের গল্প আমাদের সবার কাছেই প্রিয়। কিন্তু কোনো রাখঢাক না রেখে, দুঃখ-দারিদ্র্যের কষাঘাতের গল্প, জীবন সংগ্রামের খুঁটিনাটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অথচ অন্তর্ভেদী, অবর্ণনীয় কষ্টগাঁথা মন খুলে কতজনই প্রকাশ করি অন্যের কাছে? মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্ত পরিবারের গৃহবধূদের কিছু একান্ত কষ্টময় মুহূর্ত থাকে, স্বামী সন্তানসহ শশুড়বাড়ির লোকদের মুখে খাবার তুলে দিয়ে নিজে খেয়ে না খেয়ে থাকার গল্প থাকে। নিজের জন্য কম ভেবে অথবা না ভেবে অন্যদের জন্য নিজেকে বিলীন করে দেয়ার গল্প থাকে। যে গল্প কেউ জানে না। কেউ বলে না। বাসার তাসাউফ বলেছেন। কিন্তু তাই বলে, এভাবে! লেখকের মায়ের দিনের পর দিন না খেয়ে থাকার পরও হাসিমুখে সংসারের কাজকর্ম সামলে রাখার কথাগুলো পড়ে আমি এতটাই কষ্ট পেয়েছি যে, রীতিমতো আমার দম বন্ধ হয়ে গেছে। এত এত বই পড়লাম, কখনো চোখের জল আসেনি। কিন্তু ‘সব মেঘে বৃষ্টি হয় না’ পড়ে আমার চোখের আকাশ থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হলো।

নব্বইয়ের দশকের স্মৃতিচারণ

নব্বইয়ের দশককে বলা হয় সোনালি দশক। আর এই লেখকের শৈশব-কৈশোর কেটেছে নব্বইয়ের দশকে। কাজেই তার লেখায় সেই দশকের স্মৃতিচারণ থাকাটা স্বাভাবিক। তবে এতটা স্মৃতিময় করে তিনি লিখেছেন যে পড়তে পড়তে আমি ফিরে গেছি নব্বইয়ের দশকের সোনালি দিনগুলোতে। লেখকের ছেলেবেলায় খুঁজে পেয়েছি আমার ছেলেবেলাকে। বইয়ের একটা একটা পাতা পড়েছি আর মনে হয়েছে, আরে! এ তো আমারই কথা! আমার জীবনের কথা। এই যে আজকাল মোবাইল, ফেসবুক, ইমো, ভাইভার, হোয়াটসআপ, ইউটিউব আর ইমেইল-জিমেইলের যুগে আমরা ‘থ্রি জি’ ও ‘ফোর জি’র স্পিডে ছুটে চলেছি, আমরা তো ভুলেই গেছি, চৈতালি দুপুরে ঘুড়ি উড়িয়ে আকাশের কাছাকাছি পাঠিয়ে নাটাই-সুতো হাতে নিয়ে ছুটে চলার গতি কেমন ছিল? ইউটিউবে ভিউজ আর ভাইড়ালের যুগে বিটিভিতে শুক্রবারে বাংলা সিনেমা দেখার অনুভূতি কী রকম ছিলÑ এই বইয়ের মাধ্যমে সেই সব পুরনো স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছেন লেখক। সেই যে ছোটবেলায় তুষপোড়া ছাই দিয়ে দাঁত মাজা। মক্তবে আরবি পড়তে গিয়ে হুজুরের হাতে জালিবেতের মার খাওয়া। আদর্শলিপি বই নিয়ে প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া। স্কুলে যাওয়ার সময় বৃষ্টি এলে কচুপাতা কিংবা কলাপাতা দিয়ে ছাতা বানিয়ে মাথায় ধরা। টিফিনের সময় এক টাকা দিয়ে লাঠি বিস্কুট কিংবা আট আনা দিয়ে দুধমালাই আইসক্রিম কিনে খাওয়া। কট্কটি ওয়ালার কাছ থেকে হাওয়াই মিঠাই কেনা। ক্লাসরুমে সুর করে নামতা পড়া। মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই সহপাঠী সুন্দরী মেয়েকে প্রেমপত্র লেখা। নিজের নামের পাশে যোগ চিহ্ন দিয়ে বেঞ্চির ওপরে সহপাঠী মেয়ের নাম লেখা। পাটকাঠিতে মাদার গাছের আঠা লাগিয়ে ফড়িং ধরা। নদীতে গোসল করতে গিয়ে লাই খেলা। বন-বাঁদাড়ে ঘুরে ঘুরে পাখির বাসা ভাঙা। পাখির ছানা ধরে এনে বাড়িতে পোষা। অন্যের গাছ থেকে ফল চুরি করা। পলো দিয়ে মাছ ধরা, চাঁই, ওচা, ঠেলা জাল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে সাপ দেখে ভয় পাওয়া। পাশের গ্রামে গিয়ে রাত ভর বাউল গান শোনা, যাত্রাপালা দেখা। পাল তোলা নৌকোয় চড়ে নানাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া। নৌকাটা ছোট কোনো পুল বা ব্রিজের তলে দিয়ে যাবার সময় ‘তা তা’ শব্দ করে প্রতিধ্বনি তোলে আনন্দ পাওয়া। রেডিওতে অনুরোধের আসর গানের ডালি আর রকমারি গানের অনুষ্ঠান গীতালি শোনা। বেবি লজেন্স সঙ্গীতমালা কিংবা হাঁস মার্কা নারকেল গানের দোলা অনুষ্ঠানে ধাঁধার উত্তর দিয়ে চিঠি লেখা। রেডিও ম্যাগাজিন উত্তরণ, সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান দুর্বার, রাত আটটা পাঁচ মিনিটে খেলাধুলোর খবর, নিশুতি অধিবেশন ছায়াছবির গান শোনা। মোহামেডান-আবাহনী ফুটবল ম্যাচ ও ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন ট্রফির ফাইনাল খেলার ধারাবিবরণী শোনা। ত্রিশ কিংবা পঁয়ত্রিশ টাকা দিয়ে আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, মনির খান, রবি চৌধুরী, তপন চৌধুরী, ডলি সায়ন্তনী, মুজিব পরদেশীর ক্যাসেট কিনে ব্যাটারি চালিত ট্রানজিস্টরে গান শোনা। শুনতে গিয়ে ক্যাসেটে ফিতা পেঁচিয়ে গেলে টেনে বের করে পেঁচ খুলে পেনসিল কিংবা বলপেন ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঠিক করে আবার গান শোনা। বিটিভিতে আলিফ লায়লা, ম্যাকগাইভার, ইত্যাদি, রবিনহুড, হারকিউলিস, আকবর দ্য গ্রেট, হুমায়ূন আহমেদের নাটক আর শুক্রবারে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি দেখতে অধীর হয়ে অপেক্ষা করা। এ ক্ষেত্রে টিভিতে এন্টেনার বদলে সিলভারে ঢাকনা ব্যবহার করা। রিল ক্যামেরায় ফটো তোলা। জাম্বুরা কিংবা ডিয়ার বল দিয়ে ফুটবল খেলা। পেলে, ম্যারাডনোর পোস্টার কেনা। ইলিয়াস কাঞ্চন-অঞ্জু ঘোষের ভিউ কার্ড সংগ্রহ করা। বাজার থেকে ভিসিআর ভাড়া এনে উঠোন ভরা পাড়ার লোকদের সাথে বসে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সিনেমা দেখা। রাজ্জাকÑশাবানার ছবি দেখে চোখের জল ঝরিয়ে কেঁদে ফেলা। সালমান শাহ্র মৃত্যু সংবাদ শুনে মন খারাপ করা। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পত্র পাঠিয়ে পত্রমিতালী করা। বড় ভাবীকে তার প্রবাসী স্বামীর কাছে চিঠি লিখে দেওয়া। হাতে ক্যাসিও ঘড়ি আর পায়ে রূপসা চপ্পল পরে ঘুরে বেড়ানো। কেরোসিন তেলে জ¦লা কুপির আলোয় পড়ালেখা করা। হ্যাজাক লাইটের ঝল্মলে আলোয় বিয়ে বাড়িতে দাওয়াত খাওয়া। শিকায় রাখা কাচের বোতল থেকে ঢেলে মাথায় সরষের তেল মাখা। লাঙল-জোয়াল আর গরু দিয়ে হালচাষ করা, ধান মাড়াই করা। ঢেঁকিতে ধান বানা চালের ভাত খাওয়া। বাবার সাথে নৌকোয় চড়ে বাজারে গিয়ে বড় বটগাছের তলায় পিঁড়িতে বসে নাপিতের কাছে চুল কাটানোÑ এসব স্মৃতি তিনি এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে পড়ার পর নস্টালজিক হয়ে পড়েছি।

মায়ের কথা

পিতা ছাড়াও লেখকের মা এই বইয়ের একটি অন্যতম চরিত্র। লেখকের পরিবার এতটাই অভাবগ্রস্থ ছিল যে, পরিবারের সব সদস্য খাওয়ার পরে হাঁড়ির তলায় একমুঠোও ভাত অবশিষ্ট থাকত না, আর তাতে তার মা ভাত না খেয়েও পেট ভরে খাওয়ার অভিনয় করত। কখনো কখনো হাঁড়ির তলানিতে একমুঠো ছেঁচাপোড়া ভাত পাওয়া যেত। সেই ভাতগুলো না খেয়ে মা তার ছোট দুই সন্তানের জন্য রেখে দিত অথবা সন্তানেরা না খেলে পরদিন কিছু চাল বেচে যেত। এভাবে বেঁচে যাওয়া চালে জমে একবেলা রান্নার আয়োজন হয়ে যেতÑ এ রকম অভাবগ্রস্থ এক পরিবারের লেখক আট ভাই-বোনের মাঝে জীবনে অনেক অপূর্ণতা সঙ্গী করে বেড়ে উঠেছেন।

‘… একবার রোজার ঈদে এক জোড়া বাটা জুতা কিনে দিতে বায়না করেলিাম আব্বার কাছে। কিন্তু আব্বা কিনে দেননি। তখন আমার জুতোর চেয়ে একটু সেমাই ও কয়েক মুঠো চিনি কেনাটাই যে বেশি জরুরি ছিল। এই কথাটা জেনেও নতুন জুতা না পেয়ে মন খারাপ করে আমি আমাদের বাড়ির সামনের একটা উঁচু টিলার ওপরে গিয়ে বসেছিলাম। ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল তখন আমার। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করেছিল। পাড়ার ছেলেরা সুন্দর জামা-জুতো পরে ইদগাহের মাঠে চলে গেলেও আমি মাটির টিলার ওপরে নিরিবিলি বসেছিলাম। আম্মা এসে ডেকে গিয়েছিল। আমি যাইনি। হাত ধরে টেনেছিল। তবু আমি অনড় ছিলাম। আম্মারও বোধহয় মন খারাপ হয়েছিল। তাই তো আম্মা আমাকে আর কিছু না বলে নীরবে চলে গিয়েছিলেন। নীরবে চলে গেলেও আম্মার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ার দুই ফোঁটা অশ্রু আমার চোখকে ফাঁকি দিয়ে লুকাতে পারেননি। আম্মার চোখের জল দেখে আমার মন আরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল…।…আমাকে কেউ বাড়িতে নিয়ে জুতো কিনে দেয়নি, দূর করেনি আমার দুঃখ। জুতোবিহীন মাটির টিলার ওপর বসে মন খারাপ করে কেটে গিয়েছিল আমার জীবনের একটা ঈদের খুশি…।’

(সব মেঘে বৃষ্টি হয় না, পৃষ্ঠা নং ৪৬-৪৭)

অন্যান্য চরিত্র

লেখকের প্রাইমারি স্কুলের টিচার মায়া মেম থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিকের ক্লাসমেট মোতালিব, হাবিব, শিরিন, রুকিয়া, খেলার সাথী শাহিনা, কলেজে জীবনের প্রিয় হাবিব স্যার, প্রেমিকা নূরজাহান, স্ত্রী, সন্তান সবার কথাই বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে লেখকের ছোট ভাই সাইফুলের আত্মহত্যা তার ও পরিবারের সদস্যদের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। বইটি শুরু থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত ভাষার ব্যবহার ও শব্দচয়ন এতটাই প্রাঞ্জল যে পড়তে গিয়ে ঠোঁটের আরাম পাওয়া যায়।

তবে কিছু কাহিনি ঘটনা ও তথ্য উপস্থাপন গল্পের কলেবর বা মেদ বাড়িয়েছে। এত বিশদ বর্ণনা না করলেও হতো। ঘটনা প্রেক্ষিতে কয়েকজন বিখ্যাত কবির কিছু কবিতা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুরো কবিতা না দিয়ে শুধু প্রাসঙ্গিক লাইনগুলো ব্যবহার করলেই হতো। পুরো বইয়ে তেমন কোনা ভুল বানান চোখে পড়েনি। ছাপা ও বাঁধাইয়ের মান মোটামুটি ভালো।

আমি বইটির পাঠক প্রিয়তা কামন করি।

বইয়ের নাম: সব মেঘে বৃষ্টি হয় না

লেখক: বাসার তাসাউফ

ধরন: আত্মজীবনী

প্রকাশক: অনুপ্রাণন প্রকাশন

প্রচ্ছদ: তৌহিন হাসান

মূল্য: ৩৩০ টাকা।

Facebook Comments Box

বিষয় ভিত্তিক পোস্ট

শহীদুল ইসলামspot_img

সাম্প্রতিক পোস্ট