মারজিয়া তাবাসসুম
রাত প্রায় দেড়টা বাজে। অজান্তেই ক’বার যেনো ঘরের বাইরে গিয়ে ফিরে এলেন জেসমিন। ছেলেটা সারাদিন কিছু খায়নি। আবহাওয়ার পালাবদলের ফলে জ্বরে ভাজাভাজা করে দিয়ে গেছে তার কঙ্কালসার দেহটা। আজ সারাদিন শুধু মসজিদের তাবারুক খাবে বলে বলে সময় পার করে, রাতে যখন এশার আযান দেয়, মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ধীর পায়ে মসজিদের বারান্দায় এসে হেলান মেরে বসে।
ঢাকা শহরের যাত্রাবাড়ী থানার নিউ টাউন এলাকার কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে ভাঙ্গা একটা টিনের ঘরে তিন হাজার টাকা মাসে ভাড়ায় থাকে একমাত্র সন্তান জুবায়ের কে নিয়ে। স্বামী শরিফই ছিলো তাদের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যমে। কিন্তু পাষাণ সেই স্বামীই চার বছরে একবারও খোঁজ নেয়নি তাদের। পরিচিতদের মুখে শুনে স্বামী শরিফুল নাকি বিয়ে করে অন্যত্র সংসার গড়েছে। কেউ কেউ বলে দ্বিতীয় বউ নিয়ে ভালোই সুখে আছে সে। নতুন সংসারে নাকি দুইটা বাচ্চাও আছে।
জেসমিন নিজেদের একান্ত সময় গুলোর কথা মনে করে। মধ্যবিত্ত পরিবারের জেসমিন শরিফের হাত ধরে বেড়িয়ে পরার পর থেকে পরিবারে আর তার ঠাঁই হয়নি। এই নিয়ে মা মোমেনা বেগম বেশ মেয়ের প্রতি আবেগ থাকলেও রাশভারি গোছের পিতার অভিমানের পাথর সরেনি বুক থেকে। তাই বিয়ের আজকে দশ বছর হয়ে গেলেও মেয়ের খোঁজ নেয়নি। সেই দুঃখে জেসমিন বেদনায় কঁকিয়ে উঠে বেশ কতকবার। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শরিফ তখন থেকে পরিবার ছাড়া। বাবা মা বেঁচে না থাকলেও শরিফের বড় ভাই ও ভাইয়ের বউয়ের দোলাচালে সম্পত্তির মায়া ত্যাগ করে ঘর ছেড়েছে বিয়ের পর পর-ই। তারপর থেকেই ঠাঁই নেয় পরম মমতায় আগলে রাখা ঢাকা শহরের যাত্রাবাড়ী এরিয়ার এই নিউটাউন এলাকাতে। সেই থেকে এই নড়বড়ে টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরটাতে দশটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে দুজন সুখে-দুঃখে, অভাব আর অনটনে। তবুও তাদের ভালোবাসার কোনো কমতি ছিলোনা। বিয়ের দুই বছরের মাথায় জুবায়ের এর জন্ম ।
সে বার কি আনন্দ শরিফের! প্রথমবারের মতো বাবা হবার আনন্দে বড় মসজিদে বাতাসা দিয়েছিলো সে। যদিও বড়লোক সম্প্রদায়ের লোকেরা সেদিন নাক সিটকে তাকে এরিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু যারা বাতাসা নেওয়ার তারা নিয়েছে তাতেই শরিফুল খুশিতে গদগদিয়ে বাড়ি ফিরেছিলো। আহা!সে কি বউয়ের প্রতি যত্ন আত্তি।
মাঝেমধ্যে বলে উঠত-
বুঝলে জেসি,”আমাদের আব্বা আম্মা থাকলে আমাদের সন্তান কি সুন্দর দাদা-দাদী, নানা-নানীর আদর পেয়ে বড় হতো।”
জেসমিনের চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রুর বন্যা বয়ে যায়। শরিফুল যেনো জেসমিনের পুরনো ক্ষত আউলায় দিলো। সেইদিন কতক্ষন যে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলো সে!
মুহুর্তেই জেসমিনের মন আরও বিষিয়ে উঠে পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে গা গুলায় তার। অস্থি মৎজ্জায় বদমাইশি লুকিয়ে জুবায়েরের যখন চার বছর তখনকার একদিন শরিফুল বাড়ি থেকে সেই বেরোলো আর ফিরলোনা।
তারপর থেকে নিজেদের পেট চালানের দায়িত্ব নেয় জেসমিন। মানুষের বাসায় বুয়ার কাজ নিয়ে সংসার চালায়। সেইখানেও কত্ত ঝামেলা। দুই মাস যাবত কাজ গুলি ছুটে যায় আবার নতুন করে নেয়। কিন্তু এই একটা মাসে মাত্র তিনটা কাজ অবশিষ্ট থাকে জেসমিনের। তাও জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে এক বাসার মালিক চলে গেছে গ্রামে। আরেক বাসার কর্তা নাকি অফিস থেকে এখনো বেতন পায়নি এবং তৃতীয়জন দুই মাসের বেতন আটকে রেখেছে। এই ক’দিন কষ্টে কাটলেও গত তিনদিন যাবত চুলায় হাড়ি বসেনা। চাল ফুরিয়েছে, মাছ, গোশত কিছুই নেই।ছেলেটার পনেরোদিন ধরে জ্বরের কারণে মুখের রুচি উঠে গেছে। খায়ও না কিছু। আজ শবে বরাতের রাত।
তার এক বন্ধু এসে কইলো, “মসজিদে আজ বিরিয়ানি দিব”।
তাই ছেলেটা এশার আযানের সাথে সাথে মসজিদে চলে যায়।মসজিদে বরাতের রোশনাই জৌলুস উঠেছে, সবাই দোয়া পড়ছে, ইমাম সাহেব এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে আলোচনা করছেন। এগারোটার মধ্যেই মসজিদের সিড়ির ঘরে বিরিয়ানি পোটলা আসতে থাকে। জুবায়ের বিরিয়ানির গন্ধ পায়। ক’দিন না খাওয়া পেটটা মুচড়ে উঠে। এই বুঝি এক দলা মুখের ভেতর চালান করে দিবে। মুখের ভেতর লালা আসে তার। জুবায়ের সেই লালা আবার ডুগ গিলে পেটে চালান করে দেয়। সময় ধীরে ধীরে চলে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে পেটের ক্ষুধাও বেড়ে যায় দ্বিগুণ হয়ে। সাড়ে বারোটায় মুনাজাত শেষে তবারক বিতরণ শুরু হয়। জুবায়ের উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখে সায়েদারী করে কারা,তাছাড়া আর কতক্ষণ লাগবে।
এত্ত মানুষ দেখে জুবায়ের ভাবে, “যখন মসজিদে আসছিলাম তখন তো এত মানুষ ছিলোনা।”
“এশার নামাজে একটা মাত্র কাতার ছিলো।”
আবার ভাবে, “বিরিয়ানির কথা শুনে বোধহয় আসছে সবাই।”
অসুস্থ আর নড়বড়ে শরীর নিয়ে জুবায়ের বারান্দায় যে বসেছিলো আর ভেতরে যায়নি। এখন গেইটও বন্ধ করে দিয়েছে।দুতলায়ও নাকি অনেক মানুষ হয়েছে শুনলো কার কাছ থেকে।
জুবায়ের ভাবে, “ইশ! কেউ যদি ইচ্ছে করে তার টাও জুবায়েরকে দিতো তাহলে সে তার মাকেও দিতে পারতো।”
সময় যায়, বিরিয়ানি দেওয়া ফুরায়।কিন্তু মানুষের হাহাকার বেড়ে যায়। কেমন ধস্তাধস্তি করে বের হয় ওরা। জুবায়ের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের হাতের দিকে তাকিয়ে। ইচ্ছে করে ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে কিন্তু পারেনা। কানে কানে শুনা যায় যা তাবারুকের আয়োজন করেছিলো সব শেষ! আরও চারশো মানুষের তাবারুক পাওয়া হয়নি।
ধপ করে যেনো জুবায়েরের বুকটা ছ্যাৎ করে উঠে। চোখের মধ্যে অশ্রুরা বাধ ভাঙ্গে কিন্তু বহু কষ্টে নিজেকে সামলায় সে। ধীরে ধীরে বের হয়ে যাবে উদ্ধত হয় তখন একজন কাছে এসে হাতের মধ্যে ছোট্ট একটা পোটলা ধরিয়ে দিয়ে হনহন করে হেটে যায় সামনের দিকে। ছোট্ট জুবায়ের উঁকি মেরে দেখে বুঝার চেষ্টা করে কে সে। ইমাম সাহেবের মতো দেখায়, সে এসব ভাবতে ভাবতে সামনে এগোয়।
হঠাৎ করে মসজিদের ভেতর থেকে হৈ হল্লোড় শুরু হয়। তবারক পাওয়া নিয়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষায়। কমিটিকে দোষারোপ করে অনেকেই। তারপর শুরু হয় হাতাহাতি। জুবায়ের খুশি মনে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে, কোনো শব্দ তার কানে আসেনা। এমন সময় পেছন থেকে একজন আরেজনকে ধাক্কা দেয় এবং সে এসে জুবায়েরের উপরে পরে। মুহুর্তের মধ্যেই জুবায়ের মানুষের পায়ের নিচে পড়ে যায়। সেদিকে কারও খেয়াল থাকে না।কতক্ষণের মধ্যে মসজিদ এরিয়া শান্ত হয়ে যায়। এখানে ওখানে জটলা বেধে নিজেরা নিজেরা কথা বলতে বলতে বাড়ি ফিরে সবাই।
কিন্তু ওদিকে নিস্তেজ একটি প্রাণ এলোপাথাড়ি হয়ে পরে থাকে মসজিদের সিঁড়িতে একমুটো খাবার আঁকড়ে ধরে।


