মুহাম্মদ কাউছার আলম রবি
পদ্মা, মেঘনা আর ডাকাতিয়ার মিলনস্থল চাঁদপুর মোহনা। যেখানে নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা বালুচরে সূর্যাস্ত দেখা যায়, যাকে স্থানীয়রা ভালোবেসে ডাকে ‘মিনি কক্সবাজার’। সেখানেই বেড়ে ওঠা রবি আর নিতুর। দুজনের বাবা-ই পেশায় জেলে। ছোটবেলায় নৌকার মাচায় বসে রবি যখন জাল বুনত, নিতু তখন ভাঙা স্লেটে পদ্মার ঢেউ গুনত।
মাঝি পরিবারে জন্ম নেওয়া মানেই জোয়ার-ভাটার সাথে লড়াই। রবি আর নিতু দেখেছে, ইলিশের মৌসুমেও কীভাবে মহাজনদের ঋণের জালে তাদের বাবারা বন্দি থাকে। দুবেলা ডাল-ভাত জোটাতেই যেখানে নাভিশ্বাস, সেখানে পড়াশোনা ছিল বিলাসিতা। কিন্তু রবি ছিল জেদি। সে বলত, “নিতু, আমরা যদি শিক্ষিত না হই, তবে এই নদীর মানুষের অধিকার সারাজীবন মহাজনদের পকেটেই থাকবে।”
তারা চাঁদপুরের রেললাইনের ধার দিয়ে হেঁটে স্কুলে যেত। ট্রেনের হুইসেল তাদের কাছে ছিল আগামীর ডাক। শত দারিদ্র্যের মাঝেও তারা শুধু পড়াশোনা শেষ করেনি, হয়ে উঠেছে প্রান্তিক মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
এক পড়ন্ত বিকেলে তারা দাঁড়িয়ে ছিল চাঁদপুরের ঐতিহাসিক মোলহেডে। যেখানে তিন নদীর জল আছড়ে পড়ছে পাড়ে। রবির পরনে সাধারণ পাঞ্জাবি, নিতুর পরনে নীল শাড়ি নদীর জলের মতো।
রবি বলল, “দেখেছ নিতু, পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে, কিন্তু এই যে মাঝিমাল্লার হাঁকডাক, তাদের জীবনের গল্প কজন শোনে? এই রূপালী ইলিশের আসল ভাগ জেলেরা পায় না।”
নিতু রবির হাত ছুঁয়ে উত্তর দিল, “সেজন্যই তো আমাদের লড়তে হবে রবি। মাছঘাটে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। এই পদ্মা আমাদের মা, আর মা যেন তার সন্তানদের অভুক্ত না রাখে।”
তারা একটি ছোট ডিঙি নিয়ে মাঝনদীতে ভেসে গেল। চারদিকে রূপালী ঢেউয়ের খেলা। দূরে মাছ ধরার ট্রলারগুলোর আলো জ্বলছে। জেলেরা চিৎকার করে বলছে, “বড় ইলিশ জালে উঠছে রে!” নদীর বুক চিরে চলে যাওয়া লঞ্চের ঢেউয়ে তাদের নৌকাটা দুলছিল। রবি একটা উদাস করা গান ধরল। নিতু রবির কাঁধে মাথা রেখে দেখছিল চাঁদের প্রতিবিম্ব পদ্মার বুকে কাঁপছে। তাদের প্রেম শুধু আবেগের নয়, তা যেন এই বিশাল নদীর মতোই গভীর আর সংগ্রামী।
মাছঘাটের কোলাহল, চাঁদপুরের ইতিহাস ঐতিহ্য আর মাঝিদের বঞ্চনার কথা মাথায় নিয়ে তারা স্বপ্ন দেখে একদিন এই পদ্মাপাড়ের প্রতিটি জেলে পরিবার শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে।
চাঁদপুর মাছঘাটে তখন রূপালী ইলিশের পাহাড়। আড়তদারদের হাঁকডাক আর বরফ ভাঙার শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম। কিন্তু সেই ঝকঝকে ইলিশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জেলেদের মুখগুলো ছিল ম্লান। দাদন আর সুদের জালে আটকে পড়া মানুষগুলো তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ফসলের সঠিক দাম পাচ্ছিল না।
রবি আর নিতু ঠিক করল, তারা আর চুপ থাকবে না। তারা মোলহেডের রক্তধারা স্মৃতিস্তম্ভের নিচে দাঁড়িয়ে এক বিকেলে জেলেদের একতাবদ্ধ হওয়ার ডাক দিল।
রবি উচ্চস্বরে বলতে লাগল, “ভাইসব, আমরা নদীর বুক ছিঁড়ে মাছ ধরি, তুফানের সাথে লড়াই করি। কিন্তু আমাদের ঘরে কেন নুন আনতে পান্তা ফুরায়? কারণ মাছের দাম মহাজনরা ঠিক করে, আমরা না!” নিতু নারীদের সারিতে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ জেলের মেয়ের হাত ধরে বলল, “আমাদের পড়ার খরচ জোটে না কারণ আমরা আমাদের হকের কথা বলি না। আজ থেকে কোনো জেলে ভাই একাকী মহাজনের কাছে মাথা নত করবে না।”
একদিন মাছঘাটে যখন সিন্ডিকেট করে ইলিশের দাম কমিয়ে রাখা হচ্ছিল, রবি আর নিতু একদল ছাত্র ও যুবক জেলেদের নিয়ে সেখানে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করল। ট্রেনের রেললাইন থেকে শুরু করে নদীর ঘাট পর্যন্ত মানুষের ঢল নেমেছিল। পর্যটকরাও থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিল এই সাহসী লড়াই।
মাছঘাটের বড় আড়তদার ধমক দিয়ে বলল, “রবির বাচ্চা, তুই নদীর ছেলে নদীতে থাক, রাজনীতি করিস না।”
রবি শান্ত গলায় জবাব দিল, “চাচা, রাজনীতি আমরা করি না, আমরা অধিকার বুঝি। আজ থেকে সব মাছ সমবায় সমিতির মাধ্যমে বিক্রি হবে।”
টানা তিন দিনের আন্দোলনের পর প্রশাসন ও আড়তদাররা পিছু হটতে বাধ্য হলো। জেলেদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য নতুন নীতিমালা হলো। সেদিন সন্ধ্যায় মিনি কক্সবাজারের বালুচরে রবি আর নিতু নির্জনে বসল।
সূর্যটা তখন রক্তিম আভা ছড়িয়ে ডুবছে মেঘনার কোলে। নিতু হালকা হাসল, তার হাসিতে জয়ের তৃপ্তি। সে বলল, “জানি না বড় হয়ে আমরা কে কোথায় থাকব, কিন্তু পদ্মা আমাদের যে একতা শিখিয়েছে, তা কখনো ভুলব না।”
রবি পকেট থেকে একটা ছোট্ট মাটির গয়না বের করে নিতুর হাতে দিয়ে বলল, “পদ্মা সাক্ষী, আমরা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকা নই, আমরা একই স্রোতের দুই সহযাত্রী। এই রূপালী ইলিশের মতো আমাদের স্বপ্নগুলোও একদিন ঝিলিক দিয়ে উঠবে পুরো দেশে।”
নদীর বুক চিরে চলাচল করা বিচিত্র সব যানবাহনের শব্দে এলাকাটি তখনও মুখর, কিন্তু সেই শব্দের মাঝেও রবি আর নিতু শুনতে পাচ্ছিল এক নতুন আগামীর জয়গান। মাঝিমাল্লারা তখন আনন্দে নৌকা ভাসাচ্ছিল, আর তাদের কণ্ঠে তখন ভাটিয়ালির সুরে অন্যরকম তেজ।
উৎসর্গঃ আমার সকল শিক্ষার্থীদের


