ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের এক ছোট শহর কায়রোবা। শহরটি স্বর্ণের খনির জন্য পরিচিত হলেও এখানকার মানুষ দিনশেষে ভাত জোটাতে হিমশিম খায়। খনির স্বর্ণ যায় ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্সে, কিন্তু এখানকার মানুষ বেঁচে থাকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর অবিচারের সঙ্গে লড়াই করে। শহরটির স্থানীয় এক সাংবাদিক জামাল উসমান হঠাৎই এক রহস্যময় তথ্য পায় গত কয়েক মাসে অন্তত ১৫ জন খনি শ্রমিক নিখোঁজ হয়েছে! প্রশাসন বলছে, তারা হয়তো দুর্ঘটনায় মারা গেছে বা জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে পড়েছে। কিন্তু জামালের কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয় না। জামাল বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামলে তার সামনে ভেসে ওঠে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য,নিখোঁজ শ্রমিকদের অনেকেই আগে ফরাসি খনি কোম্পানি “ওরিয়ন মাইনিং কর্পোরেশন”-এ কাজ করত! জামাল তার এক বন্ধুকে ফোন দিল, যার নাম আবু ছালেহ ইয়োবো। সে স্থানীয় এক গোপন সংগঠনের সদস্য, যারা বিদেশি কোম্পানিগুলোর অন্যায় কার্যকলাপ ফাঁস করতে চায়।আমি কিছু তথ্য পেয়েছি, আবু ছালেহ । খনি থেকে মানুষ গায়েব হয়ে যাচ্ছে! “আমিও জানি, জামাল। কিন্তু সমস্যা হলো, যারা সত্যি বলবে, তারা একের পর এক নিখোঁজ হয়ে যাবে!” “আমরা যদি আরও গভীরে যাই?” আবু ছালেহ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“তাহলে হয়তো আমরাও নিখোঁজ হয়ে যাব”
কিন্তু জামাল পিছপা হওয়ার পাত্র নয়। সে ঠিক করল, সত্য উদঘাটন করবেই। জামাল উসমান নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। রাত গভীর হলে সে শহরের বাইরে ওরিয়ন মাইনিং কর্পোরেশন-এর প্রধান খনির দিকে রওনা দিল। সে জানে, দিনের বেলায় এখানে প্রবেশ করা অসম্ভব। সাথে ছিল তার ক্যামেরা, একটা ছোট রেকর্ডার আর সাইলেন্সার লাগানো একটি হ্যান্ডগান,যেটা তার এক বন্ধু, সাবেক বিদ্রোহী কালিদু সাঙ্গারের, তাকে দিয়েছিল আত্মরক্ষার জন্য। খনির চারপাশে উঁচু কাঁটাতারের বেড়া, ওয়াচ টাওয়ারে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাহারাদার। জামাল দূর থেকে লক্ষ্য করল, রাতের আঁধারেও সেখানে কাজ চলছে। কিন্তু ব্যাপারটা অস্বাভাবিক,কেন রাতের বেলায় খনিতে এত কর্মকাণ্ড? সে গোপনে একটি পাহাড়ের ঢালে উঠে ক্যামেরার জুম বাড়িয়ে ছবি তুলতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সে যা দেখল, তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গেল। কয়েকজন লোককে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় একটি ট্রাকে তোলা হচ্ছে! কারা এই বন্দিরা? তারা কি নিখোঁজ শ্রমিকদের দলভুক্ত? জামাল দ্রুত তার ক্যামেরায় ভিডিও রেকর্ডিং চালু করল। কিন্তু ঠিক তখনই পেছনে একটা কোল্ড স্টিল বন্দুকের নলের ঠান্ডা অনুভূতি পেল, “তুমি এখানে কী করছো?”জামাল ধীরে ধীরে হাত তুলল। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এক সশস্ত্র পাহারাদার, চোখেমুখে নিষ্ঠুরতার ছাপ। “আমি… আমি শুধু পথ ভুল করে এই দিকে চলে এসেছি”। পাহারাদার একটুও বিশ্বাস করল না।”তোমার সাথে ক্যামেরা আছে, তুমি আমাদের ভিডিও করছো, তাই না?” জামাল তখনই বুঝে গেল, সে ভয়ংকর কিছু আবিষ্কার করেছে। জামালের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। পাহারাদারের বন্দুকের নল তার মাথায় ঠেকানো। সে জানে, এক ভুল পদক্ষেপ মানে মৃত্যু। “হাত ওপরে রাখো, আর ক্যামেরাটা ফেলো,”পাহারাদার কঠোর স্বরে বলল। জামাল ধীরে ধীরে ক্যামেরাটা মাটিতে রাখল, কিন্তু তার চোখ অন্য কিছু খুঁজছিল,একটা সুযোগ, পালানোর একটা উপায়।
এমন সময় দূরে ট্রাকের দিকে তাকিয়ে তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। বন্দীদের মধ্যে একজনকে সে চিনতে পারল,সিদিব! সিদিব ছিল খনির এক অভিজ্ঞ শ্রমিক, যে কয়েক সপ্তাহ আগে নিখোঁজ হয়েছিল। প্রশাসন বলেছিল, সে হয়তো দুর্ঘটনায় মারা গেছে, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সে বেঁচে আছে এবং বন্দি!
পাহারাদার জামালের হাত বাঁধতে ঝুঁকলেই, সে মুহূর্তের সুযোগ নিল। বিদ্যুতের গতিতে এক পা পিছিয়ে এসে কনুই দিয়ে পাহারাদারের ঘাড়ে আঘাত করল। লোকটা হুমড়ি খেয়ে পড়তেই জামাল তার বন্দুক ছিনিয়ে নিল।
“একটাও শব্দ করলে, মাথায় গুলি করে দেব,”জামাল ফিসফিস করে বলল। কিন্তু ঠিক তখনই ওয়াচ টাওয়ার থেকে আরেকজন পাহারাদার চিৎকার করে উঠল।
“ঐখানে কেউ আছে! ধরো ওকে!” সাথে সাথে সাইরেন বেজে উঠল, লাইটগুলো জ্বলে উঠল, আর চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। জামাল বুঝতে পারল, এখন তার হাতে সময় খুব কম।
যত দ্রুত সম্ভব, জামাল সিদিবের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। তার মাথায় একটাই চিন্তা,সিদিবকে উদ্ধার করতে হবে, অন্যথায় সে হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে। কিন্তু ধরা পড়লে সে নিজেও আর বাঁচবে না। তিনি মনে মনে হিসেব করতে থাকেন, কতটা দ্রুত চালানো যেতে পারে, এবং কোথায় যেতে হবে। তার হাতের বন্দুকটা শক্ত করে ধরেছিল, কিন্তু সে জানত,এটা তাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিরাপদ করতে পারবে না। সিদিব ট্রাকের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখে ভয় এবং হতাশার ছাপ স্পষ্ট। জামাল তার কাছে পৌঁছানোর আগে পাহারাদারের সংখ্যা বেড়ে গেছে। কয়েকজন মাইনিং শ্রমিকও চুপচাপ পাহারাদারদের নির্দেশনা অনুসরণ করছিল, তাদের চোখে এক অদ্ভুত দুঃখ এবং বাধ্যতার ছাপ ছিল। জামাল আরেকবার তার কনুইয়ের শক্তি দিয়ে একজন পাহারাদারের পিঠে আঘাত করল, কিন্তু এবারই তার সামনে বিপদ আরও বড়।
“পালাও!” সিদিব গলা নামিয়ে বলল। “এই মুহূর্তে পালানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই!” পাহারাদারের অস্ত্রধারী দলের সামনে তারা দুজন দাঁড়িয়ে ছিল, আর জামাল জানত, শত্রুদের অস্ত্রের গুলি চাইলেই তাদের মাথায় পৌঁছাবে। অথচ জামাল পালানোর পরিবর্তে সিদিবকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরও কাছাকাছি চলে আসে। তাদের মধ্যে ৩ মিটার ফাঁকা।
জামাল আর সিদিব, দু’জনই জানত, পালানোর আর কোনো উপায় নেই। পাহারাদারের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেছে যে, তাদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। জামাল পিছু হটার বদলে সিদিবের দিকে তাকিয়ে একটা সংকেত দিল”আমাদের একত্রিত হতে হবে।” সিদিব একটু থমকে দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “আমরা যদি পালাতে পারতাম, তাহলে এতদিনে পারতাম। কিন্তু এখন…”
তার কথায় একটু ক্ষোভ ছিল, যেন তিনি এই পরিস্থিতির জন্য নিজেকে দায়ী করছিলেন। জামাল জানত, সিদিব হয়তো ধাক্কা খেয়েছে, তবে তাকে শান্ত করে বলল, “এখন শুধু একটিই পথ। মাইনিং কম্পানি তাদের শক্তির শেষ সীমা পর্যন্ত লুকাতে চাইবে। কিন্তু তাদের গোপনতা ফাঁস হবে।” পাহারাদারের নেতৃত্বে, এখন পুরো খনি এলাকা ঘিরে ফেলেছে। একেকটা সাদা পোশাক পরা লোক, যারা সম্ভবত ফ্রান্স থেকে এসেছে, তাদের চোখে ছিল শীতল নির্দয়তা। তারা বুঝতে পারছিল না, এদের মতো সাধারণ মানুষ কেন এমন সাহস দেখাচ্ছে। হঠাৎ, সিদিবে চমক দিয়ে জামালের দিকে তাকাল, “তুমি কি জানো, তাদের আসল উদ্দেশ্য কী? এরা শুধুই খনিজ শোষণ করছে না। এরা এখানকার অধিবাসীদের চিরতরে মুছে ফেলতে চায়। এই খনি আসলে শুধুমাত্র স্বর্ণের খনি নয়, এটা এক ধরনের রক্তের খনি!” জামাল থমকে দাঁড়িয়ে গেল। “রক্তের খনি?” সিদিব এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ, রক্তের খনি। তারা শুধুমাত্র স্বর্ণ নয়, আফ্রিকার সম্পদ পুরোপুরি শোষণ করছে। এর মধ্যে সব ধরনের খনিজ সম্পদ ছাড়াও, তাদের উদ্দেশ্য এমন এক ধরণের জাতিগত নিধন চালানো, যাতে আফ্রিকার মানুষের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে।”
জামালের মাথায় তালা পড়ে গেল। এর মানে, শুধু স্বর্ণ নয়, এখানকার মানুষের মানবাধিকারও উধাও হয়ে যাচ্ছে। এদিকে, তাদের পিছু নেওয়া পাহারাদারদের মধ্যে থেকে একজন উঠে এল। “আর কিছু নয়, এদের শেষ কাজ করতে হবে।” জামাল জানত, এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে এই শত্রুরা তাদেরকে মেরে ফেলতে পারে। তবে সিদিবের কথা, তার মুখের ভয়াবহতা,এগুলো আর সহ্য করা হবে না।
পাহারাদারদের গতিবিধি তীব্র হয়ে উঠল। তারা জামাল ও সিদিবের দিকে আগাচ্ছিল। কিন্তু জামাল আর সিদিবে দুজনেই জানত, পালানো সম্ভব নয়। যেহেতু পরিস্থিতি খুবই সংকটজনক, জামাল সিদ্ধান্ত নিল, শত্রুদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়তে হবে।
“সিদিব, আমাদের হাতে আর সময় নেই! যদি পালাতে চাই, তাহলে এখান থেকে দ্রুত কিছু একটা করতে হবে।” জামাল গম্ভীরভাবে বলল। সিদিব মাথা ঝেড়ে বলল,”তুমি ভাবছ, আমার হাতে কিছু করার আছে?”
কিন্তু জামাল তার কথায় খুব একটা দৃষ্টি দেয় না। তার চোখ এখন খনির চারপাশে। জামাল জানত, যেহেতু এখানকার পাহারাদাররা বাহিনী হিসেবে এতই শক্তিশালী, তাদের উপর আক্রমণ করা তেমন কার্যকর হবে না। কিন্তু সে জানত, কিছু একটা করতে না পারলে তারা ফাঁদে পড়বে। হঠাৎ, জামাল সিদিবেকে একটা আইডিয়া দিল।”আমাদের কাছে একটা সুযোগ আছে খনির পাম্পিং স্টেশনের ভেতরে একটি পুরনো বৈদ্যুতিক ডিভাইস রয়েছে। যদি সেখানে কাটা পড়ে, পুরো খনি অন্ধকার হয়ে যাবে। তবে সেটা করতে হলে আমাদের দ্রুত পৌঁছাতে হবে, এবং দ্রুত বেরোতেও হবে।” সিদিব কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,”তোমার পরিকল্পনা তো অবাস্তব নয়, জামাল। কিন্তু এখন আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই।” তারা দ্রুত পাম্পিং স্টেশনের দিকে রওনা দিল, যেন তাদের পেছনে শত্রুরা বুঝে উঠতে না পারে। যখন তারা সেখানে পৌঁছল, জামাল সিদিবেকে বলল,”এখানে যে বৈদ্যুতিক ডিভাইসটি আছে, সেটা যদি সাবধানীভাবে ছিড়ে ফেলি, তাহলে পুরো খনির সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু, এর জন্য আমাদের সঠিক মুহূর্তটি চিহ্নিত করতে হবে।” জামাল আর সিদিব পাম্পিং স্টেশনে পৌঁছানোর পর, তারা দ্রুত কাজ শুরু করল। জামাল জানত, এখানে একটা ভুল পদক্ষেপের মানে মৃত্যু। দুই জনেই মাথা নিচু করে বৈদ্যুতিক ডিভাইসের কাছে এগিয়ে গেল, স্যুইচের মধ্যে ফাঁক দিয়ে ডিভাইসটি খুঁজতে শুরু করল।”দ্রুত, সিদিবে!” জামাল ফিসফিস করে বলল। “তারা যদি কিছু বুঝে যায়, আমাদের পালানোর কোনো সুযোগ থাকবে না।” তারা ঝুঁকির মধ্যে ছিল, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও থামলেন না। সিদিব ডিভাইসের কভার খুলে কাজ শুরু করল, জামাল তার চারপাশে চোখ রাখছিল। একপাশে শত্রুরা দ্রুত এগিয়ে আসছিল।
এদিকে, জামাল দেখল, খনির ভিতরের সন্ত্রাসী বাহিনী এখন একসাথে সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের দিকে আসছে। কিছুটা দূরে, একজন পাহারাদার তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে এগিয়ে এল, কিন্তু জামাল সাবধানীভাবে স্নায়ু নিয়ন্ত্রণে রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
“এটা হয়ে যাবে,” সিদিবে বলল, যখন সে ডিভাইসটি অকার্যকর করে দিল। “এখন কেবল একটাই কাজ বাকি, জামাল,বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে বের কর।” তিন সেকেন্ড পরেই, পুরো খনির বিদ্যুৎ সিস্টেম হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকারে চারপাশ ডুবলো। জামাল ও সিদিব জানত, এই মুহূর্তে তারা পালানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ পেয়ে গেছে। পাহারাদাররা তড়িঘড়ি করে হালকা টর্চের সাহায্যে খুঁজে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু জামাল আর সিদিব দ্রুত অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। জামাল ও সিদিব অন্ধকারে একে অপরকে অনুসরণ করতে লাগল। খনির বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর, পুরো এলাকা চরম অন্ধকারে ডুবে গেল। জামাল জানত, এর মানে তারা একদম সঠিক সময়ের মধ্যে প্রবেশ করেছে। শত্রুরা এখন অন্ধকারে তাদের খুঁজে বের করতে পারবে না। কিন্তু তাদের সামনে এখনও একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, খনি থেকে বের হয়ে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়া। “আমরা এখন কোথায় যাব?”সিদিব সশব্দে কাঁপতে কাঁপতে বলল। “এত বড় খনির মধ্যে বের হওয়ার রাস্তাটা কোথায়?” জামাল নিঃশ্বাস টেনে বলল,”আমাদের পেছনে একটা ফাঁদ ছড়িয়ে গেছে। এই মুহূর্তে একমাত্র পথ হলো খনির বাইরে চলে যাওয়া, তবে সেটা করাও সহজ হবে না।” তারা কয়েক মিনিট এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার পর, জামাল ঠিক করল, সঠিক সময় ছাড়া কোনো আন্দোলন করা যাবে না। খনির শেষ সীমানা থেকে ১০০ মিটার দূরে একটি বড় রাস্তা ছিল, যেখান থেকে শহরের দিকে বেরোনো সম্ভব ছিল। তারা সেদিকে রওনা দিল। তবে তাদের চোখের সামনে হঠাৎ করে তিনজন সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য চলে আসল। জামাল ও সিদিবে একে অপরকে বুঝিয়ে বলল,”যুদ্ধ করতে হবে!” সিদিব কিছুতেই থামতে রাজি ছিল না, সে পেছন ফিরে একটি শক্তিশালী কিক মারল এক পাহারাদারের পেটে। জামাল দ্রুত বন্দুক হাতে পায়চারি করে আরেকটি লোককে আক্রমণ করল, কিন্তু আগের বার যেন আরও একবার পাহারাদারের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এভাবে একাধিক পাল্টাপাল্টি গুলির ধ্বনি আর সংঘর্ষের মধ্যে জামাল সিদিবকে সরিয়ে সবার সামনে রুখে দাঁড়িয়ে গুলি চালাতে লাগল। তার মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য কোনোরকম শত্রুদের কাছে ধরা পড়ার আশঙ্কা উবে গেল।
অবশেষে এক গভীর সংকটে সিদিব ও জামাল ফিরে দেখতে পেল; জামাল সেই ‘শেষ মুহূর্ত’ মেজাজ নিয়ে সন্ত্রাসীদের মেরে ফেলেছে। অবশেষে তারা পালাতে পালাতে নিরাপদ হয়ে দেউটি বড় ডালপালা!
জামাল ও সিদিব অবশেষে খনি এলাকা ছাড়তে সক্ষম হয়েছিল। গুলির শব্দ আর উত্তেজনার মধ্যে, তারা যতটা সম্ভব দ্রুত এবং সতর্কতার সাথে শহরের দিকে রওনা দিল। একদিকে তাদের সামনে তীব্র উত্তেজনা, অন্যদিকে তাদের পেছনে ক্রমেই আসতে থাকা পাহারাদারদের পদচারণা। তবে তারা জানত, যতদূর তাদের সক্ষমতা ছিল, এদের শক্তি থেকে পালানো বেশ কঠিন। যদিও খনি এলাকার বাইরে যাওয়ার একমাত্র পথটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তারা একেবারে শেষ মুহূর্তে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় দফায় যে বিপদটি আসবে, সেটাও জানা ছিল না। সেই মুহূর্তে, তাদের মনে প্রশ্ন ছিল”এই পৃথিবীতে কি এমন কোনও শক্তি রয়েছে যা আমাদের একসাথে পাওয়া ইচ্ছার চেয়ে বেশি বড়?” তবে, শেষ পর্যন্ত তাদের লক্ষ্য পূর্ণ হল। উত্তেজনা আর চরম দুঃখের মধ্যেও জামাল আর সিদিব ঐ খনিজ সম্পদের খনি রক্ষা করতে সক্ষম হয়, তাদের প্রত্যাবর্তন বড় হয়ে পৌঁছায়! জামাল ও সিদিব শহরের কাছে পৌঁছানোর পর, তাদের জন্য যুদ্ধ শেষ হয়নি। তারা জানত, তারা এখন শুধু শারীরিকভাবে নিরাপদ, কিন্তু এই অভিযানের ক্ষতি এবং তার পরিণতি নিয়ে তাদের সামনে আরও অনেক কিছু ছিল।শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে, জামাল সিদিবকে কিছুটা শান্ত করল, এটা শেষ না, সিদিব। এখান থেকে আমরা শুধু ফিরে আসছি, কিন্তু যুদ্ধ এখনও চলবে। আমাদের এসব প্রতিবন্ধকতা থেকে বেরোতে হবে।”
সিদিব মাথা নেড়ে বলল,”তুমি ঠিক বলেছ। খনি থেকে পালানোর পর, এই স্বাধীনতা মনে হয় শুধু আমাদের জন্য নয়। আফ্রিকার জন্য এটা একটা বড় প্রতিশ্রুতি, কিন্তু খনি কর্পোরেশন আর তাদের অনুগত সরকার এতো সহজে ছেড়ে দেবে না।” তারা শহরে ঢুকে নিজেদের পরিচয় পরিবর্তন করল এবং কয়েকদিনের মধ্যে স্থানীয় জনতা তাদের সমর্থন লাভ করতে শুরু করল। কিন্তু শত্রু তাদের ধাওয়া করতে ছাড়বে না, জানতো জামাল। মাইনিং কোম্পানি তাদের পেছনে শক্তিশালী এজেন্ট পাঠাতে শুরু করেছে। জামাল ও সিদিব একসাথে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করল। তারা জানত, খনি কর্পোরেশন এবং তাদের লোকেরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তবে তাদের কাছে এক শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল, প্রকাশ্যে সত্যের সামনে আনা। তারা সোশ্যাল মিডিয়া, সংবাদপত্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ শুরু করল, খনির অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করতে এবং কর্পোরেশনকে তাদের দখলে থাকা সম্পদ এবং ক্ষমতার জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করার চেষ্টা করল। একদিন, জামাল একটি বড় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে বলল, “এটা শুধু আমাদের গল্প নয়, এটা প্রতিটি আফ্রিকান, প্রতিটি মানুষের গল্প, যারা শোষণের শিকার হয়েছে। আজকের দিন থেকে আমরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং তাদের জন্যও লড়াই করব।”সিদিব পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “এটাই আমাদের যুদ্ধ। আমরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, গোটা আফ্রিকার ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রাম করব।” এরপর, খনি কর্পোরেশন এবং তাদের সমর্থক শক্তি আর কোনোভাবেই নিজেদের অপরাধ চেপে রাখতে পারল না। ক্রমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ও সংগঠনগুলো তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল। আফ্রিকার সম্পদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম রাস্তায় নেমে আসা এই ছোট দু’জন মানুষই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেল। তবে জামাল ও সিদিবে জানত, এই যাত্রা শেষ নয়। ভবিষ্যতেও তাদের সামনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ আসবে, কিন্তু তাদের একটাই লক্ষ্য, অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য বলার সাহস অর্জন করা। এভাবেই, “রক্তের খনি” একটি নতুন সংগ্রামের জন্ম দেয়,যেখানে একবার শুরু হওয়া লড়াই অবিরত চলবে, এবং এর শেষ কোথায়, তা কেবল সময়ই বলবে।
সমাপ্ত



