আইনুন নাঈমা
রহিমের স্ত্রী হুসনা ও করিমের স্ত্রী জহুরা দুই জা বাল্য কালে ছিল খেলার সাথী ,কিশোরকালের সখি আর যৌবন কালের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী। একে অপরের শত্রু। কেউ কারো ছায়াটিকে পর্যন্ত সহ্য করতে পারেনা। এক কথায় যাকে বলা চলে জলে তেলে বসবাস। গায়ে পাখির কুজন ব্যতিত যেমন প্রভাত হয়না তেমনি উলিপুরে এদের কলহ কুন্দল ব্যতিত কোনোদিন সন্ধ্যা নামতে পারেনা। অতি উৎসাহী ভদ্র প্রতিবেশীর দল যেদিন কুন্দল শুনতে পাননা সেদিন বড্ডো কুন্ঠিত হন।তাদেরই কেউ কেউ নানা অজুহাতে এসে একে ওপরের বিরুদ্ধে নালিশ ঢেলে কান ভারী করে তোলে। পরক্ষণেই শুরু হয় উচ্চ বাচ্যের বিনিময়। বেলা যতো গড়াতে থাকে রোদের তাপের মতো তাদের কণ্ঠ ও ঝিমিয়ে আসে। রহিম ও করিম শহরে রিক্সা চালাতো। বছর দুই আগে আকস্মিক দুর্ঘটনায় করিম পা দুটি হারায়। এখন একটি দুগ্ধ পোষ্য কন্যা শিশু ও দুটি বছর সাতেকের যমজ ছেলে এবং স্ত্রী জোহরাকে নিয়ে করিম গাঁয়ে বাস করে।সপ্তাহে দুদিন উলিপুরের হাটের বটতলায় ছেঁড়া মাদুরে বসে ভিক্ষা মেগে সংসারে কাঁচা টাকার যোগান দেওয়া আর তার উপস্থিতিতে বিবাদ বাঁধলে স্ত্রীর পক্ষ নিয়ে অযৌক্তিক যুক্তি তর্কে সম্মতি দিয়ে মাথা নাড়ানো ছাড়া সংসারে আর তার বিশেষ প্রয়োজন নাই।জোড়াতালির সংসারে আরেকটি জোড়া দেয়ার আশায় জোহরা অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থের ঘরে ঘরকন্নার কাজ সেরে আঁচল ভরে চাল, ডাল এনে দেখতে পান তার গুণধর স্বামী অবাধ্য সন্তান দুটিকে জগতের প্রাচীনতম পেশায় দীক্ষিত করে তুলছেন।
এই একটি বিশেষ বিশেষণের কারণে জোহরা আর করিমের মধ্যে কোনোদিনই সদ্ভাব ছিলোনা। উঠোনের অপর চালা ঘরটিতে হাসনা তার বছর দশেকের মেয়েকে নিয়ে পুরুষ শুন্য ঘরে একাকী রাত্রি যাপন করে। কখনো বা জা’এর কুৎসিত ভৎসনায় নীরবে অশ্রু বিসর্জন করে শাপিতে থাকে নিজের অদৃশ্য ভাগ্যের কারিগরকে।অথবা মৃত্যু কামনা করতে থাকে জোহরার। মাস কাবারে রহিম বাড়ি এলে হাসনা তার পা দুটি জড়িয়ে ধরিয়ে বলে -এবার একটা বিহিত করে যাও , তা না হলে আমারে আর হুমাশারে মাটিচাপা দিয়ে যাও। আর সইবার পারতাছিনা।
তখনকার মতো বিহিত করবার আশ্বাস দিলেও রহিমের উপস্থিতিতে বিবাদ বাঁধলে হাসনার পিঠে উদোম কিলোনি ঝাড়ে। এমনকি যেদিন শহরে ফিরে যাবে সেদিন ও জোহরাকে ডেকে হাতে কিছু টাকা দিয়ে যায় কোলের শিশুটির জন্য। হোসনা এই দৃশ্য দরোজার আড়াল থেকে দেখে আরেকবার মৃত্যু কামনা করে জোহরার।
সেদিন দর্জি বাড়ি থেকে ফিরছে হোসনা।গায়ের তিন রাস্তার মোড়ে হঠাৎ মোমেনা দোকানির সাথে দেখা। চোখাচোখি হতেই ইশারায় কাছে ডাকে। কয়েকজন মধ্য বয়স্ক পুরুষ সিগারেট টেনে টেনে দূষিত ধোঁয়াকে আরো দূষিত করে তুলছে। বাকি দুজন চায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। হোসনা শাড়ির আঁচলটা উঠিয়ে নেয় মাথায়। মোমেনা চায়ের কাপে অনবরত নাড়া দিতে থাকে কিন্তু কিছু বলেনা।
-বুবু কিছু কইবা ? ডাকলে যে ?
মোমেনা চায়ের কাপটা এগিয়ে দেয় সলিমুদ্দিনের দিকে। সলিমুদ্দিন কাপটা ধরে চোখের টিপ্পনি কাটে মোমেনাকে। হোসনা বুঝে যায় তাকে নিয়েই কানাঘোষা হচ্ছিলো দোকানে।
-বয় ,বয়রে ছেড়ি ,এতো উতলা হচ্ছিস কেন ?চা দিমু ? খাবি ?
হোসনা যাওয়ার তাড়া দেখিয়ে বললো -আমার সময় নাই। গেলাম।
মোমেনা শ্লেষ ভরে বললো -ওরে আমার দেমাগী ছেড়ি। বাড়ি গিয়ে কি করবি শুনি ?সুব্রত গেছে কলেজে। রাত ছাড়া তো আর তোর উঠোনে পা রাখবেনা।
হোসনার গা কাঁটা দিয়ে উঠে।
-এসব কি কও বুবু !সুব্রত হুমাশার প্রাইভেট মাস্টার। আর সে আমার ছেলের মতো। তারে নিয়ে কথা কইতে তোমার মুখে আটকালো না ?
মোমেনা শব্দ করে চায়ের কাপ জলে ভিজিয়ে ভেংচি কেটে বললো -আমার ছেলের মতো ! সে তো আর তোর নিজের ছেলে না ? বলি অমন একটা আকাটা মরদ ছাওয়ালরে রাতবিরাতে তোর ঘরে নিতে লজ্জা করেনা ?
-না করেনা। তোমার মতো সবাইকে এক পাল্লায় মেপোনা। আপন বোনের স্বামীকে হাত করে একটা মুদি দোকানের মালিক হয়ে নিজেকে জগৎ সম্রাজ্ঞী ভেবোনা যে যাকে ইচ্ছা তাকে যা তা
বলা যাবে।
পুরনো ইতিহাসের লাগাম টানাতে মোমেনা দমে যায়।
সলিমুদ্দিন মাথা নিচু করে ঘামতে থাকে। মোমেনার দেওয়া চা জুড়িয়ে গেলেও খাবার তাগাদা আর থাকেনা। অন্যকে কালী মাখাতে গেলে নিজের মুখেও যে তার ছিটে ফোটা পড়বার সম্ভাবনা আছে তা আগে জানলে মোমেনা হয়তো এক কাপ চা উপহার দিয়ে জোহরার কাছে এসব কুকথা শুনতে যেতোনা। আর হোসনার বোঝার বাকি নেই এইসব রটানো কোন বিদুষী মহিলার কাজ !
কথাটা সম্পূর্ণ সত্য না হলেও অর্ধ সত্য। হুমাশার পড়া শেষ হলে সুব্রত আরো ঘন্টা খানেক বসে থাকে। আলোচনা চলে অনাগত ভবিষতের। এমন নিষ্ঠুর অজপাড়া গায়ে নাড়ার আগুনের পাশে বসে থাকা এই বিধর্মী যুবকটিকে হোসনার একান্ত আপনার বলে মনে হয়। মনে হয় সেই একমাত্র ব্যক্তি যে হোসনার কোনো কথা না শুনেও অনুমান করে বলতে পারে তার কম্পিত কণ্ঠের ভাষা। নিজের কদর্য টুকু নেভা আগুনের ছাই দ্বারা ঢেকে অপর পাশে রন্ধনরতা জোহরার বিরুদ্ধে এক তরফা নালিশ দ্বারা প্রাপ্ত সমবেদনা তার সারাদিনের সঞ্চিত পুঁজি। যে ক্রোধ সমবেদনা দ্বারা প্রশমিত হয় তাই আবার জেগে উঠে সকালের আলো ফোঁটার সাথে সাথেই। বাংলা সাহিত্যের স্নাতকোত্তর সুব্রত কতকদিন হোসনার মন খারাপের পরিমাপ মাপতে গিয়ে মনে মনে নিজেকে শশী ডাক্তার আর হোসনাকে কুসুম ভেবে ভুল করে বসে।
জোহরা যতক্ষণ খাঁ বাড়িতে কাজ করতে থাকে ততক্ষন মন থাকে ফুড়ফুড়ে।মুখে একটা পান গোঁজে দিয়ে খাঁ ‘র স্ত্রী উর্মিলার সাথে গল্প করতে করতে হাতের কাজ সেরে নেয়।সন্ধ্যা নামতে বেশি দেরি নাই। জোহরার বাড়ি যাওয়ার তাড়া দিয়ে বললো
বুবু আজ যাই ?সন্ধে নামল যে।খোঁড়াটা গেছে হাঁটে।ফিরতে রাত হবে।
-এতো যাই যাই করিস কেন শুনি ?আরেকটু থাক দেখি।বাজারে মাছ কিনতে গেছে। মাছ গুলো কেটে দিয়ে যা। আর বাড়িতে গেলেই তো তোর শুরু হয়ে যাবে গোড়াযাব। ঝগড়া ঝাঁটি।
-না গো বুবু ,অবলা গাইটা ডাকাডাকি করছে বোধ হয়।
উর্মিলা বিরক্ত হয়ে বললো -আচ্ছা চলেই যাবি যখন তাহলে উঠোনটা ঝাঁট দিয়ে যা।
উর্মিলার বছর চারেকের মেয়ে মিনু তিন চাকার সাইকেল চালাচ্ছিল ঘরের পেছনের খোলা জায়গাটিতে। জোহরার এক ছেলের কোলে খুকি ,অন্য ছেলের হাতে ফিটার সমেত দৌড়াতে থাকে মিনুর পিছু পিছু।কিছুক্ষন চালানোর পর সাইকেল থেকে নেমে বেতের পাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুতুল নাড়াচাড়া করতে শুরু করে মিনু।এতক্ষন পর সাইকেল খালি পেয়ে উচ্ছসিত জোহরার দুই ছেলে ফিটার সমেত খুকিকে মিনুর সামনে বসিয়ে দিয়ে যায়। প্রায় ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যায় খেলা মগ্ন শিশুদের উপর গাছের আড়াল থেকে নজর রাখছে কেউ একজন।উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষমান গারো ছায়াটি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে মিনুর গলার সোনার চেইনটি আলগোছে পরিয়ে দেয় খুকির গলায়।
ঘরে ফিরেই জোহরার মেজাজ বিগড়ে উঠে। নিত্যদিনকার মতো হুলুস্থল কান্ড বেঁধে যায়।কোলের শিশুটি ক্ষুধার যাতনায় কান্না জোড়ে দেয়। অবাধ্য ছেলে দুটো কথা শুনতে চায়না। বড় দুটির পিঠে দু ঘা বসিয়ে কলতলায় পাঠিয়ে মিনুর বেঁচে যাওয়া সুজি খাইয়ে ঘুম পাড়ায় খুকিকে। বাহিরের সমস্ত কাজ সেরে উনুন ধরাতে গিয়ে অপর পাশে রন্ধনরতা হোসনা কে দেখে চোখের সামনে ভেসে উঠে সকালের দৃশ্যটি।হোসনার বলা কথার যেগুলোর উত্তর দিতে পারেনি তারই শুন্য স্থান পূরণ করতে থাকে উপযুক্ত বাক্য দ্বারা।ছেলে দুটি একে অপরকে আঘাত করে নালিশ জানাতে আসলে আবার দু ঘা বসিয়ে দেয় দুজনের পিঠে। আজকাল যেন জোহরা খুব অল্প কারণেই রেগে যাচ্ছে। ধৈর্য্য এবং সহ্য শক্তি দুটোই যেন কমে আসছে দিনকে দিন। মাঝে মাঝে তার মনে হয় যদি পালিয়ে যাওয়া যেত বহু দূরে এই এই কষ্ট ভরা সংসারের নষ্ট নীড় থেকে !
রান্না শেষ হলে ছেলেদের খাইয়ে রান্না ঘরের শেকলটা তুলে দেয়। এপাশের দুচালা ছনের ঘরটিতে ঢুকে দেখতে পান খুকির গা ঘেমে চুপসে গেছে। সেটা খুলতে গিয়ে তার গলা থেকে আকস্মিক আর্তনাদ বেরোয় -সর্বনাশ !
ছেলে দুটি চমকে উঠে -কি হয়েছে মা ?
-কিছু হয়নি। যা শুয়ে পর দেখি।
খুকির পাশের অল্প জায়গাটিতে আধশোয়া হয়ে বিশ্রাম নিতে থাকে জোহরা। হার ভাঙা খাটুনির পর এখন ভর পেটে গা ভেঙে আসতে চায় ঝিমুনি।
উর্মিলার আপাদমস্তক যেনো কালো হয়ে গেছে ঘৃণায়।
-ছিঃ জোহরা ! তুই এই কাজ কিভাবে করতে পারলি !তোকে কতটা বিশ্বাস করতাম। বিশ্বাসের এই প্রতিদান দিলি আমাকে ! আমার হিসাবি কর্তার চোখ ফাঁকি দিয়ে মিনুর খাবারে দু মুঠো চাল ডাল বাড়িয়ে দেই শুধু তোর খুকির জন্য। মিনু সুজি খেতে চায়না। খুকি সুজি খেতে ভালোবাসে।গাইয়ের এক পোয়া দুধে মিনুর নাম করে খুকিকে সুজি রেঁধে খাওয়াই তা তুই এত দিনেও বুঝতে পারলিনা ?
উর্মিলা খুকির গলা থেকে চেইন ছিনিয়ে নিয়ে বললো -বের হ আমার চোখের সামনে থেকে। বাড়ির ত্রিসীমানায় যেনো তোকে না দেখি।
জোহরা উর্মিলার পা দুটি জড়িয়ে ধরে বললো -বুবু ,বিশ্বাস করেন ,আমি চেইন চুরি করি নাই। আমি চোর নই। আমার তিন সন্তানের কসম। বিশ্বাস করেন বুবু।
চারদিকে উৎসুক জনতার ভিড়। সবার আগে দাঁড়িয়ে আছে হোসনা।
-মিথ্যে বলছিস। তুই চুরি করেছিস। তুই ই চোর। মাথা নেড়া করে গা থেকে বাইর করমো তরে।
চার দিকের হৈ হুল্লোড়ের ঢেউ যেন হোসনার কথাকেই সমর্থন করে গেল।
খুকির কান্নায় জোহরার ঘুম ভেঙে যায়। ঘেমে একেবারে নেয়ে গেছে সম্পূর্ণ শরীল।হার্টবিট দ্রুত উঠা নামা করছে।
-ধুর ,সব দুঃস্বপ্ন।
খুকির পিঠে কয়েকটা চাপড় দিতেই সে আগের মতো গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। এই দিন মলিন অগোছালো ঘরের অল্প আলোতে সোনার চেইন পরিহিতা খুকিকে তার কাছে ভদ্র গৃহস্থের ঘরের আদরের দুলালীর মতোই ঠেকলো। খানিক গালে হাত দিয়ে ভাবতে থাকে খুকির নিকটস্থ ভবিষৎ জীবন।বাহিরের গাঢ় অন্ধকার। ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে। সাথে গলা মিলিয়ে রাত জাগা পেঁচা যেন ভৎসনার সাথে ডুকরে উঠে বললো যে কন্যা পিতার পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে জন্মায় তার আবার ভবিষৎ!
জোহরা খুকির কপালে একটা চুমো একে দিয়ে চেইনটা খোলে নিয়ে অন্ধকার আচ্ছন্ন পৃথিবীর পথে বাহির হয়ে গেল।
সে যেন সর্বসহা সুখ । তার আসন সুনির্দিষ্ট। ইহাকে তার আসন থেকে উঠিয়ে দিলে যেন জগৎ সংসারটাই মিথ্যে হয়ে যাবে ! যা পরাবাস্তব ,যা অলীক মানুষ বাস্তবকে উপেক্ষা করে তা নিয়েই ভাবতে ভালোবাসে। দুঃখ যাদের ছায়াসঙ্গী ,অষ্টপ্রহর হোঁচট খেয়ে যাদের চলতে হয় তারা নাই নাই ! কেন নাই বলে আটপৌরে শাড়ির অচল ভেজানোর পরিবর্তে এই অলীক চিন্তাতেই সুখ বোধ করে বেশি।
যে মানুষটির নিরপেক্ষ সমবেদনায় উৎসব আড়ম্বরহীন জীবনকে বাসি ফুলের উপর জল ছিটিয়ে তাজা দেখানো যেত সে’ই আজ কয়েকদিন থেকে নিরুদ্দেশ। বাসি ফুলের উপর জল ছিটাতে ছিটাতে অগোচরে যে পঁচন ধরেছে তারই স্পষ্ট বার্তা যেন সে নিজেই শত্রু সমাজের সম্মুখে তুলে ধরেছে। নাওয়া খাওয়ার কোনো ঠিকঠিকানা নাই।মন মেজাজ তিরিক্ষি। হুমাশা ভয়ে সর্বদা তটস্থ। যদিও সে অনেকবার স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে মিনুর চেইন সে চুরি করে নাই। কি করে যে সেদিন সকালে তার গলা থেকেই চেইনটা আবিষ্কার করেছিল উর্মিলা -সে ইতিহাস হুমাশা জানেনা। আর অপমান -তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আপাতত আপাদমস্তক নিজেকে আবদ্ধ করে রেখেছে ছুট্ট খুপরিতে।
-বিশ্বাস করো মা ,আমি চেইন চুরি করি নাই।
হোসনা ধ্যান ভেঙে তাকালো -এখান থেকে যাও। আমাকে একা থাকতে দাও। তুমি যে চুরি করোনি তা আমি জানি।
তার মায়ের মন খারাপের কারণ যে সে নয় ,এটা শুনে তখনকার মতো হুমাশা চলে যায়।
উঠোনে শোরগোল শোনা যাচ্ছে। হোসনাকে খরগোশের মতো কান খাড়া করে শুনতে হয়না। সবটা যে তাকে শুনানোর জন্যই উচ্চ স্বরে বলা হচ্ছে তা কণ্ঠের উঠা নামা খেয়াল করলেই বোঝা যায়। সুব্রতের ছোট বোন এসেছে গাইয়ের দুধ কিনতে। হোসনার একবার মনে হলো ফেরার পথে একবার জিজ্ঞাসা করে নিবে যে সুব্রতের কি হয়েছে। কিন্তু তা জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন পড়েনা। গয়না চুরির ইতিবৃত্ত বর্ণনা শেষে যা আলাপ শুরু হলো তা শুনে হোসনার গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো।
- ও বৌদি , দাদার চিরকুমার অনশন ভাঙলো শেষে। আর্শীবাদ হয়েছে চারদিন হলো। আজ বউ আনবে সন্ধেয়। একটিবার গিয়ে দেখে এসো কিন্তু। বৌটি এক্বেবারে সোনার প্রতিমা। কঁচি খুকি।
জোহরা অবাক হওয়ার অভিনয় করে গালে হাত দিয়ে বললো -বলিস কি ! তাই নাকি ?
-হুম , তাই।
-বালাই ষাট। অবশেষে কুল কলঙ্কিনীর হাত থেকে রেহাই পেলো। মানিক জোর জোড়ে দিয়েছে সৃষ্টিকর্তা। পাটা পোতা ক্ষয় হয়ে সংসার ধর্ম স্বার্থক হোক।
সেঁউতি বললো -সেই আর্শীবাদই করো বৌদি। তোমার এখানে এসেছিলাম দুধ কিনতে। আজ দাদার প্রথম বাসর কিনা।
হোসনা আর শুনতে চায়না। কানে আঙ্গুল দিয়ে একমনে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে।
হুমাশার জন্য দৈনিক আধা লিটার দুধের ব্যবস্থা করে দিয়েছে রহিম। সেটাই দরোজার সামনে রেখে গেছে কিছুক্ষণ আগে। এখনো সীসার মগের গায়ে বুদ্ বুদ্ লেগে আছে। কি যেন ভেবে মগটা ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে আবার একটু পরেই ফেরত আসে দরজার সামনে। জোহরার ছেলেকে ডেকে বলে যে আজ দুধ রাখবেনা। হোসনা দুধ না নেয়াতে জোহরা যেনো একটু বেশিই খুশি।
রাত প্রায় তিনটা বাজে। হোসনা ঠেলে মেয়েকে জাগায়। ঘুম থেকে উঠে হুমাশা এদিক সেদিক তাকায়। সোলারের আলোতে দেখতে পায় মেঝেতে একটা কাপড়ের বেগ। হোসনা তার শিয়রে বসে একমনে খুচরা টাকা গুনছে। মেয়েকে জাগতে দেখে বললো -যা নেওয়ার আছে গুছিয়ে নাও। এখানে আর থাকবোনা।
হুমাশা অবাক হয়ে বললো -আমরা কোথায় যাবো মা ?
হোসনা টাকা গুণা থামিয়ে বললো -ঢাকা যাবো।
হুমাশা আর প্রশ্ন করেনা। হয়তো চোরের অপবাদ মেখে গাঁয়ে পড়ে থাকার চাইতে শহরে অর্ধহারে দিন কাটানো ঢের ভালো।স্কুল ব্যাগে বই গুলো ভরে জুতা খোঁজতে গিয়ে এতক্ষণ পর হুমাশা খেয়াল করলো ঘর আসবাবপত্র শুন্য। মনে পড়ে গেল -সন্ধেয় তার মাকে সুবলের মায়ের সাথে দর কষাকষি করতে শুনেছে। তার মা সুবলের মাকে বলেছিলো -বিপদে পড়েছি বলে গলায় ছুরি বসিয়ে হাতিয়ে নিলে। নাহয় বাজারে ওটার দাম নির্বিবাদে সাত হাজারের নিচে হবেনা। পানির দামে দিয়ে দিলাম সব।
আকাশে শুক্লপক্ষীর ক্ষয়মান চাঁদ। এক হাতে কাপড়ের ব্যাগ অন্য হাতে হুমাশার একটি হাত আঁকড়ে ধরে হোসনা বাড়ির বাহির হয়ে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ। কোনো সাড়া শব্দ নাই। কিছু দূর যাওয়ার পর হোসনা বললো -এখানে একটু দাড়াও। বড় খালার ঠিকানাটা নিতে ভুলে গেছি। এক্ষুনি আসছি। ভয় পেয়োনা কিন্তু।
হুমাশাকে আশ্বাস দিয়ে হোসনা পুনরায় বাড়ির ভেতর চলে যায়। ফিরে আসে মিনিট দশেক পর। বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ শব্দ হচ্ছে। বার বার আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিচ্ছে সে।
-কি হয়েছে মা। এমন অসম্ভাবিক দেখাচ্ছে যে। ভয় পেলে নাকি ?
হোসনা ঠিকানাটা ব্যাগে রেখে বললো -তাড়াতাড়ি পা চালাও দেখি। ট্রেন আসার সময় হলো প্রায়।
পথে কেউ আর কারো সাথে কথা বলেনা। শেষ রাতে ধানের শিসের উপর জমে থাকা শিশির বিন্দু চাঁদের আলোতে রুপোর মতো চকচক করছে। আলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিশির কণাতে পা ভিজে হালকা শীতের আমেজ জাগায়। হোসনা শেষবারের মতো দূরের খুপরি ঘরটির দিকে তাকালে দেখতে পায় ধোঁয়া সমেত আগুন কুন্ডলি পাঁকিয়ে ঘুরে ঘুরে আকাশের দিকে উঠছে।
স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় ভোর হয়ে গেল।প্লাটফর্ম নানা শ্রেণী পেশার মানুষে গিজ গিজ করছে। কেউবা ট্রেন হতে নামছে। কেউবা ভিড় ঠেলে ট্রেনে উঠার চেষ্টা করছে। আবার কেউ বসার আসন নিয়ে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হচ্ছে। একে একে সবাই নেমে গেলে হুমাশার হাত ধরে হোসনা ধীরে সুস্থে ট্রেনে উঠে গিয়ে একটি সুবিধা জনক আসনে মেয়েকে বসিয়ে বললো -এখানে চুপ চাপ বসে থাকো। আমি টিকিট কেটে আনছি। কেউ কিছু দিলে খাবেনা।
হুমাশার কপালে আলতো করে চুমো একে দিয়ে হোসনা ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে পিছন ফিরে আরেকবার তাকিয়ে দেখে নেয় হুমাশার কোমল মুখ খানি।
ট্রেন ছাড়ার জন্য হুইসেল দিলেও হুসনাকে আর আসে পাশে দেখা যায়না।
আজকের সকালটা উলিপুর বাসিন্দাদের চোখে মুখে ব্যাপক বিস্ময়ের ঘোর একে দিয়েছে। একসাথে তিনটি তিনটি পরিবারের সদস্যের আকস্মিক অকাল মৃত্যু ! অপমৃত্যুর দেবতা যেন স্বয়ং গলা টিপে ধরেছে গোটা উলিপুরকে। হোসনার ট্রেনে কাটা লাশ পাওয়া গেল স্টেশনে। ঘোষ বাড়ির হারান ঘোষ ,মালতি ঘোষ আর সেঁউতি ঘোষের লাশ পড়ে ছিল দক্ষিণের বারান্দায়। বাসি গাঁদা ফুলের উপর পড়ে ছিল দুইটি লাশ। তাদের একটি সুব্রত ,অপরটি সুব্রতের ঘোমটা টানা বালিকা বধূটির। তিনটি সন্তান আর পঙ্গু স্বামীসহ জোহরা মরে গেল আগুনে পুড়ে। কে বা কারা অথবা শেষরাতের দিকে কিভাবে আগুন ধরে গোটা একটি পরিবার ধূলিসাৎ হয়ে গেল সেই রহস্যের সমাধান করতে না পারলেও ভিন্ন ভিন্ন তিনটি মৃত্যুর মধ্যে একটি সমান্তরাল সম্ভাবনা অনুমান করতে সকলে মরিয়া হয়ে উঠে পড়লো।


