মায়িশা আবসারী আদীবা
কাব্য আসক্তি আমায় সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করবার পর থেকে আমার চরিত্রে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যে যুক্ত হয়েছে। এই যেমন, সারাক্ষণ প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে ইচ্ছে হয়। এবার সেই ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে লোকে হাসে, তো হাসুক আমার কিছুই যায় আসে না। বিকেল হলেই শীতলপাটি নিয়ে ছাদে উঠে পড়ি। তারপর সন্ধ্যে অবধি শুয়ে শুয়ে হয়ে আকাশ দেখা। আহা! কি সুন্দর। কোনো কোনো সময় মেঘেদের ছোটাছুটি দেখতে দেখতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। বর্ষার দিনে, আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। তন্দ্রাচ্ছন্ন আমি ,তখন বৃষ্টিস্নাত হয়ে ঘরে ফিরি। কি যে ভালো লাগে! ইচ্ছে করে সাথে সাথে খাতা কলম নিয়ে বসে পড়তে। আমার সমস্ত দেহ জুড়ে বিস্তৃত নিউরন গুলো মস্তিষ্কে অনুভূতির যে বার্তা পাঠিয়েছে সেগুলো ছন্দে ছন্দে স্মৃতিবন্দি করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু কি করে? শাড়িটা ভেজা। আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাবার অর্থ জ্বরকে আমন্ত্রণ জানানো। তখন বাধ্য হয়ে স্নানেরঘরে ছুটি। ফিরে এসে ভুলে যাই সব। কোন শব্দগুলো যেন মাথায় এলোমেলো ভাবে ঘুরছিল? কোন ছন্দে কবিতার চরণকে সাজাতে চেয়েছিলাম আমি? নাহ্ ! কিচ্ছু মনে নেই। তবে কোনো কোনো দিন মনে পড়ে। আজ না হয় তেমনি একটা দিনের গল্প বলি। সেদিন ছিল ভরা পূর্ণিমা। চাঁদের আলোয় চারদিকে যেন উৎসব লেগে গেছে। আমি গুন গুন করে গাইছি ,”আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে”। হঠাৎ মনে হলো, শীতল পাটি টা নিয়ে এলে কেমন হয় ? খানিক বাদে সত্যি সত্যিই নিয়ে এলাম। তারপর শীতল পাটিতে গা এলিয়ে দিলাম।
মেঘেদের রাজ্যে সব থেকে আকর্ষণীয় হবার গৌরবে চাঁদের আনন্দ আর ধরে না। হঠাৎ অনুভব করলাম আমার চোখ ভর্তি জল। আগেই বলেছি আমার চরিত্রে কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়েছে। খুব মুগ্ধ হলে চোখে জল চলে আসার ব্যাপারটাও নতুন। প্রথম প্রথম অবাক লাগতো। পরবর্তীতে এর উত্তর পেয়েছি। অশ্রু , কেবল দুঃখানুভূতির সাথে সম্পর্কিত নয়। এটা যেকোনো তীব্র অনুভূতির প্রতীক। যখন বাকি সকল অনুভূতিগুলো দুঃখের মতনই গভীরভাবে আমাদের হৃদয়ে দাগ কাটতে পারে, তখন সে আবেগ নিঃসৃত হয় অশ্রু রূপে।আমার এই ব্যাখ্যা কি যৌক্তিক? জানিনা । সমসাময়িক কবিদের আড্ডায় যখনই আমার ডাক পড়ে, তখন কোনো একটা প্রসঙ্গ তুলে এ প্রশ্নটা করে ফেলি। উত্তরে একবার এক কবি বন্ধু বলেছিল, সাহিত্যচর্চা ফেলে দর্শন চর্চা শুরু করেছো বুঝি?” আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। দর্শন কি সাহিত্যের বাইরে? যাক গে সেসব কথা। বরং গল্পটা বলি।মুগ্ধতার রেশ কাটতেই সারাদিনের ক্লান্তিতে আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। আধো ঘুম আধো জাগরণের মাঝে স্বপ্নে দেখলাম মেঘরাজ্যে ভেসে বেড়াচ্ছি চাঁদের সব থেকে নিকটবর্তী মেঘের খোঁজে। যেখানে জোছনায় অবগাহন করে ভুলে যাবো সব আঁধারের গল্প । হঠাৎ যেন একটা অবয়ব দেখতে পেলাম ।আমার দিকেই আসছে। মেঘের আড়ালে থাকায় তার মুখটা অস্পষ্ট। মহাশূন্যের প্রকাণ্ড নীরবতা ভেঙে আমায় জিজ্ঞেস করলো, ” জোছনার খোঁজে এসেছো বুঝি?” তার কন্ঠে বোধ করি কিছু বিদ্রুপ ছিল। আমি খানিকটা বিরক্ত হয়ে বললাম , ” তোমায় কেন বলবো ?”
আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সে বলে উঠলো , ” যার হৃদয়ে চাঁদের আলো পৌঁছে না তার জীবনে অমাবস্যা- পূর্ণিমা কি কোনো প্রভাব ফেলতে পারে ? হৃদশশী যে খুঁজে পায় তার চিরকালই পূর্ণিমা।নিজেকে প্রশ্ন করো, আলোর সান্নিধ্য পেলেই কি আলোকিত হওয়া সম্ভব?”
এ প্রশ্নের উত্তরে কি একটা বিড়বিড় করতে করতে জেগে উঠলাম। কি দেখলাম এসব? কেনই বা দেখলাম? যাক গে, স্বপ্নটা সম্পূর্ণ মনে আছে তাই ঢের । এ বিষয়বস্তুর উপর চমৎকার কবিতা লেখা যাবে। ছুটে গেলাম ঘরে। খাতায় কলমে নিয়ে বসে পরলাম। আধ ঘন্টা পর কবিতাটা খানিকটা এমন দাঁড়ালো:
জোছনার সবটুকু আলো নিজের করবো বলে ,
মেঘবালিকার আকাশ নিলাম গোপন কৌশলে ।
সেই আকাশে মেঘ ভাসাতে ছুটছি মেঘের দেশে,
এমন সময় মেঘবালিকা বলল আমায় হেসে-
এই যে শোনো , “যাচ্ছো কোথায়? “
আমি বললাম ,”মন যেথা চায়।”
সে বলল,” শোনো তবে ,
ঐ আকাশে অমাবস্যা সর্বদা অসমাপ্ত
খুঁজো না জোছনা হইয়ো না অনুতপ্ত
জ্বলে ওঠো নিজ আলোতে
যা আজ রয়েছে সুপ্ত ।”
এই বলে সে মিলিয়ে গেল হাজার মেঘের ভিড়ে ,
অভিমানী সেই মেঘবালিকা আর এলো না ফিরে।
সেই অনুতাপের বিমর্ষ প্রহরে,
ফের ছুটে যাই মেঘের শহরে ।
হয়তো কোনো এক বৃষ্টিস্নাত দিনে ,
ফের দেখা হবে তার সনে।
মন্দ নয়। কিন্তু নাম কি দেবো? মেঘবালিকার প্রতীক্ষায়? বেশ , তাই হোক। নাম ঠিক করবার পর মনে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করলাম। প্রকাশনা থেকে পান্ডুলিপি জমা দেবার জন্য তাড়া দিচ্ছিল গোটা মাস জুড়েই। বেশ কয়েকটা কবিতা লেখাও ছিল। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছিল কাব্যগ্রন্থটি অসম্পূর্ণ । এই কবিতা সেই অপূর্ণতা দূর করেছে।সিদ্ধান্ত নিলাম আমার কাব্যগ্রন্থের নাম এই কবিতার নামেই রাখবো।
পরদিন বিকেলে প্রকাশনীকে জানিয়ে দিলাম পান্ডুলিপি প্রস্তুত। তারপর চলে গেলাম বারান্দায়। সিদ্ধান্ত নিলাম এই কয়েকটা দিন আর কোনো কবিতা লিখবো না । শুধু কবিতার উপাদান গুলো প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করবো। বারান্দায় গিয়ে আকাশের দিকে তাকাতেই স্বপ্নের কথা মনে পড়লো। সেই জোছনা রাত, মেঘ বালিকা , আকাশ। রহস্যময় সৌন্দর্যমণ্ডিত চারিদিক সাথে অজ্ঞাতনামা তরুণীর কথাগুলো – কি বিচিত্র একটা স্বপ্ন! কি যেন বলছিলো সে? এই ভাবতে ভাবতো আরো গভীর ভাবনার জগতে ডুব দিলাম।আচ্ছা, কবিতার চরণে যে উপদেশ ছড়িয়ে দিচ্ছি সবার মাঝে, আমি নিজে কি তা নিয়ে ভেবে দেখেছি একবারও? কবিতা তো কখনো আমায় ধরা দেয় নি বরং আমি কবিতার পিছু নিয়েছি। কেন নিয়েছি? কবিতা কে ভালবেসে নাকি কবি হবার আকর্ষণে ? আমার জীবনের শশী কি তবে কবিতা, যার সাহচর্যে থেকে আমি আলোকিত হতে চেয়েছি এত গুলো বছর ? যে কবিতাকে স্বয়ং আমি ধারণ করতে অক্ষম, পাঠকের জীবনে সে কবিতার প্রভাব, অমাবস্যা তিথিতে চাঁদের প্রভাবের চেয়ে বোধ করি কিছু বেশি নয়। এসব এলোমেলো চিন্তা গুলো যখন পরপর সাজাতে শুরু করলাম তখন বুঝলাম “মেঘবালিকা “মূলত আমার আত্মোপলব্ধি ।
হঠাৎ বাহিরে তাকাতেই চোখে পড়ল বৃষ্টি হচ্ছে ।কবিতার শেষ চরণে যে আকাঙ্ক্ষার কথা লিখেছিলাম নিতান্তই ছন্দ মেলাবার জন্য সেই আকাঙ্ক্ষা আমার পূরন হলো । মেঘবালিকাকে আমি আর হারাতে দেবো না। কোনোদিন না


