back to top
Thursday, February 19, 2026
Homeসাহিত্যগল্পছায়ামূর্তি 

ছায়ামূর্তি 

রিয়া শহীদ

তিন দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি। আকাশ যেন বারবার অন্ধকার হয়ে আসছে, তারপর ঝাপটা বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিচ্ছে রাজশাহী শহরকে। মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে—যেন হৃদয় ভাঙার ক্ষণে হঠাৎ দুঃখের ঝলক।

বর্ষার এক সন্ধ্যা। ভেজা রাস্তায় হলুদ বাতির নিচে কুয়াশার মতো ধোঁয়া ভেসে উঠছে। বাতিগুলো যেনো ক্লান্ত, বৃষ্টির ফোঁটা আর ঘন অন্ধকারে আলোর দীপ্তিও ম্লান। রাজশাহীর আকাশে ছোট ছোট তুর্কি বাতির মতো কিছু আলো দেখা গেলেও শহরকে আলোকিত করতে পারছে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পেরিয়ে এগিয়ে আসছিলেন এক লম্বা-চওড়া, অদ্ভুত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন যুবক। দূর থেকে ভদ্রলোক মনে হলেও কাছে আসতেই বোঝা গেল—সে এক সুদর্শন, খানিকটা বখাটে স্বভাবের তরুণ। হাতে সিগারেট, ধোঁয়া ভেসে যাচ্ছে বাতাসে। কব্জিতে ছোট্ট একটি ব্রেসলেট, আর চুলগুলো হালকা কোঁকড়ানো।

বৃষ্টি তখন অনেকটা থেমে এসেছে। বিদ্যুতের চমকও কমে গেছে। ছাতা ভাঁজ করে হাতে একখানা ডায়েরি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে—রিকশা থামানোর জন্য হাত তুলল। হঠাৎ, এক তরুণী দৌড়ে এসে তার পায়ের কাছে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল।

চমকে উঠে যুবক বলল—

— দেখে চলতে পারেন না? অন্ধ হয়ে গেলেন নাকি!

মেয়েটি থতমত খেয়ে কাঁপা গলায় বলল—

— Sorry… I’m really sorry.

যুবকের চোখ পড়ল তার দিকে। ভিজে চুল গালে লেপ্টে আছে, মুখে ভয়ের ছাপ যেন কারো কাছ থেকে পালিয়ে এসেছে। হালকা বেগুনি গাউন পরা মেয়েটি যেন এই ইহলৌকিক পৃথিবীর নয়—ঠিক এক পরীর মতো। হাতে কিছু বই। নত হয়ে বইগুলো তুলতে গিয়ে তার ভিজে উড়নাটা বারবার গায়ে লেপ্টে যাচ্ছিল।বই(দেয়াল,শঙ্খনীল কারাগার,সংশপ্তক)

যুবক—আবির নিলয় চৌধুরী, তৃতীয় বর্ষের আইন বিভাগের ছাত্র।

সে বলল—

— আপনি তো একেবারে ভিজে গেছেন। চাইলে আমার ছাতাটা নিতে পারেন।

মেয়েটি ভয়ার্ত চোখে মৃদু কণ্ঠে উত্তর দিল—

— না লাগবে না, আমি ঠিক আছি। আপনি কি আমাকে একটা গাড়ি ডেকে দিতে পারবেন?

নিলয়ের কৌতূহল বেড়ে গেল।

— আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন? আমি নিলয়। সবাই নিলয় বলেই ডাকে। আপনার নামটা জানতে পারি?

কিছুক্ষণ দ্বিধা করে মেয়েটি বলল—

— আমার নাম হেমর্নিকা। রাজশাহী মেডিক্যালে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি।

ঠিক তখনই রেইনকোট পরা এক রিকশাওয়ালা এগিয়ে এলো। নিলয় দাম ঠিক করল—ষাট টাকা। দু’জনেই রিকশায় উঠে বসল।

রিকশা ছুটতে লাগল বৃষ্টিভেজা পথে। নিলয় আমতা আমতা করে বলল—

— আপনার নামটা খুব সুন্দর। হেমর্নিকা। আমি কি আপনাকে হিমু বলে ডাকতে পারি? হুমায়ূন আহমেদের “হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম”-এর মতো?

মেয়েটি মুচকি হেসে বলল—

— ঠিক আছে।

রিকশার ভেতরে নীরবতা ভাঙল নিলয়ের কথায়।

— আপনি খুব চুপচাপ। শুধু আমি-ই কথা বলে যাচ্ছি।

মেয়েটি হঠাৎ প্রশ্ন করল—

— আপনি গল্পের বই পড়তে পছন্দ করেন?

— হ্যাঁ, তবে আপনার মতো বড় ভক্ত নই।

তারপর তালগোল পাকানো কথোপকথনের মাঝেই হেমর্নিকার চোখে ভয়ের ঝিলিক। নিলয় জানতে চাইল—

— আপনি রাজনীতি বোঝেন?

অদ্ভুত লাল হয়ে উঠল মেয়েটির চোখ-মুখ। কাঁপা কণ্ঠে বলল—

— চিনি না, বুঝি না। তবে বুঝতে হবে… ঠিক দেয়ালের মতো।

রিকশা মেডিক্যালের সামনে পৌঁছাল। হেমর্নিকা নামতে গিয়ে নিলয়ের দিকে তাকাল।

— আমাদের আবার দেখা হবে তো? নিলয়ের কণ্ঠে অনুরোধ।

হেমর্নিকা মুচকি হেসে বলল—

— হয়তো হবে।

কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। রিকশা, রিকশাওয়ালা, হেমর্নিকা—কেউ নেই। শুধু বৃষ্টিভেজা অন্ধকার রাস্তা।

সেই রাতেই জ্বরে আক্রান্ত হলো নিলয়। মেডিক্যালে ভর্তি করল বন্ধুরা। জ্বরের ঘোরে শুধু একটি নাম উচ্চারণ করতে থাকল সে—হেমর্নিকা… তুমি কি সাগর পছন্দ করো, নাকি পাহাড়?

দুই দিন পর জ্ঞান ফিরল। বন্ধু হাসিব অবাক হয়ে বলল—

— নিলয়, তুই বারবার হেমর্নিকা নামে কাউকে ডাকছিলি। এই নামে তো আমাদের পরিচিত কেউ নেই।

নিলয় চুপ করে রইল। কারো কাছে বলতে পারল না—তাহলে সবাই ভ্রম বলে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু নিলয় জানে, হেমর্নিকা ছিল।

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

পরের দিন মেডিক্যালে গিয়ে সবার কাছে খুঁজল—দ্বিতীয় বর্ষের মেডিসিন বিভাগে হেমর্নিকা নামে কোনো ছাত্রী নেই। হতাশ হয়ে বসে থাকল গেটে।

হঠাৎ, পেছনে নিঃশ্বাসের মতো উপস্থিতি। এক ছায়ামূর্তি কানে কানে বলল—

— আপনি আমাকে খুঁজছেন, নিলয় সাহেব? আমি তো এখানেই আছি…

নিলয় বিস্ময়ে চিৎকার করল—

— হেমর্নিকা! আমি জানতাম তুমি আছো। তুমি কোনো ছায়ামূর্তি নও।

তারপরই অচেতন হয়ে পড়ল সে।

হাসপাতাল থেকে ফেরার পরও এক প্রশ্ন নিলয়কে পীড়া দিতে থাকে—

আসলেই কে হেমর্নিকা? মানুষ? নাকি কেবলই এক ছায়ামূর্তি?

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments