তাহমিদুল্লাহ সারাসিনী
চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এই ভর দুপুরকেও মনে হচ্ছে গভীর রাত। চোখের কাজলের মতো কিছু কালো-ফোলা মেঘ আকাশে ঘোরাফেরা করছে। “টানা কয়েকদিনের বর্ষণে চারিদিকে অথৈ পানি জমেছে। জায়গায় জায়গায় মাছেদের হইচই পড়ে গেছে। শহর এলাকার যদি এ অবস্থা হয় তাহলে গ্রামগুলোর হালত কেমন হবে কে জানে?!”
জানালার পাশে বসে বসে ভাবছে তোফায়েল।
এখন বৃষ্টি নেই তবুও বাইরে বের হওয়া যাচ্ছে না—যা অবস্থা; খাল-বিল, ড্রেন-নর্দমা সব আত্মীয়ের মতো মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
স্কুল মাদ্রাসাও বন্ধ—এক অস্বস্তিকর অবস্থা।
আগে শৈশবে সে উৎকর্ণ হয়ে থাকতো কখন মাদরাসা বন্ধের নোটিশ শুনতে পারবে!
আর এখন বন্ধ মানেই বিরক্তিকর আর অলস জীবন যাপন। হঠাৎ তার মনে পড়ন ফেসবুকটা একটু দেখা দরকার, খবর টবর কিছু আছে নাকি এই বন্যা বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে। মোবাইল অন করে যেই না সে ফেসবুকে ঢুকতে যাবে, অমনি মৃদু টুং শব্দ করে একটা মেসেজ এলো। সে তো যেন গাছ থেকে পড়লো। আরে! এতো তার চাচাতো বোন রুহির মেসেজ, সে আবার কী মেসেজ দিলো কে জানে?!
ক্লাস ফাইভে থাকতে তোফায়েলের আব্বু ও আম্মুর সাথে বাড়ি হতে শহরে আসার পর থেকে নিজের চাচাতো ভাই বোনদের সাথে তার সম্পর্কের ভাটা পড়েছে। যদিও দুই ঈদ আর বিভিন্ন উৎসবে আবার তারা সবাই খোশগল্পে মেতে উঠতো। কিন্তু ক্লাস এইটে উঠার পর থেকে তার মাঝে একটি বিরাট পরিবর্তন ঢেউ খেলে যায়। সে আর চাচাতো বোনদের সাথে বেশি কথা বলে না, চাচাতো ভাইদের সাথেও অপ্রয়োজনীয় আড্ডা গুলতানি দেওয়া থেকে বিরত থাকে, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে পড়ার চেষ্টা করে, ফজরের পর না ঘুমিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করে, কারণ— তখন থেকেই সে বুঝতে শিখেছে যে সে একজন মুসলিম। তার দুনিয়ার জীবনই শেষ নয়, আখিরাতেও একটা জীবন আছে। দুনিয়ার জীবন ইসলাম মোতাবেক না চালালে পরে আখেরাতে পস্তাতে হবে। সাথে মাদরাসায় পড়ার দরুন তার মাথায় একজন ভালো আলেম হওয়ার বাসনাও জেঁকে বসে; যাতে সে উম্মাহর খেদমত করতে পারে।
এখন সে আলিম ১ম বর্ষে। কিছুদিন আগে দাখিল পরীক্ষায় এ যাবৎকালে সারাদেশে মাদরাসা বোর্ডে সর্বোচ্চ মার্কস পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। রুহি তার থেকে বয়সে দেড় বছরের ছোট হলেও সে এখন ক্লাস এইটে; কুরআন হেফজ করতে গিয়ে সে পিছিয়ে পড়েছে। কিন্তু ছোট হলে কী হবে—সে তোফায়েলকে তুই তোকারি
করেই ডাকে। তোফায়েল অবশ্য এসব জিনিস তেলের মতো তেমন গায়ে মাখেনা।
মেসেঞ্জারে ঢুকতেই তার চোখ কপালে উঠে গেল। তার আইডি থেকে আগে থেকেই রুহিকে একটা মেসেজ দেওয়া আছে। অথচ সে রুহির আইডি কী তা জানতোই না। এবার সে বুঝতে পারলো যে কেন এই কুরবানির ঈদে বাড়িতে যাওয়ার পর রুহি তার মোবাইল চেয়েছে…আচ্ছা পাজি মেয়ে তো!
সে খুব একটা অনলাইনে থাকে না তাই আর বুঝতে পারেনি।
-কিরে তোদের মাদরাসা বন্ধ নাকি?
রুহি মেসেজ দিয়েছে। মেয়েদের সাথে কথা বলতে সে এমনিতেই ইতস্তত করে তার উপরে ইংরেজি হরফে বাংলা লেখা তো দুচোখে সহ্য করতে পারে না। তার যুক্তি হলো, উর্দু হরফে বাংলা লিখতে হবে বলে যে বাঙালিরা নিজের বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করেছে, তারাই কিনা আজকে মাকড়সা যেমন নিজের বাচ্চা ডিম খেয়ে ফেলে তেমনি নিজেদের ভাষাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে, কি আজব কথা বার্তা!
-হ্যাঁ, গতকাল আর আজকে বন্ধ ছিল, সামনেরটা জানি না।
-আচ্ছা তুই কি সাইন্সে না আর্টসে?
-আর্টসে
-কেন? তুই তো সাইন্সই নিতে পারতি..
-সেটা আমার ইচ্ছা…
-হুঁ, তা ঠিক।
কিন্তু সাইন্স নিলে তুই ভালো করতে পারতি বলে আমার বিশ্বাস..
-কেন রে? তুই সাইন্স নিবি নাকি?
-হুম চাচ্ছি, কিন্তু ভয় হচ্ছে…
-শোন, সেরা মেধাবীদের সেরারাই সাইন্সে পড়ে, তাই প্রতিযোগিতার বাজার অনেক বিশাল। সুতরাং সাইন্স নেওয়ার আগে ভালো করে চিন্তা করে তারপর নিস..
-হুম, তা সত্য।
আমাদের মাদরাসা থেকে সাইন্সে এবার ৫ জন ফেল করেছে..
-হ্যাঁ, তাতো করবেই। বেশিরভাগ মাদ্রাসাগুলোতেই ভালো ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরী কিংবা শিক্ষক কিছুই নেই। তাই সাইন্সে পড়তে হলে হয় ঢাকার কোনো ভালো মাদ্রাসায় যেতে হবে, নয়তো স্কুলে বা কলেজে—যা আমার পক্ষে সম্ভব না, তাই…
-ও,ও, বুঝেছি। আচ্ছা তোর জীবনের লক্ষ্য বা পরিকল্পনা কী?
এই প্রশ্নটার সাথে সাথে তোফায়েলের
মস্তিষ্কের মনিটরে তড়িৎ বেগে কিছু আয়াত ও হাদিস ভেসে উঠলো।
“আর তোমরা যিনার ধারে-কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।”(বনী ঈসরাইল: ৩২)
“নিশ্চয় আপনার রবের পাকড়াও বড়ই কঠিন।” (আল বুরূজ: ১২)
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যে দিন আল্লাহ্র (রহমতের) ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। তার মধ্যে দুইটা শ্রেণি হলো—
২. সে যুবক যার জীবন গড়ে উঠেছে তার প্রতিপালকের ইবাদতের মধ্যে,
৫. সে ব্যক্তি যাকে কোনো উচ্চ বংশীয় রূপসী নারী আহবান জানায়, কিন্তু সে এ বলে প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’,
(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬৬০)
আবূ উমামাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালবাসে, আর আল্লাহর ওয়াস্তে কারও সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই দান- খয়রাত করে আবার আল্লাহর ওয়াস্তেই দান- খয়রাত থেকে বিরত থাকে। সে ঈমান পূর্ণ করেছে।
(সহীহ : আবূ দাঊদ ৪৬৮১,)
তখনই সে বুঝাতে পারলো যে সে শয়তানের বিষাক্ত ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বিরক্তের সহিত পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে মারলো—
-এতো কিছু কী জন্যে?
-এই তুই কি মাইন্ড করেছিস?
আমি এমনিতে জিজ্ঞেস করলাম আরকি!
এরপর তোফায়েল দ্রুত নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার জন্য সোজা সাপ্টা রুহিকে উত্তর দিলো—
-আমার জীবনের যে লক্ষ্য, সেইটা অনুযায়ী আমাদের এই কথা বলাটা অন্যায়!
-সরি; মেসেজ দেওয়ার জন্য।
-ওকে।
তোফায়েল তাড়াতাড়ি মোবাইলটা হাত থেকে রেখে দিয়ে তড়াক করে এক লাফে পড়ার টেবিলে বসে পড়লো, সাথে সাথেই আবার সে আনমনা হয়ে খুবই ক্ষীণ স্বরে একটি কবিতা পাঠ করতে লাগলো–
“দারার জন্যে পতির ত্যাগ
তোমার জন্য আমি আছি ভেসে,
অকূল দরিয়ায় ব্যাকুলের বেশে,
পাশ দিয়ে চলে যায় শত তরী,
ডেকে যায় তবু তাতে না চড়ি,
চেয়ে আছি তোমার পানে শুধু,
তুমি ছাড়া মনটা আমার ধু ধু,
কবে তুমি আসবে অনাগত,
হবে কবে হে তুমি আগত?!
কবে তোমার নায়ে পারবো বসতে,
তোমার হাতের স্বেদের পরশ ছুঁতে,
শান্ত হবে বক্ষ–বহ্নি জ্বালা,
খুলবে আমার বদ্ধ হৃদয় তালা?!
আমারে নিতে না আসলে তুমি,
ডুবে মরে তীরে যাবো আমি,
তুমি আমার সখা—আমার দারা,
তোমায় নিয়ে ঘুরবো সারা ধরা..।”


