তনুশ্রী ঘোষ
ইডেন উদ্যান আজ জনারণ্য। স্বর্গীয় পারিজাত ফুল গাছের সারিতে সাজানো হয়েছে মাঠ,থোকা থোকা উজ্জ্বল কমলা রঙের ফুল মাঠ আলো করে রেখেছে।মঞ্চ বাঁধা হয়েছে জীবন্ত মাদার গাছ আর নীল লাল ঝুমকো লতা দিয়ে।তার পাশে বৈদিক ভিলেজের মতো মাটির ঘরে আল্পনা আঁকা। সেখানে শাস্ত্র আলোচনায় রত আর্য ঋষিরা।যেন ঋষি বিশ্বামিত্রের তপোবন।
বস্তুত ইডেন উদ্যান আজ চাঁদের হাট।বিশ্বের সেরা সব সাহিত্যিক,কবি,
লেখক,শিল্পীরা এসেছেন আজ যে ‘রানার’ পত্রিকার উদ্বোধন।যে পত্রিকার মুখবন্ধ লিখেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, প্রুফ দেখেছেন বিদ্যাসাগর, প্রচ্ছদ এঁকেছেন পিকাশো,আর অলঙ্করণে ভ্যানগঘ স্বয়ং।সুকান্তটা ছেলেমানুষ বায়না ধরল পত্রিকার নামকরণটা সেই করবে তাই পত্রিকার নাম ‘রানার’।আমি বললাম- ঠিক আছে আসলে ওকে একটু স্নেহের চোখেই দেখি তো;না হলে নজরুলের ইচ্ছে ছিল ও পত্রিকার নাম দেবে ‘আমার কৈফিয়ত’।যাক্ নামটা তেমন খারাপ হয়নি। মহাকবি কালিদাস,রামপ্রসাদ,মুকুন্দরাম,লালন,মির্জাগালিব,জসীমুদ্দীন,নজরুল,সুকান্ত,সত্যেন্দ্রনাথ,সুকুমার,তারপদ,প্রেমচাঁদ,বুদ্ধদেব,প্রেমেন্দ্র,জীবনানন্দ থেকে হাল আমলের বিষ্ণু,শক্তি,নীরেন, সুনীল,শঙ্খ,সমরেশ,নাবারুণ,সামসুর,ভবানীপ্রসাদ,শুভ, শ্রীজাত,সুবোধ, মল্লিকা,জয় গোস্বামীরা কে নেই! শরৎচন্দ্র,তারাশংকর,
বিভূতিভূষণ,মানিক,সতীনাথ,রুসদী লিখেছেন উপন্যাস।সেই পত্রিকার সম্পাদক আমি তনুশ্রী ঘোষ।শেক্সপিয়ার নিজেই আমায় লেখা পাঠিয়েছেন হোয়াট্স অ্যাপে। তলস্তয় লেভিনের হাতে।চেকভ,গোর্কি
পাঠিয়েছেন শুভেচ্ছা বার্তা।ইবসেন চার্লস ডিকেন্স এরা তো আছেনই, আফ্রিকান সাহিত্যিক চিনুয়া আচেরের মতো বিশ্বখ্যাত লেখকগণ তাঁদের লেখায় সমৃদ্ধ করেছেন আমার ‘রানার’ পত্রিকা।
ঠিক বিকেল পাঁচটায় সারা বিশ্বের নামি দামি সব লেখকগণ আসতে শুরু করেছেন।সঞ্চালনার দায়িত্বে আছে মানিক, মানে তোমাদের সত্যজিৎ রায়। অনুষ্ঠান শুরু হল। দ্বারোদঘাটন করলেন আমাদের সবার প্রিয় নেতা সুভাষ চন্দ্র বোস। মঞ্চ আলো করে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মঞ্চে একে একে নাম ঘোষণা করে ডেকে নেওয়া হল জন কিটস,বাটলার,
নেরুদা, ও হেনরী,
শেক্সপীয়ারদের। এদের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে আমাদের কালাম সাহেব।ঈশ্বর গুপ্ত আর শরৎ পন্ডিতকে বলা হয়েছে সারা মাঠ ঘুরে নেচে নেচে ছড়া কেটে সবাই কে আনন্দ দিতে।মধুসূদন টা চিরকালই একটু বে-খেয়ালী ওকে জোর করে টেনে এনে মঞ্চে বসিয়ে দিলেন বঙ্কিম।আশাপূর্ণা,শীর্ষেন্দু,সমরেশ,বেগম রোকেয়া, পবিত্র,অতীন,নবনীতারা উত্তেজনায় ফুটছে। তাঁদের লেখাও তো বেরিয়েছে এবার রানার পত্রিকায়।এতজনের লেখা সম্পাদনা করতে আমার যে কি অবস্থা হয়েছিল; ভাগ্যিস বিদ্যাসাগর মশাই ছিলেন তাই তো ম্যানেজ করতে পেরেছি। কী যে আনন্দ আমার! পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বই ‘আন্ডারস্টান্ডিং ওম্যান’ কে পিছনে ফেলে দিয়েছে আমার ‘রানার’। আনন্দে আত্মহারা হই যখন প্রাণের ঠাকুর পীঠ চাপড়ে বলছেন,”তুই একটা কাজ করলি বটে। সম্পাদিকা তনুশ্রী সারাবিশ্ব সাহিত্যকে এক ছাদের তলায় নিয়ে এসেছে। এমন ‘কবিতা কার্নিভাল’ আগে তো হয়নি।তার ওপর আবার লেখক হিসেবে সম্মানীত হব মাননীয়ার হাতে,যা আমাদের স্বপ্নেরও অতীত।”
শুধু মাননীয়ার অপেক্ষায় সকলে অস্থির। উনি ছাড়া তো পত্রিকার উন্মোচন হবে না।ঈশ্বরচন্দ্র ভীষণ ডিসিপ্লিনড্।ব্যস্ত হয়ে বার বার আমাকে জিজ্ঞেস করছেন,”মাননীয়া কখন আসবেন?তুমি ফোন কর।”
ইতিমধ্যে নেতাজীর মহাজাতিতে আর একটা অনুষ্ঠান থাকায় আমায় ডেকে অনুষ্ঠান শুরু করতে বললেন।সৌরভ বলল চিন্তা নেই আমিতো আছি নেতাজীকে আমি ঠিক সময় পৌছে দেব আমার গাড়ীতে।সমগ্র অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নের ভার নিয়েছে নীতা, মানে নীতা অম্বানী।ম্যান্ডেলার বায়না এতদূর এলাম যখন কালীঘাট টা একবার ঘুরেই যাব।নীতা তাকে আশ্বাস দিয়েছে। কবিগুরুর প্রদীপ প্রজ্জ্বোলন দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হল। মানিক তাঁর ব্যারিটন কন্ঠস্বরে আকাশ বাতাস মথিত করে অ্যানাউন্স করে চলেছে অপূর্ব দক্ষতায়।বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্র দিয়ে শুরু হয় উদ্বোধনী সংগীত। নেতাজীর সাথে গলা মেলান হেমন্ত,মান্না, রসিদ খান আর সারা কলকাতা বাসী। নেতাজী উঠে কুচকাওয়াজ শুরু করেন বিহগল বেজে ওঠে।
তাঁর সাথে আ-সমুদ্র-হিমাচলের সকল লেখক-কবিরা গলা মেলান। তাঁর ব্যক্তিত্বে মাথা নত হয়ে যায় সকলের, আচ্ছন্নের মতো শ্রদ্ধায় মাথা নত করি, আমিও।
এরপর শুরু হল একে একে বক্তব্য রাখা।প্রথমে শেক্সপিয়ার সাহিত্যের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করলেন।এরপর লিটিল ম্যাগাজিনের গতি প্রকৃতি। এই অতিমারীতে গজিয়ে ওঠা অসংখ্য পত্রিকার গুণমান সম্পর্কে আলোচনা। এরই মাঝে মঞ্চ থেকে অ্যানাউন্স হচ্ছে “তিনি আসছেন।” হঠাৎ সারা কোলকাতা স্তব্ধ হয়ে গেল।গঙ্গার জল স্থির হয়ে গেল, নদীপথ জাহাজ, স্টিমার,লঞ্চ,সব পারাপার,যানবাহন বন্ধ হয়ে গেল,বন্ধ হল হাওড়া ব্রিজ ,কোলকাতার রাস্তাঘাট, অফিস কাছারী,স্কুল, কলেজ, অফিস, মহাকরণ সব বন্ধ হল থমকে গেল ভিক্টোরিয়ার পরী।
তিনি আসছেন,গ্রীণ করিডর দিয়ে হুটার বাজিয়ে পুষ্পরথ থেকে তিনি নামলেন।
অভূতপূর্ব আলোয় ভরে গেল সারা মাঠ সন্ধ্যের আকাশ।বহুতল গুলো আলোক মালায় সজ্জিত হয়ে স্বাগত জানাচ্ছে তাঁকে।এতক্ষণে আর্য ঋষীগণ সমবেত বেদ গান শুরু করলেন, চারিদিক থেকে মঙ্লধ্বনি শঙ্খ বেজে উঠল।তিনি যে ‘রানার’ উন্মোচন করবেন, সেই মহেন্দ্রক্ষণের জন্য আবিশ্ব চেয়ে আছে।শ্বেত শুভ্র বসনা অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারিণী স্মিত হেসে দাঁড়ালেন।সুগন্ধে ভরে গেল চারিপাশ। সঙ্গে তাঁর দুই মানস কন্যা লতা আর সন্ধ্যা। সভাধিপতি কবিগুরু তাঁকে বরণ করে নিয়ে গেলেন মঞ্চে। লতা ও সন্ধ্যা গেয়ে চলেন-“এস দেবী এস এ আলোকে একবার তোকে হেরি চোখে।”
মানিক বলে ওঠে,প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করবেন আমাদের ” ‘মা’,দেবী সরস্বতী’।তাঁকে মালাও ব্যাচ পরিয়ে সম্বর্ধনা জানাচ্ছেন তাঁরই বরপুত্র কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,তাঁকে বরণ করে নেবেন আমাদের এই অনুষ্ঠানের মূল হোতা রানার পত্রিকার সম্পাদিকা তনুশ্রী ঘোষ।সকলে একসাথে হাত জোড় করে প্রণাম জানালেন দেবীকে। করতালিতে উত্তাল হল ধরণী। একদিকে বিশ্বকবি আর একদিকে আমি সামনে এ বি পি আনন্দ নিয়ে ‘রানার’ এর মোড়োক খুললেন দেবী। সমস্ত শহর জুড়ে ‘রানার’ ‘রানার’ ধ্বণিতে মুখরিত হয়ে উঠল গাছে গাছে পাখিরা গেয়ে ওঠে, “একই সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন, একই কাজে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন “।
770
বিঃদ্রঃ “ইউটোপিয়া” শব্দটি দিয়ে মূলত কল্পলৌকিক আদর্শ স্থান বোঝানো হয়। কোনও উপন্যাস বা দার্শনিক চিন্তাভাবনাসম্পন্ন কোনও রচনাকে যেখানে একটি কল্পলোকের বিবরণ দেয়া হয়। মূল গ্রিক শব্দ:eutopos অর্থ সুরম্য স্থান। এটিকে স্বপ্নলোক,কল্পলোক,স্বপ্নরাজ্য,স্বপ্নপুরী ইত্যাদি নামে ডাকা যায়।
সহজ কথায় স্বপ্নলোক বলতে এমন সব চিন্তাচেতনা বা ধ্যানধারণাকে বোঝায় যা শুধু কল্পনা বা স্বপ্নেই সম্ভব, বাস্তবে একেবারেই অসম্ভব।


