Sunday, June 16, 2024
spot_imgspot_imgspot_img

জীবন যুদ্ধ

মুহসিন আল-সাবির

ছাপ্পান্ন বছর বয়সী রাহিলার আট খন্ডে বিভক্ত শরীরটা বস্তাবন্দী অবস্থায় পাওয়া গেলো রাস্তার পাশের ঘন ঝোপের মধ্যে।এটা কোনো থ্রিলার গল্পের টুকরাংশ নয়, বরং এক বাঙ্গালী নারীর এক যুগ নষ্ট হওয়ার গল্প।

নুজহাত মুন্নি।বাইশ বছরের কোমলমতি এক নারী।সমাজের স্বাভাবিক নিয়মের বেড়াজালে বেড়ে উঠা তরুনীটি জানেনা সমাজের আরেকটা ভয়াল দিকের কথা।ক্ষমতার লোভে লোভাতুর লোকদের পৈশাচিক কর্মকান্ডের খবরও তার অজানা।রোজ আয়নার দিকে তাকিয়ে ঘন্টা পার করা, বান্ধবীদের সাথে গল্প গুজবে সন্ধ্যা পার করা, আর নব জীবনের নতুন আপনজনের ভাবনায় বিভোর হয়ে থাকা তার নিত্যকর্মে পরিণত হয়েছে।তার এই স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন ঘটলো এক মধ্যরাত্রিতে।এক ভয়ানক নির্জনতায় আচ্ছন্ন রাতে।

রাত আড়াইটা।অন্ধকারে আচ্ছন্ন গাঁয়ের প্রতিটা বাড়ির আলো নিভে গেছে।নিভিয়ে দেয়া হয়েছে হারিকেনের টিমটিমে আলোকেও।রাস্তার পাশের বাড়িগুলোর মধ্যে হাতেগোনা চার-পাঁচটা বাড়ির বাইরের লাইট জ্বালানো।তারা গ্রামের উচ্চবিত্ত
প্রভাবশালী ব্যক্তি।চাঁদহীন দুনিয়াটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে আছে।পাহারাদার কুকুরটাও আলগোছে বসে পড়লো মাটিতে।এমন নির্জনতায় দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়া কি শোভা পায়? ঠিক তখনি কাঠের দরজায় ঠকঠক আওয়াজ।প্রথমে আওয়াজটা কারো কানে না লাগলেও যখন দুই চারজন মানুষের ধাক্কাধাক্কি সহ গলার স্বর শোনা গেলো তখন বাড়ির সবাই ঘুম থেকে উঠে বসলো, সবাই বলতে নুজহাত ও তার মা-বাবা-দাদী।তার দুই ভাই ব্যবসায়ের কাজে অন্য শহরে গেছে দুদিন হলো।একমাত্র চাচা তার পরিবার নিয়ে শ’মাইল দূরে কর্মস্থলের পাশেই থাকে।বাড়িতে মধ্যবয়সী বাবা-মা, নুজহাত মুন্নি ও তার বৃদ্ধা দাদী। আর কেউ নেই।দরজা খুলতে সাহস হচ্ছিলো না কারো। দরজা ধাক্কানোর এমন আওয়াজে শেষমেষ বাধ্য হয়ে দরজা খুললো মুন্নির বাবা।পুলিশের খাকি পরিহিত পাঁচজন লোক হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো ঘরে।নুজহাত ও তার বাবাকে ঘরের বউ রাহিলার হত্যাকান্ডে জড়িত হিসেবে যথাক্রমে তিন নম্বর ও আট নম্বর আসামী হিসেবে এরেস্ট করে নিয়ে যাচ্ছে নিকটস্থ থানায়।গহীন অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বাকিটা রাত এক বুক হাহাকার ও আহাজারি নিয়ে কাটিয়ে দিলো দুজন নারী।কী করা উচিত আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা ছাড়া? জানা নেই তাদের।

………………..
নুজহাতের দাদা পিতৃ সম্পদ হিসেবে একটা তেত্রিশ শতাংশের জমি পেয়েছিলো।জমির মালিক বিক্রিত জমির পূর্ন টাকা হস্তগত করার পর দলিলে সাইন করার পূর্বেই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেছিলেন।ফলশ্রুতিতে তার সন্তানাদির সাইনের মাধ্যমে জমিটার মালিক হিসেবে গন্য হয় নুজহাতের দাদার পিতা।রাহিলা সেই জমি বিক্রেতার কনিষ্ঠ কন্যা, যার বয়স তখন মাত্র তিরাশি দিন ছিলো।প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর সে নিজের ভাই-বোনদের সহায়তা নিয়ে সবটা জমি দাবি করছে ।এই নিয়ে নুজহাতের জন্মের পূর্ব থেকে দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব চলছে।নুজহাত জন্মের পর নিজেদের শত্রু হিসেবে জেনেছে এই রাহিলা নামক নারীর পুরো পরিবারকে।

একদিন সন্ধ্যায় নিজের বিশ বছর বয়সী ভাই নাঈম ভয়ে কাচুমাচু মুখ নিয়ে বাড়ির দোরগোরায় এসে দাড়ালো, সাথে নববধূর বেশে সগর্বে দাড়িয়ে ছিলো পঞ্চাশ বছর বয়সী রাহিলা।সেদিন থেকে সংসারের অভ্যন্তরীন শান্তি সব শেষ।ইতিপূর্বে এই নারী পাঁচটা পরিবার ধ্বংস করেছে।অশালীন ও উদ্ভট ভাষা প্রয়োগে উনার মতো দ্বিতীয় কোনো নারী পৃথিবীতে আছে কিনা জানা নেই নুজহাতের।স্বাভাবিক কথাতেও উনি অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেন।যার ফলে চাচা ফুফুরা শেষ পাঁচ বছর নুজহাতদের বাড়িতে আর আসেনি।নুজহাতের পরিবারের কোনো সদস্যও এক মুহুর্তের জন্য মেনে নিতে পারেনি রাহিলাকে।নিকৃষ্ট মহিলাদের তালিকায় নাম লিখানো এ নারী সমাজেরও চোখের বিষ ছিল।যার কারণে গ্রামের কেউ তেমন আসতোনা নুজহাতদের বাড়িতে।গত সপ্তাহে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলো এই নারী।উনার অনুপস্থিতির খবরেই নুজহাত বেড়াতে চলে আসে এ বাড়ি।এক সপ্তাহে একবারও এ বাড়ির কেউ উনার খোঁজ নেয়নি।বিপত্তিটা এখানেই বাঁধে।কে বা কারা রাহিলাকে মেরে রাস্তার পাশে ফেলে রেখেছে, অথচ কেস করা হয়েছে নুজহাতের পরিবারের প্রতিটা পুরুষ সদস্যকে।বাপ-চাচা-ভাই সহ নুজহাত ও নুজহাতের স্বামী মোট আটজনকে আসামী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।নুজহাত ও তার বাবাকে আইনের আওতায় আনা হলেও বাকিরা সবাই পলাতক আছে।রাহিলা নামক নারীটা জীবিত অবস্থায় যতটা অশান্তি করেছে, মৃত্যুর পরে যেন অশান্তি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

বারান্দায় গ্রিল ধরে দাড়িয়ে আনমনে আরো অনেক কিছু ভাবছিলো নুজহাত।জেলখানায় আজ তার এগারোতম দিন।এই এগারো দিনে কাঁদতে কাঁদতে চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে তার।গালে লেগে আছে অশ্রুর দাগ।এক রাতও ঘুমাতে পারেনি এ ক’দিন, খাবার-পানীয় যেন আটকে থাকে বুকে।বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে গেলেও কান্নারা দলা পাকায় গলায়।ডুকরে কেঁদে উঠে বারবার।ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কান্না ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তার।আশেপাশে আরো শতশত কয়েদী অবাক ও উৎসুক নয়নে তাকিয়ে থাকে নুজহাতের দিকে।কেউ আবার কৌতূহলী মন নিয়ে এগিয়ে আসে, মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চায় এই অন্ধকার কুঠুরীতে আসার কারণ।নুজহাত কথা বলতে পারে না, ওর কান্নার শব্দ আরো বেড়ে যায়।দু-চারদিনে মহিলারা বিরক্ত হয়ে যায়।এখন আর কেউ পাশে ঘেষে না তার।

এই জেলখানার চারিপাশে নানা রকম গাছ আছে।গাঁদা ফুল, জবা, গেইট ফুল সহ আছে মধুমঞ্জরী, টগর ও অন্যান্য ফুল-ফলের গাছ।নুজহাত আনমনে তাকিয়ে রইলো সেইসব ফুলের দিকে।খেয়াল করে দেখলো, এতো ফুল এতো গাছ থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রজাপতি, ফড়িং কিংবা পাখি নেই আশেপাশে কোথাও।লোহার দরজায় লাঠির আঘাতে ধ্যান ভাঙ্গে নুজহাতের।মহিলা পুলিশ কাউকে নিতে এসেছে বোধহয়।প্রতিদিনই কয়েকবার করে আসে,কারো গার্জিয়ান আসার সংবাদ দেয় আবার কাউকে কোর্টে নিয়ে যায়।
-মুন্নি কে? গার্জিয়ান আসছে, তাড়াতাড়ি বাহিরে আয়।
মুন্নি তড়িৎ চোখের পানি মুছে দরজার কাছে আসতেই মহিলা পুলিশ আবার বললো- ব্যাগপত্র নিয়ে আয়, কোর্টে চালান করে দিবে।
তারপর কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,
-“জোয়ান মাইয়া, পরির লাহান চেহারা।এই চেহারা নিয়া ব্যস্ত থাইকাই তো দিন কাটাইতে পারস।খুন খারাবি করতে গেলি কেন্? অংকা সারা জীবন কোর্টে দৌড়াদৌড়ি কর, শান্তির ঘুম আর কোনোদিন ঘুমাইতে পারসনি আল্লায় জানে।তোর লাগিয়া মায়াই লাগে।এই বয়সে জেলে চইল্লা আইলি।”নুজহাত মুন্নি চোখের জলটা মুছে নেয় আবারও।বুকের ভেতরে মনে হয় একটা অশ্রুনদী আছে, কেউ কথার ঢিল ছুড়লেই তাতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ে চোখের কার্নিশ বেয়ে উপচে পড়ে জল।
সারাদিন কোর্টের রুমে বন্দি থেকে সন্ধ্যায় জামিনে ছাড়া পেয়ে বাড়ি আসে নুজহাত।তার ফুফাতো ভাই সারাদিন কোটচত্ত্বরে দৌড়াদৌড়ি করে অবশেষে মুক্তির ব্যবস্থা করে তার।সাময়িকভাবে মুক্তির আনন্দ পেলেও অজানা আরো অনেক আশংকায় ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরছিলো সে।

…………………….
রাত বারোটা বেজে গেলেও নুজহাতের চোখে ঘুম নেই।বাড়ির বাকি সবাই মেয়েকে কাছে পেয়ে প্রশান্তির ঘুমে রাত্রিকে নিঝুম করে নিয়েছে সন্ধ্যা পেরুতেই।এতদিনের নির্ঘুম রাতের কাযা যেন আজই আদায় করতে হবে।এই মুক্তির আনন্দ নুজহাতের ‌মন ছুতে পারেনি শুধু।জামিনে মুক্তি পাওয়া মানে আবারও জেলে যাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত।এই এগারোদিন তার বর একবারও জেলে যায়নি তার সাথে সাক্ষাত করতে।না ফোন করে খোঁজ নিয়েছে একবার।ভেতরে ভেতরে অভিমান দানা বাঁধতে শুরু করেছে তার।ঠিক তখনি বাড়ির বাইরে শুকনো পাতার মড়মড়ে ধ্বনি কানে বাজলো তার।খুবই ধীর সেই ধ্বনি।যেন কেউ অতি
সন্তর্পনে ধীরপদে এগিয়ে আসছে তারই রুমের পাশে।ছোটবেলা থেকে জানালার পাশে পাতানো বিছানায় নুজহাত ঘুমায়।আজও তার ব্যতিক্রম নয়।বিষয়টা প্রায় সবাই জানে।এক জোড়া পা জানালার ঠিক পাশে এসে থামল।নুজহাত কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো একপার্শ্ব হয়ে।ক্ষনিক বাদেই হালক কড়াঘাত, সাথে মৃদুস্বরে কেউ বললো, “মুন্নি, জেগে আছো? দরজাটা খুলো প্লিজ।” কন্ঠস্বরটা শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো নুজহাত মুন্নি।এটা তার চিরচেনা সেই মানুষটির কন্ঠ, যার প্রতি একটু একটু অভিমান মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিলো কিছুক্ষন আগে।সে কালবিলম্ব না করে চুপিসারে মেইন দরজা খুলে তিন রুম পেরিয়ে তাকে নিয়ে এলো নিজের রুমে।বাড়ির আর কেউ কিছুই জানতে পারলো না।

ফজরের পরপর বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নুজহাত ও তার বর জাবির বেরিয়ে পড়লো।বাস স্টেশনের এক চেয়ারে বসে রইলো দুজন।নুজহাত ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো,
-এখন কোথায় যাবো আমরা?
-ময়মনসিংহ যাবো।
-কার বাসায়? চাচার বাসায় নাকি?
-হুম।
-কি বলছ এসব? চাচা চাচী অলরেডি এই কেইসের আসামি।তারাও হয়তো পালিয়ে বেড়াচ্ছে।আর তুমি কিনা তাদের বাড়ি যাবে বলছো।
-কিছু করার নেই।আমার আত্মীয় স্বজন সবার বাড়িতে পুলিশ প্রতিদিন একবার করে যাচ্ছে আমার খোঁজে।সবাই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে ।তাই দেখি তোমাকে নিয়ে কোথায় মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পাই।আমি একবার এরেস্ট হতে পারলে আর জীবনে মুক্তি পাবোনা।আমার ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, পয়সাওয়ালা কিংবা ক্ষমতাধর কোনো আত্মীয় স্বজনও নেই।সুতরাং পালিয়ে বেড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।তোমার চাচার বাড়িতে আগে যাই।তারপর সেখানে গিয়ে নাহয় ভাববো কোথায় যাওয়া যায়, কি করা যায়!

নুজহাতের মন সায় দিচ্ছিলোনা জাবিরের কথা মানতে।এক বিপদগ্রস্থ লোক কী করে আরেকজনকে সহায়তা করবে? কী ভাববে তারা? এছাড়া কোনো উপায়ও নেই।তাই চুপচাপ মেনে নেয়া ছাড়া কোনো পথও খোঁজে পাচ্ছেনা।

“””””””””””””””””””””””””””””””‘””‘”””

বিকেল তিনটায় গন্তব্যস্থানের পাশের স্টেশনে নামলো নুজহাত-জাবির।রিক্সা ভাড়া করতে গিয়ে নজর পড়লো এক দম্পতির উপর।কালো বোরকায় আবৃত এক নারী ও তার তিনজন ছোট ছোট সন্তান।সাথে দেখা যাচ্ছে চাচার শালাকে।নুজহাত আর জাবির আশাহত হলেও এগিয়ে গেলো সেই দম্পতির দিকে।চাচী তার ভাইয়ের সাথে চলে যাচ্ছে বাপের বাড়ি।সকালে নাকি পুলিশের লোকেরা সাবধান করে গেছে উনাকে।এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ছাড়তে বলেছে।নতুবা একই কেসে উনাকেও ফাঁসানো হবে স্বামীর অপরাধের সহযোগী হিসেবে।তাই তিনি ভাইয়ের সাথে চলে যাচ্ছেন নিরাপদ জায়গায়।

নুজহাত অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো চাচীর পানে।মুখ ফুটে আর বলা হলোনা নিজের নিরাপত্তার কথা।গাড়ীতে চড়ে তারা চলে যাচ্ছিলো নিজ গন্তব্যে, আর নুজহাত জাবির সেদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। রাস্তার পাশে পাতানো ব্যাঞ্চে বসে পড়লো দুজনে।এখন কী করা উচিত, কারো মাথাই কাজ করছে না।ঘন্টা দু-তিন নিরবভাবে এক ধ্যানে রইলো দুজন।কেউ কারো সাথে কোনপ কথা বলেনি।সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামছিলো পৃথিবীর বুকে।ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছিলো চারিপাশের একটা একটা করে বাতি।জাবিরের কোনো ভয় না থাকলেও নুজহাতের ভয় শুরু করছে।রাতটা কি এখানেই কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলো নাকি জাবির।ওর মত মাথা পাগল যা তা সিদ্ধান্ত নেওয়াটা স্বাভাবিক।এবার নুজহাত মুখ খুললো,
-আর কতক্ষন এভাবে বসে থাকবো?
-জানিনা,
-মানে কী হ্যা? সারারাত রাস্তায় কাটাবো নাকি?
-হুম।আমি তো রাস্তায়ই কাটাতে পারবো।তুমি কী করবে সেটা তোমার ব্যাপার।
-ব্যাপারটা যদি আমারই হয়, তাহলে আহ্লাদ করে আনলেন কেন আমায়? বাড়িতেই তো ভালো ছিলাম।
-এগারোদিন জেলে থেকেছ।আবার গেলে কি ছাড়া পাবে?
-এমন রাস্তায় ঘুমানোর চেয়ে জেলখানায় আরো ভালো।নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়না।
-তাহলে চলো, রেখে আসি নিরাপদ জায়গায়।জেলখানায়।
-ধ্যাৎ, সবসময় মজা ভালো লাগেনা।
-আমারও ভালো লাগেনা।
-চলো চাচীর বাসাতেই যাই।বারান্দায় কাটিয়ে দিবো রাতটা।কাল কোথায় যাবো সেটা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখবো দুজন।

প্রস্তাবটা মন্দ নয়, রাস্তায় থাকার চেয়ে বারান্দায় থাকা অধিক নিরাপদ।ক্লান্ত শ্রান্ত ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে আবারও পথ চলতে শুরু করলো তারা দুজন।ভাগ্যটা ভালো যে বাড়ির মেইন দুয়ারের চাবি বারান্দার বাঁশের কঞ্চিতেই ঝুলানো পেলো।ফলে রাতে পেট পুরে খেয়ে এক শান্তির সুগভীর ঘুমে নিমজ্জিত হয়ে পড়লো দুজন।আবার কবে এমন ঘুম ঘুমাতে পারে কে জানে?
“””””””””””””””””””””””””””””””

-তোর জামাই কবে যাবে রে?
-জানিনা ভাবী।জিজ্ঞেস করিনি।
-জিজ্ঞেস কর।তুই আমাদের মেয়ে, আমাদের বাড়িতে মাস কী মাস থেকে যা, সমস্যা নেই।ডাল ভাতে মাস শেষ করে নিবো।কিন্তু জামাইকে কী ভালো মন্দ না খাওয়ালে চলে? এতো সামর্থ কোথায় যে রোজ রোজ ভালো কিছু রান্না করবো? তোর জামাইকে বল কোনো কাজ যোগার করতে।তুই আমার কাছেই থাক।আশেপাশের মানুষগুলোও বিষয়টা ভালো চোখে দেখছেনা।বুঝতে পারছিস?
-হুম।
-মন খারাপ করলি নাকি? কিছু মনে করিস না।কী করব বল?
-কী মনে করবো।
মেকি হাসি হেসে ভাবীর সামনে থেকে প্রস্থান করলো নুজহাত।কবে থেকেই নুজহাত তার বরকে কাজের কথা বলছিলো।কোনো হেলদোল নেই তার।শেষ পর্যন্ত ভাবী মুখ ফুটে বলেই ফেললো।দশদিন ফুফাতো ভাইয়ের বাড়িতে স্বামী নিয়ে থাকাটা দৃষ্টিকটুই বটে।কিন্তু জাবির যেন বুঝতেই চায়না।যেভাবেই হোক, আজ তাকে বুঝিয়ে পাঠাতেই হবে বাড়ি।চাইলে তো নিজের বাড়িতেও ঘুরে আসতে পারে।ভাবীর কথাটা জাবিরকে সরাসরি বলা ঠিক হবে না।বরং অন্য কথায় এই প্রসঙ্গ আনতে হবে।
আরো নানান ভাবনায় ধীরে ধীরে জাবিরের পাশে এসে বসলো নুজহাত।
কতক্ষণ চুপ করে বসে থেকে তারপর মুখ খুললো।
-মায়ের কী খবর জানো? খোঁজ নিয়েছো?
-ভালোই আছে।গতকাল কথা হয়েছিলো।
-কী বললো? ওদিকের কী অবস্থা? পুলিশ কী আসে?
-শেষ তিনদিন আসেনি একবারও।
-তুমি একবার বাড়িতে ঘুরে আসো।বাড়ির পরিস্থিতি দেখে আমাকে নিয়ে যেও।আর কত অন্যের বাড়িতে থাকবো?
জাবির নুজহাতের দিকে আড়চোখে একবার তাকালো।তারপর খানিকক্ষন নিচের দিকে চেয়ে থেকে বললো- “আজ সন্ধ্যার পরেই বাড়িতে একবার ঘুরে আসবো ভেবেছিলাম।তুমি যখন চাইছো, এখনি যাই।দেখি কোনো ব্যবস্থা করতে পারি কিনা? আর কতদিন পালিয়ে বেড়াতে হবে কে জানে? “
এতো সহজে রাজি হয়ে যাবে ভাবেনি নুজহাত।নাকি শুনে ফেলেছে ভাবীর কথা, আল্লায় জানে।গেলেই হলো।কিছুটা হালকা লাগবে ।কেমন যেন অস্বস্তিতে দমবন্ধ হয়ে আসছিলো তার।
,,,,,,,,, ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
তিনদিন হলো বাড়ি এসেছে জাবির।এই তিনদিন একবারের জন্যও বাড়ি থেকে বের হয়নি সে।বলা যায়না কে আবার পুলিশকে খবর দিয়ে দেয়।কী অদ্ভুত ভাগ্য তার? বিয়ে হয়েছে মাত্র এগারো মাস।শ্বশুরবাড়িতে প্রায় গেলেও নুজহাতের ঐ ভাবীর সাথে কথা হয়নি তার একবারও।পুরো পরিবারে তার রাজত্ব চললেও কেউ আপন মনে করতো বলে মনে হয়নি।নুজহা‌তও কোনোদিন পরিচয় করায়নি ঐ নারীটার সাথে।অথচ এমন অদেখা অজানা নারীর খুনের দায়ে এখন পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে ।কে বা কারা খুন করেছে সে নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। বরং সন্দেহ করে জেলে ভরতে কোনো কষ্ট হবে না।তাই পুলিশের লোকেরা তার চেনা জানা লোকদের হয়রান করছে রোজ।আসল কালপ্রিট এসব রঙ তামাশা দেখে মুচকি হেসে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে হয়তো।
সন্ধ্যার পর পারিবারিকভাবে একটা মিটিং বসেছে জাবিরদের বাড়িতে।এই কেস থেকে উদ্ধার হওয়ার উপায় বের করতে হবে।সবাই নানাবিধ কথা বলে যা বুঝা গেলো, এই কেস থেকে টাকা পয়সা কিংবা ক্ষমতার জোরে রেহাই পাবেনা।বরং বুদ্ধি খাটাতে হবে।পরিবারের সবার একটাই সিদ্ধান্ত, এমন মেয়েকে বউ হিসেবে রাখা যাবেনা।তাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলে ঐ পরিবারের সাথে কোনো সম্পর্ক থাকবেনা, ফলে কেইসও টিকবে না।তাছাড়া যেই মেয়ের আগমনে বছর না ঘুরতেই আসামীর খাতায় নাম লিখাতে হয়, সেই মেয়ে অলক্ষুনে।এমন মেয়ে সংসারে থাকলে জীবনটা তেজপাতা করে ছাড়বে।আরো অনেক কিছুই বলছিলো জাবিরদের পরিবার।কিন্তু জাবির কিছুতেই নুজহাতকে তালাক দিতে রাজি হলোনা।অন্য কোনো অপশন আছে কিনা জানতে চাইলো সে।জাবিরের মামা এগিয়ে এসে বললো, “আমার কাছে একটা অপশন আছে ।তুই যদি কথা দিস মানবি আমার কথা, তবেই বলবো।”
জাবির কিছু বলার আগে জাবিরের মা এগিয়ে এসে বললো,
-কি করতে হবে বলেন ভাই, সে যদি না মানে তবে আমার মরামুখ দেখবে।এই কেস থেকে আমার ছেলে বাঁচতে না পারলে আমি গলায় দড়ি দিমু।আমাকে কেউ ঠেকাইতে পারবেনা।এই অপমানের জিন্দেগি আর ভালো লাগেনা।।
বোনের কথায় জাবিরের মামা মুচকি হাসলেন, উনি তো এমনটাই চেয়েছিলেন।তিনি হাসিমুখে প্রস্তাব দিলেন,
-আমার মেয়ে মাহিনূরকে বিয়ে করতে হবে।বিনিময়ে তোর কেসটা আমি মিটিয়ে দিবো, যত টাকা পয়সা লাগে আমি দিবো।আর তোর প্রথম বউ নিয়েও আমাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই।
এমন প্রস্তাব শুনে জাবিরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।কিন্তু জাবিরের মা প্রথমে থমকে গেলেও ছেলের ভবিষ্যতের চিন্তা করে পরে রাজি হয়ে গেলো।
তারপর থেকে শুরু হলো পারিবারিক ড্রামা ও ইমোশনাল ব্লাকমেইল। জাবিরের মায়ের একটাই কথা।মাহিকে বিয়ে না করে বাড়ি থেকে পালালে গলায় দড়ি দিবে, এ জীবন আর রাখবেনা।এক টুকরো খাবার কিংবা এক ফোঁটা পানি গিলবেনা ইত্যাদি ইত্যাদি।

অবশেষে তিনদিনের মাথায় জাবিরের মায়ের উদ্দেশ্য সফল হয়।ইজাব-কবুল হয়ে যায় জাবির ও মাহির।বিয়ের ঘন্টাখানেকের মধ্যেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরে জাবির।মানসিকভাবে অসুস্থ বা আধপাগল মাহিকে গছিয়ে দিতে পেরে জাবিরের মামাও খুশি।নুজহাতকে বাড়ি ছাড়া করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

…………………
-আর কত দূর হাটবো?
-যতদূর চোখ যায়।
-তুমি তো বললে বাসা নিয়েছ, কোথায় নিয়েছ বাসা? চার ঘন্টা ধরে হাটছি, একটা গাড়িও তো নিতে পারো নাকি?
-নাহ, নিতে পারিনা।পকেটে এক টাকাও নেই।হাটতে হাটতে যেখানে রাত হবে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়বো।
-কী? কী বলতে চাও তুমি? বাড়ির ঠিকানাটা অন্তত বলো।
-কোনো ঠিকানা নেই।তুমি বলেছিলে আমি পাশে থাকলে তুমি গাছতলায়ও থাকতে পারবে।এখন সময় এসেছে তোমধর ভালোবাসা প্রমান করার।দেখি কয়দিন টিকে ভালোবাসা।

নুজহাতের বিরক্তি এবার সীমা ছাড়িয়ে যায়।নতুন বাসা নিয়েছে বলে ঐ বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে এসেছে জাবির।অথচ এখন সিনেমার নায়কদের মতো ভালোবাসার প্রমান চাইতেছে।এই লোকটাকে চিনতে খুব কষ্ট হয় নুজহাতের।মাঝে মাঝে মনে হয় খুব যত্নশীল প্রেমিক সে, যার কাছে নির্দ্বিধায় এক জীবন পার করা যায়।আর মাঝে মাঝে মনে হয় এই লোকটা একটা পাগল, যাকে এক মুহুর্তও সহ্য করা সম্ভব নয়।

দোকানের সামনে পাতানো বেঞ্চিতে বসে ঝিমুতে ঝিমুতে রাত পার করলো দুজন।ভোরবেলা জাবির মোবাইল ফোনটা পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।কিনে নেয় সামান্য কিছু খাবার।খেতে খেতে নুজহাত জানতে চাইলো গন্তব্যস্থান নিয়ে। জাবির ভাবলেশহীনভাবে জবাব দেয় “গতকালের মতোই পায়ে হেটে ঘুরে বেড়াবো পুরো শহর।”
নুজহাত কী বলবে ভাষা খুঁজে পায়না।একরাশ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে চুপ হয়ে যায়।যা খুশি করুক লোকটা।শাস্তি দিতে চাইছে সম্ভবত।নুজহাতও মনে মনে ঠিক করে নিলো, আর কোনো প্রশ্ন করবে না, আর কোনো কথা বলবে না।শুধু দেখবে লোকটার এই পাগলামি কয়দিন চলে।
,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

সপ্তাহ গড়িয়ে গেলো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে।কোনো গন্তব্য ঠিক হয়নি জাবির ও নুজহাতের।নাওয়া খাওয়া বিশ্রাম সব ভুলে শুধু হেটেই চলছে অলিগলি।রোদ্রতাপে ঘেমে জামা ভিজে, আর রাতের শীতলতায় সেই ঘাম শুকায়।একটু শান্তির ঘুম ও নিরাপদ জায়গায় বসার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে নুজহাতের।কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলছেনা জাবিরকে।সব রাগ-অভিমান একপাশে রেখে জাবিরকে নুজহাত বললো,
-আজ যদি গোসল না করতে পারি, আমি মরেই যাবো, নয়তো পাগল হয়ে যাবো।
-মসজিদের পুকুরে গোসল করবে?
-নাহ, আমাকে কারো বাড়িতে নিয়ে চলো।
-আচ্ছা ব্যবস্থা করছি।

একশত টাকা বখশিশ দিয়ে রাস্তার পাশের এক বাড়িতে গোসল সেরে নেয় নুজহাত।প্রশান্তিতে তার চোখ বুজে আসছিলো যেন।কিন্তু জাবির এক মুহুর্তও আর বসতে দেয়নি তাকে।নুজহাত এবার কেঁদে দিলো।বললো,
-কী হয়েছে তোমার? এভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছ কেন? অন্তত আমার বাড়ি নিয়ে চলো।আমি পারছিনা আর।
-মাত্র আটদিন হলো, এখনি এই হাল? আর আমি যে একমাস ধরে এমন একা একা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি? তোমার পাশে তো আমি আছি।আমার পাশে তো কেউ ছিলো না।বিশ্রাম নিতে একটু বাড়িতে যাই, আর তুমি শুধু বাসা বাসা করো।এবার বুঝো মজা।
-তুমি নিজের কষ্টটা বুঝানোর জন্য আমায় এতদিন কষ্ট দিলে?
-হুম
-তুমি বললেই আমি বুঝতে পারতাম।
-এখন যেভাবে বুঝতে পারলে, তখন তেমন বুঝতে না।
-আর কতদিন চলবে এমন?
-যতদিন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারি।

জাবিরের অভিপ্রায় বুঝতে পারে নুজহাত।নিশ্চিত পাগল হয়ে গেছে চিন্তায়।নতুবা চাকরি বাকরি না খুঁজে কেউ বউ নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে নাকি? আর পারা যাচ্ছে না এমন পাগলামি। ফাঁক বুঝে জাবিরের চোখ এড়িয়ে দোকানের মোবাইল নিয়ে নুজহাত একটা নম্বরে ডায়াল করে জানিয়ে দেয় নিজের লোকেশন।

সেদিন বিকেলেই তার চাচা এসে নিয়ে যায় নুজহাতকে।জাবিরকেও বলেছিলো সঙ্গে যেতে, যেতে রাজি হয়নি জাবির।কাজের বাহানা দিয়ে জেদ করে রয়ে গেছে সেখানেই।মেজাজ তার তুঙ্গে।বাড়িতে যাওয়া মানে আরেকটা পাগল পাল্লায় পড়া।অনেক ভেবেচিন্তে নুজহাতকে উচিত শিক্ষা দেয়ার কথা ভেবে নিজ বাড়িতেই ফিরে গেলো।সিদ্ধান্ত নেয় মাহিকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে, আর নুজহাতকেও কখনো ত্যাগ করবেনা।যাই হয়ে যাক না কেন।

………………………….
আট বছর পর।কোর্টের চত্ত্বরে দাড়িয়ে আছে নুজহাত।বড় ভাইয়া রিকশা ডাকতে গেলো বাড়ি ফেরার জন্য।আজ পুরো গ্রামে মিষ্টি বিলাবে নুজহাত।অবশেষে সেই মার্ডার কেস থেকে খালাস পেয়েছে সে।সকাল নয়টা বাজে এসেছে এখানে।কাগজপত্র সব হাতে পেয়ে কাজ সারতে বিকেল চারটা বেজে গেলো।তার বর ফাহিমকে কিছুই জানানো হয়নো এ ব্যাপারে।এক কথায় কেস-মামলার কথা গোপন রেখে ফাহিম আর নুজহাতের বিয়ে হয় দেড় বছর পূর্বে।আজ ফাইনালি ধরা পড়ার ভয়টা কাটলো।কী দুশ্চিন্তায় যে কেটেছে এতগুলো বছর একমাত্র আল্লায় জানে।

বাড়ি ফিরে মোবাইল চালু করে দেখলো ফাহিমের পঞ্চান্নটা মেসেজ।নুজহাত আর দেরি না করে ফোন করলো তার বরকে, নিশ্চিন্ত কন্ঠে বললো মোবাইলে চার্জ ছিলো না ও বাড়িতে কারেন্টও ছিলো না।তারপর ঘন্টাখানেক কথা বলার পর ফোন কেটে দেখে অচেনা একটা নম্বর থেকে তেরোটা মিসডকল।নম্বরটা কার হতে পারে ভাবতে ভাবতে আবারও ফোন বেজে উঠলো।ফোন রিসিভ করতেই ওপ্রান্ত থেকে শোনা গেলো একটা রাশভারি কন্ঠস্বর।চিরচেনা সেই কন্ঠ যা চরম বিরক্তিকর অতীতকে মনে করিয়ে দেয়।
-কেমন আছ মুন্নি।
-আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ অনেক ভালো রাখছে, কোনোদিন ভাবিনি যে এতো সুখ আল্লাহ আমার কপালে রাখবে।
-সত্যিই খুব সুখে আছ?
-হুম, অনেক সুখে আছি।যে কেসের কারনে আপন পরের তফাৎটুকু বুঝতে পেরেছিলাম, সেই কেসটা থেকে আজ মুক্তি পেলাম চিরতরে।
-তাহলে তো আজ তোমার ইদের দিন।আফসোস তোমার ইদে আমি তোমার সাথে নেই।
-আলহামদুলিল্লাহ যে আপনি আমার পাশে নেই ।থাকলে হয়তো এতোটা খুশি থাকতাম না।
-এইভাবে ভুলে গেলে আমায়? আমি কিন্তু তোমাকে ত্যাগ করিনি।তাহলে তুমি কী করে আরেক জায়গায় বিয়ে করলে? এই বিয়ে কোনোমতেই জায়েজ হবেনা।
-আপনি আমাকে তালাকে এখতিয়ার দিয়েছেন।বলেছিলেন “সতীন মেনে নিতে পারলে থাকো, নয়তো চলে যাও।আমার কোনো দাবি নেই।তুমি স্বাধীন।”এটাও এক প্রকার তালাক।আমি সেই তালাক মনে প্রানে মেনে নিয়েছি।
-আমি সেই কথাগুলো মন থেকে বলিনি।এমনিই মুখে মুখে বলেছিলাম।মন থেকে না বললে তালাক হয়না।
-আমি তালাকের সব কাগজপত্র মন থেকে তৈরি করে পাঠিয়ে ছিলাম।আপনি তা গ্রহন করেছেন।তারপর আমি তিনবছর পর মন থেকেই বিয়ে করেছি।আশা করছি আমার নতুন সংসার জীবনে আপনি আর নিজের কুৎসিত ছায়া ফেলবেন না।ভালো থাকবেন।আল্লাহ হাফেজ ।

  • একটা কথা শোনো মুন্নি,…

নুজহাত মুন্নি আর কথা না বাড়িয়ে ফোন কেটে দিলো, সাথে নম্বরটা ব্লকলিস্টে যোগ করে নিলো।সেদিন চাচার সাথে চাচার শ্বশুর বাড়িতে চলে গিয়েছিল নুজহাত।চাচীর সাথে প্রায় নয়মাস থেকেছে।উনার বড় ভাবী, মেজ ভাবীর বাপের বাড়ি, বড় বোন মেজো বোনের শ্বশুর বাড়িসহ নানার বাড়ি মামার বাড়ি আরো কত বাড়িতে যে থেকেছিলো এই নয়মাস তার ঠিক নেই।অনেক চেষ্টা করেছিলো জাবিরের সাথে কথা বলতে, কিন্তু পারেনি যোগাযোগ করতে।একবার দেখতেও আসেনি তাকে।শ্বশুরবাড়ির একজন পড়শী তার দ্বিতীয় বিয়ের সংবাদ দিয়েছিলো নুজহাতকে।সেদিন নুজহাতের মন পুরোপুরি ভেঙ্গে গিয়েছিলো।কেমন যেন বোবা হয়ে গিয়েছিলো কিছুদিনের জন্য।তারপরও বছরখানেকের মাথায় বাবা মায়ের অনুরোধে ফিরে গিয়েছিলো শ্বশুরবাড়ি।সতীন শ্বাশুড়ির খোটা দেওয়া একেকটা কথা অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে তুলতো প্রতিনিয়ত।জাবিরও কেমন নিষ্ক্রিয় একটা রোবট ছিলো মাত্র।”মেনে নাও, মানিয়ে নাও।নতুবা বাবার বাড়ি চলে যাও।আমি আলাদা থাকার ব্যবস্থা করে দেবো শীঘ্রই।” এই কয়েকটা কথা প্রতিদিন অন্তত দশবার শুনতে পেতো।কিন্তু এক বছরেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।পরে বাবাই তাকে নিয়ে আসে।আর যেতে দেয়নি।জাবিরের কোনো অনুরোধ উনাকে টলাতে পারেনি।অবশ্য নুজহাতেরও আর ইচ্ছে করেনি জাবিরকে সুযোগ দিতে। প্রথম নারী থাকাকালীন যে পুরুষের জীবনে দ্বিতীয় নারী আসে, সে খুব শীঘ্রই তৃতীয়ার সন্ধান করে। এরচেয়ে একা থাকা কিংবা সিঙ্গেল ফাদারকে বিয়ে করা ভালো।অন্তত অন্যের সন্তানকে পালন করা সতীন সহ্য করার চেয়ে অনেক ভালো ।সেই হিসেবে বিধাতা নুজহাত মুন্নিকে রাজকপাল দিয়েছে।

,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
রাহিলার আসল হত্যাকারী কে? আসলে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই, হাজার বছর পরেও এর কোনো উত্তর থাকবেনা।কারণ ঘটনাটা বাংলাদেশে ঘটেছে।এ দেশের মানুষ সত্য উদঘাটনে আগ্রহী নয়, বরং গল্প বানিয়ে বলতে ও লিখতে বেশি আগ্রহী।গ্রামের প্রতিটা মানুষের মুখে মুখে এই গল্পটা রটে গেছে, “পরিবারের সকল সদস্য মিলে পুত্রবধুকে হত্যা” নামক এক জঘন্য কাহিনী।অথচ ঐ পরিবারের একটা সদস্যও জানেনা কে আসল হত্যাকারী।সেদিন কার বাড়িতে ঐ নারী বেড়াতে গিয়েছিলো সেটাও সবার অজানা।বারোটা বছর ধরে সব জায়গা জমি বিক্রি করে করে কেস চালিয়েছে সবাই।শেষ পর্যন্ত ভিটে মাটিটা অবশিষ্ট ছিল।ৃ বাকি সব চলে গেছে আইনের লোকের উদরে। আগামী তারিখ আগামী তারিখ করতে করতে বারো বছর কাটলো, সাথে খরচ হলো কোটি টাকা।কিন্তু আসল দোষীকে বের করার কোনো চেষ্টাই করেনি কেউ।শুধু আদালতের বারান্দায় বসে বসে নোট গুনেছে ওরা, আর পরবর্তী তারিখে আরো টাকার হিসেব দিয়েছে।জানিনা কবে পরিবর্তন হবে আমার স্বাধীন বাংলার জনগনের স্বাধীনচেতা মনোভাব।কবে নিজের পেশাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করবে।আর নিজের ন্যায্য অধিকারটুকু পেতে নিঃসংকোচে মিছিল করতে পারবে সাধারন জনগোষ্ঠী।নির্দোষরা জেলে যাওয়ার ভয়ে বনে-জঙ্গলে না ঘুরে আসল অত্যাচারীর শাস্তি চেয়ে রুখে দাড়াবে সগর্বে।আর প্রত্যেকটা পেশাজীবী নিজ পেশার মর্যাদা রাখতে মরিয়া হয়ে উঠবে।তখন আর কাউকে জীবন যুদ্ধে একা এগিয়ে যেতে হবেনা।বরং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে পাশে থাকবে প্রতিটা মানুষ, সাহস জোগাবে এগিয়ে যাবার।

Facebook Comments Box
প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments