আবু সাঈদ দেওয়ান সৌরভ
দশ বছরের সংসার জীবনে দুইটা সন্তান ও দৈহিক উষ্ণতা ছাড়া কিছুই
দেয়নি লাবনির হাসবেন্ড। কখনো লাবনিকে নিয়ে ঘুরতে নিয়ে যায়নি
কিংবা সমুদ্র সৈকতে ভেজা কাপড়ে জড়িয়ে ধরা হয়নি, পার্কে বা
কোন কফি হাউজে হাতে হাত রেখে বলা হয়নি “ ভালবাসি তোমাকে”।
এমনকি হানিমুনে গিয়ে সময় কাটানোর সময়ও হয়ে ওঠেনি কখনো।
আজ লাবনির জন্মদিন উপলক্ষে তাকে নিয়ে লং ড্রাইভে বের হয়েছে।
গাড়ি চলছে হটাৎ গাড়ির সামনে একজন হুমড়ি খেয়ে পড়ল। জ্ঞান শ‚ন্য
লাবনির হাসবেন্ড গাড়ি থেকে নেমে অবাক। লোকটির মাথা থেঁতলে
গেছে চেনার কোন উপায় নেই। সে ম‚র্তির মত দাড়িয়ে রইল, কিছু
বুঝে ওঠার আগেই লাবনি দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে লাশের পাশে পড়ে
থাকা ম্যানি ব্যাগটা আর স্বজোরে স্বামীকে গাড়িতে তুলে নিয়ে বলল
গাড়ি ছাড়ো। বাড়িতে ফেরার পর কোন কথা হয়নি ৩ ঘন্টা। রাত ১০টার
সময় লাবনির হাসবেন্ড বলল ব্যাগটা কোথায় রাখছো, কোন কথা না বলে
হাতের ইশারায় ব্যাগটি দেখিয়ে দিল লাবনি। একি! লাবনি ব্যাগের মধ্যে
শুধুমাত্র একটা কাগজ। লাবনি বলল দেখো লোকটার পরিচয় পাওয়া যায়
কিনা। সে বলল মনে হচ্ছে লোকটার আত্মকথা।
লাবনির অনুরোধে তার হাসবেন্ড পড়া শুরু করল মানিব্যাগে থাকা
কাগজটা,
হটাৎ একদিন তোর সাথে চলন্ত কোন যানবাহনে কিংবা রাস্তায় দেখা
হবে, তুই হয়ত আমাকে চিনতে পারবি না। আমি বলব কিরে আমাকে
চিনতে পারলি না? আমি রাশেদ। এমন একটি দিনের জন্য অপেক্ষায় আছি
১০ বছর। জড়িয়ে ধরে ঠোটের উষ্ণতায় ছোয়ে দিতে কিংবা তোর
বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্য না। তোর দিকে তাকিয়ে থাকব
কিছুক্ষন অপলক দৃষ্টিতে, জীবনের শেষ কিছু কথা বলব তোকে। কিছু
প্রশ্ন ছিল তোর কাছে। কথা বলবি তো আমার সাথে, উত্তর দিবিতো?।
তুই করে বললাম বলে রাগ করিস না। আমাদের সর্ম্পকটা কিন্তু তুই
দিয়েই শুরু হয়েছিল। পরে তুই থেকে তুমিতে পৌছাতে সময়
লেগেছিল ৫ বছর। যেদিন তুই থেকে তুমিতে শুরু, সেদিন আমাকে
জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলি অনেকক্ষন। আমার কাঁধের পেছনটা তোর
চোখের পানিতে ভিজে গিয়েছিল। তোর ঠোঁটের ছোয়ায় তৃপ্ত
হয়েছিল মন-প্রাণ। ছ্যাঁকা খাওয়া অতীত হৃদয়ে রক্তক্ষরন বাড়িয়ে দেয়,
এমনিতে তোর শ‚ন্যতায় এখন আমি নিঃস্ব। আগে ছিলাম তোর
ভালবাসায় আসক্ত আর এখন মাদকাসক্ত।
মাদকাসক্ত বলে ঘৃণা করিস না। নেশাটা করি তোকে ভ‚লে যাওয়ার জন্য।
বিশ্বাস কর মাদকের আসক্তি একটুও ভুলাতে পারেনি বরং নেশার ঘোরে
তোকে নিয়ে ঘুরতে যাই, তোর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকি, তোর
হাত বুলানোর ছন্দে, মেঘকালো চুলের গন্ধে ঘুমায় শান্তিতে। মাদক
আমার দেহ ও হৃদয়ের কোন স্থান থেকেই তোকে ছোয়ার অনুভ‚তি এবং
তোর শরীরের গন্ধ দ‚র করতে পারেনি।
ইচ্ছে করেই নেশার অন্ধকার কালো জগৎ থেকে ফিরলাম না। কালো ভুলব কি
করে বল?। আমিতো তোর কালো গায়ের রং, চুল আর সর্বনাশা কালো
চোখেই মরেছি। তোর বাম গালের কালো তিলটা নেশার মধ্যে এখনো
আমাকে ঘুমাতে দেয় না। যদি সম্ভব হয়, আমার শেষ ইচ্ছেটা প‚রণ
করিস। আমি মারা গেলে, তুই এসে কালো কাপড় দিয়েই আমার দাফনের
ব্যবস্থা করিস। জানি তুই আসবি না।
আজ আমি বড় অসহায়। কান্না করার জন্যও আমার কেউ নেই। তুই ছেড়ে
চলে যাওয়ায় ভীষণ উপকার হয়েছে আমার। চোখের পানি বিদায় নিয়েছে
জীবন থেকে। শুধুমাত্র যেদিন তোর বিয়ে হয়েছিলো সেদিন সারারাত
কেঁদেছিলাম। তুই বিশ্বাস করতে পারবি না, আমার বাবা-মায়ের মৃত্যুর
সময়ও আমার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানিও পড়েনি। চোখ নষ্ট হলেই
বা কি?, চোখ বুঝলেই দেখতে পাই তোকে। মাদকের ঝাঁজে হৃদয় থেকে
তোর ছবিটা মুছে গেলে, মরেও শান্তি পেতাম।
একি। লাবনি বাকি লেখা গুলো কোথায়?। লেখাটা আমায় নেশা ধরিয়ে
দিয়েছে, তোমার দিকে তাকানোর কথা ভুলেই গেছি। একি। তুমি
কাঁদছো কেন? জিজ্ঞেস করলো লাবনির হাসবেন্ড।
লাবনি কি করে বলবে! রাশেদ তারই ফেলে আসা জঞ্জাল। বাকিটা জানতে না
পাড়লে আমি শান্তি পাব না। আমি লাশের খবর নিতে গেলাম, বলে বাড়ি
থেকে বের হয়ে গেল লাবনির হাসবেন্ড।


