back to top
Friday, May 1, 2026
Homeসাহিত্যগল্পনীল পাহাড়ের শেষ গল্প

নীল পাহাড়ের শেষ গল্প

 খায়রুজ্জামান চৌধুরী

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণের এক অজ্ঞাত এলাকা, যেখানে এখনো গুগল ম্যাপ ঢুকতে পারেনি, সেখানে আছে এক ‘অস্তিত্ব-অনুমানযোগ্য’ অঞ্চল—নাম ‘সাদাকালোপুর’। সেই অঞ্চলের পাশেই নাকি আছে এক ‘নীল পাহাড়’। পাহাড়টি এতটাই রহস্যময় যে তার অস্তিত্ব কেউ চোখে দেখেনি, কিন্তু সেখানে গেলে সবাই ফিরেও আসে এক গল্প নিয়ে। এবং, মজার ব্যাপার—প্রত্যেকের গল্প একেক রকম। একবার এক বর্ষার দিনে, যখন কুমার নদীতে হঠাৎ রক্তমাখা ধোঁয়া ভেসে উঠছিল, এক বৃদ্ধ বলেছিল, “ওসব কিচ্ছু না, পাহাড় নিঃশ্বাস ফেলছে। বৃষ্টি হলেই ওর বুক ভার হয়।” সেই থেকে নীল পাহাড় আর বর্ষা যেন জড়িয়ে গেছে এক অলিখিত চুক্তিতে।

বিখ্যাত কাল্পনিক গবেষক ড. তন্ময় হালদার যখন প্রথম ‘নীল পাহাড়’ নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন, তখন তার বয়স ৩৭। তিনি ইতিমধ্যে “ভুতুড়ে ভূগোল” নামক থিসিস লিখে গিনেস রেকর্ডে উঠেছেন। তবে এই পাহাড় তাঁকে অস্থির করে তুলল। কারণ, তিনি যে লোকটার কাছ থেকে পাহাড়ের প্রথম গল্প শুনলেন, সে বলল—সে নাকি বৃষ্টির রাতে তার মৃত প্রেমিকাকে পাহাড়ের মাথায় দেখেছে, সেই যে মরে যাওয়ার বছরখানেক আগে, এক রেলস্টেশনে তাকে ফেলে চলে গিয়েছিল। এই অসংলগ্ন স্মৃতি ও মৌসুমি আবহাওয়ার যোগসূত্র তন্ময়কে পাগলের মতো টানতে লাগল।

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

ড. তন্ময় তাঁর তিন ছাত্রছাত্রী—রশিদ, রিনি ও সনৎ—কে নিয়ে রওনা দিলেন নীল পাহাড় অনুসন্ধানে। সঙ্গে নিলেন তিনটা জিনিস: একটি মাইক্রো লেন্স-সক্ষম রেডিও কম্পাস, একটি নাসার পরিত্যক্ত সময়বিকৃতি পরিমাপক যন্ত্র, এবং একটি মোরগ (যার নাম ‘জর্জ ক্লাকসন’)। মোরগটা সবসময় বাঁশির মত ডাকত, আর আশ্চর্যজনকভাবে বৃষ্টি নামলেই সে থেমে যেত।

যাত্রার তৃতীয় দিনে, যখন তাদের গাড়ি কাদা আর পানিতে একসাথে আটকে, ঠিক তখনই প্রথমবার পাহাড় দেখা গেল। না, পাহাড় নয়, যেন আকাশ থেকে এক নীল ঘূর্ণিপাক নেমে এসেছে মাটির বুকে, অথচ তার কোনো আকার নেই। রিনি ঘড়ি দেখে থমকে যায়। রাত ১টা। আর সে সময় থেকেই ঘড়ির কাঁটা আর একচুলও নড়ে না। একদিন, দুইদিন, তিনদিন—ঘুম হচ্ছে, ক্ষুধা লাগছে, কথা হচ্ছে, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে। সময় যেন এক অদৃশ্য ফাঁদের মতো তাদের জড়িয়ে ধরেছে।

এই রহস্যে ভয় জমে ওঠার আগেই আবহাওয়া হঠাৎ বদলে যায়। নীল পাহাড়ের গা ঘেঁষে এক ধোঁয়াশাময় প্রবেশপথ খুলে যায়। যেন বৃষ্টি সেখানে চিরকাল জমে থেকে পাহাড়ের গায়ে হিমালয়ের মত এক দরজা তৈরি করেছে। তাদের সামনে তখন এক ধাতব গেট, যার গায়ে কোন লেখা নেই, শুধু নিচে কাদা জমাট মাটি খুঁড়ে দেখা যায়—একটি পুরনো নাম ‘অন্তর্গতপুর’। সেই শহরে প্রবেশ করার মুহূর্তে চারপাশের শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। বৃষ্টির আওয়াজ, পাখির ডাক, এমনকি নিজের দম নেওয়ার শব্দও যেন টের পাওয়া যায় না।

‘অন্তর্গতপুর’ শহরে ঢুকে তারা দেখতে পায়, তারা যেন এক বিকৃত আয়নার ভেতরে আছে। রশিদ নিজের ছোটবেলার মুখোমুখি হয়—একজন কাঁদছে, একজন হাসছে, আরেকজন তাকিয়ে আছে ভয়মিশ্রিত দৃষ্টিতে। রিনি দেখে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন যার চোখ তার প্রাক্তন প্রেমিকের, কিন্তু মুখ এক অচেনা ভবিষ্যতের। সে বলে—“তুমি যদি আমাকে ভুলে যাও, আমি অন্য কারো স্মৃতিতে আশ্রয় নেবো।”

সনৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। কেউ টেরই পায় না সে কবে, কোথা থেকে হারাল। কিন্তু ওই রাতেই মেঘের গর্জনের মত এক শব্দে পাহাড় কেঁপে ওঠে, আর ঠিক তখনই রিনির সামনে তার কলেজজীবনের প্রেমিক হাজির হয়, যাকে সে শেষবার বর্ষার দিনেই বিদায় বলেছিল। রায়হান নয়, তার নাম এখন ‘রায়-২’। বলল, “আমি সেই ভালোবাসা, যেটা তুমি চাপা দিয়েছিলে, আমি হারিয়ে যাইনি—এই শহরে আশ্রয় নিয়েছি।”

এই শহর আসলে ছিল এক বিশাল মনোজাগতিক ল্যাবিরিন্থ। পাহাড় এখানে শুধুই এক রূপক, বৃষ্টি ছিল ‘উদ্বেল স্মৃতি’র প্রতীক। এই শহরের হৃদয়ে, যাকে সবাই ‘নীল কেন্দ্র’ বলত, সেখানে ছিল একটি লাইব্রেরি। বইগুলো লেখা হয়নি, লেখা হচ্ছিল তাদের প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে। লাইব্রেরির কেন্দ্রে ছিল এক অতিকায় যন্ত্রমানব, নাম ‘আলতো-ভয়’। তার চোখে যেন ছিল এক চিরন্তন ভেজা আবহ, যে চেয়ে থাকে, কিন্তু কিছুই বলে না।

আলতো-ভয় ছিল পাহাড়ের কণ্ঠস্বর। সে বলল না, শুধু মাথা নাড়ল। সেই মাথা নাড়ার সাথে সাথে শহরের আকাশে শুরু হলো অবিরাম এক নীল বৃষ্টি। বৃষ্টি নয়, যেন হালকা তরল স্মৃতি। সেই স্মৃতি তাদের গায়ে পড়তেই তারা একে একে দেখে ফেলল নিজেদের ভুলে যাওয়া দৃশ্য, হারানো ইচ্ছা, অবদমিত ভালোবাসা।

তারা ফিরে এল। কিন্তু কিছু আর আগের মত রইল না। রিনি আর রায়-২ একা হল না, আবার একসাথে হলও না। রশিদ একদিন বলল—“আমার ভয় করে, আমি হয়তো এখনও সেই শহরে আছি।” ড. তন্ময় কেবল হাসলেন, তারপর নিজের চুল রঙ করলেন নীল, কারণ তিনি জানতেন—“পাহাড় তার চিহ্ন ফেলে যায়।”

নীল পাহাড় তাদের ছেড়ে গেল না। বৃষ্টি এলেই তারা কাঁপে, পাহাড় যেন বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে। আর প্রতি বর্ষায়, সেই গর্জনের মুহূর্তে, দূরে কোথাও বাজে মোরগের ডাক।

[গল্পের শেষ নেই, কারণ যারা শেষ দেখে, তারা ফিরে আসে না। যারা ফিরে আসে, তারা গল্প লেখে। এই গল্প তাই শেষ নয়, বর্ষার প্রথম জলে শুরু।]

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments