back to top
Wednesday, January 21, 2026
Homeসাহিত্যগল্পপ্রাণহীন প্রাণের গল্প 

প্রাণহীন প্রাণের গল্প 

   সুখী ইসলাম 

                 

সৌন্দর্য যেটা সব থেকে আকর্ষণীয় করে রাখে। চাকচিক্য যেটা সবাইকে আকৃষ্ট করে। সবাই সুন্দরের পূজারী।সুন্দর চকচকে জিনিসকে সবাই  মূল্য দেয়। 

পৃথিবীর সব আকর্ষণীয় জিনিসগুলো নরম, যেমন ভালোবাসা নরম, স্নেহ মমতা নরম, নমনীয়তা নরম। পৃথিবীতে মনোহর বস্তু গুলোতে শক্তি প্রয়োগের আস্ফালন নেই। নমনীয় সুন্দর সর্বজনীন।সর্বজনীতার চেয়ে  অধিক আনন্দ এবং নিপুন সফলতা আর কিছু নেই। সবাই যখন শক্তের  দিকে গেছে আমি তখন নমনীয়তার মাঝে জীবনের সার্থকতা খুঁজেছি। সবাই কেন যেন শক্ত  হতে বলেছে। জীবনের টিকে থাকতে হলে শক্তির প্রয়োজন, শক্তের প্রয়োজন। আমার সাথে জন্ম নেয়া আমার বন্ধুরা সবাই করে বলেছে, শক্তের ছাঁচে যা। আমি গা এড়িয়ে এসেছি। আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছে। রাগকে সংবরণ করেছি। এক মুহূর্তের জন্য রাগকে স্থান দেইনি। কারণ রাগ আমার জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারে। ওরা বলেছে শক্তের মাঝে আস্থা লুকিয়ে থাকে। সৌন্দর্যের মধ্যে থাকে ভালোবাসা। আর জৌলুসতা হচ্ছে ভালোবাসা। আমি হেসেছি,রাগ সংবরণ করে নিজেকে বলেছি, রাগ অশান্তিকে প্রসারিত করে। যার ধৈর্য নাই তার  আত্মা নেই তার ভালোবাসা নেই। ভালোবাসার না থাকলে সেখানে যৌবন আসে না। আমার অস্থিমজ্জায় পারিবারিক ঐতিহ্য,  আদর্শ একাগ্রতা,  মনের নির্জনে স্নেহ, হৃদটান,  আতিথিয়তা আমাকে পরিবারের সবার থেকে  আলাদা করেছে। 

অভ্যাস পরিবেশ ও চেতনা প্রত্যেকের সহযাত প্রত্যয়। এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিধায়ক। প্রত্যেকের জীবনে এগুলার প্রভাব যেমন ব্যাপক তেমনই অপ্রতিরোধ্য। আমার প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে নিরীক্ষণ করার পর উত্তীর্ণ হয়েছি প্রকৃতির মহিমায় গ্রহণযোগ্যতার। 

সৌন্দর্য যৌবন আর যৌনতার কানায় কানায় পরিপূর্ণ আমি। চকচকে গরম আর নমনীয়তা সবার মাঝ থেকে আমি সবার থেকে আলাদা।

এই প্রথম চেনাজানা আবহ থেকে বেরিয়ে নতুন পরিবেশের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। চেনা জানা পরিবেশ থেকে  বেরিয়ে গন্তব্য ছিল দূর  অজানাতে। অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর এসে পৌছালাম অন্ধ কুঠিরে। সেদিন কেন জানি মনে হল আমার যৌনতা হয়তো ধুলোয় শেষ। হয়তো ক্ষয়ে যাব অন্ধ কুঠিরে। হয়তো রংহীন হয়ে বন্দী হয়ে যাব। চিন্তা চেতনা কেমন যেন বধির হয়ে যাচ্ছে। আমার মন হারিয়ে যাচ্ছে ধূলিকণায় তবুও আমি হাসি মুখে থাকি। আমার কাছে  মনে হয় একটি হাসিমাখা মুখ মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণ গোসল করার চেয়েও মনোরম। 

সেদিন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সবার মাঝে। চোখ স্থির ছিল বাইরের দিকে। দিন ঘনিয়ে সন্ধ্যে নেমে এলো তবুও আমি পড়ে রইলাম চাকচিক্য আর মনোহর বস্তুগুলোর সাথে। বেশ নিরাশ ছিলাম এত চাকচিক্য মনোহরের মাঝে আমার স্থান নিয়ে। ঘড়িতে তখন আটটা বন্ধের সময়। সবাই প্রস্তুত আবার অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে যাওয়ার। 

শোরুমের সামনেই রিকশা এসে দাঁড়িয়েছে। খুব ছিমছাম একজন ভদ্রমহিলা ম্যানেজারের সামনে এসে বলল একটা ভালো কেদারা হবে?  শব্দটা কানে আসতেই সচকিত হলাম।এবার হয়তো? আবার ভাবলাম এত রঙের মাঝে আমার কি আর জায়গা হবে?  

খুব নরম একটা হাত কাঁধে এসে পড়ল, কাঁধ থেকে আলতোভাবে হাতলে এসে থামলো। 

সেদিনই প্রথম কোন নরম হাতের ছোঁয়া পেয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল শুরু থেকেই আমি  নরমে প্রাধান্য দিয়েছি। এই নরমের মাঝে আমি জীবনের সার্থকতা খুঁজেছি। 

আমার এই কেদারাটা একটা পছন্দ হয়েছে। আমি এটাই নিব।

বহুদিন বহু প্রতীক্ষার পর একটা নাম পেলাম -কেদারা! কি যে আনন্দ লাগছে নিজের একটা নাম পেয়ে, একটা পরিচয় পেয়ে তা হয়তো শব্দ দিয়ে  বোঝাতে পারবো না।

বেরিয়ে এলাম খোলা আকাশে, মুক্ত বাতাসে, গা দুলিয়ে বসে রইলাম তিন চাকার গাড়িতে। এত স্নিগ্ধ বাতাস তবুও চালকের শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে। তবে যাই হোক আমার কাছে উপভোগ্য। 

আমার জায়গা হলো দু কামরার ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটের  বারান্দায়। গৃহকর্তীর অবসর সময়টা কাটে আমার উপর শরীরটা এলিয়ে দিয়ে। কখনো আবার চোখ বন্ধ করে শরীর এলিয়ে দিয়ে চলে যায় ভাবনায় অন্তহীন। 

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

গৃহকর্তী শখের বসে চারু শিল্পী। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রচন্ড মমতা পূর্ণ এই শিল্পীর চিত্রকর্ম। শিল্পীর দর্শন ও নন্দন চিন্তার কারণে নিজেকে খুঁজে পেলাম আরো নতুনভাবে। হুট করে শিল্পীর রৈখিক দক্ষতা আর বৈশিষ্ট্য আলোকে নিজেকে রূপান্তরিত করলাম শিল্পীতে। কখনো সাদা কাগজে মোটা কালো রেখার ব্যবহার করে আবার রঙিন পাতলা রেখায় ফুটিয়ে তোলে শিল্পীর দক্ষতার স্বাক্ষর। কখন যে  আবার শিল্পী ভেবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছি সাদা ক্যানভাসে। যার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জমিন সবুজের অবগাহন। নদীর ওপারে দূরের আকাশ শুভ্র মেঘের পরিপেক্ষিতের নিয়মে দিগন্তে মিলেছে। চলচ্চিত্রের লং শর্ট দৃশ্যের মতো একপ্রকার উদাস অভিব্যক্তি ও সবুজের  বলিষ্ঠ ওয়াশ ছবিতে চমৎকার ব্যঞ্চনা  তৈরি করে। আমি মিলিয়ে যেতে থাকি রেখা ফর্মে, রং ও টেকচারের উপস্থিতিতে নিঃসর্গ চিত্রে। 

রোদ বৃষ্টি যাই হোক আমার জায়গা কিন্তু বারান্দাতেই। রোদে পুড়তে থাকি, বৃষ্টিতে ভিজতে থাকি, আমি কেমন যেন নরম থেকে আরো নরম হতে থাকি। যৌনতা রোদে পুড়ে ফ্যাকাশে হতে থাকে। সৃষ্টি থেকেই আমি আত্মবিশ্বাসী। গৃহকর্তির ছেলেগুলো সেই দুরন্ত। কখনো লাফিয়ে ওঠে আর উপর আবার এক ঝটকাই লাফিয়ে পড়ে মেঝেতে। যদিও তাদের শারীরিক দুরন্তপনা আমার কাছে পাশবীক মনে হতো। তার চেয়ে পাশবীক মনে হতো মন্দ কথা। যখন কেউ বলতো কেদারার ওপর এভাবে লাফিও না ওটা ভেঙ্গে যাবে। সামওয়ার্ডস হার্ট মোর দ্যান সোর্ডস। এটি আমার অন্তরে সর্বক্ষণ বিরাজ করতো। হৃদয় ব্যথিত হতো শব্দের আঘাতে। 

জন্মগত দিক দিয়ে আমি ধার্মিক, প্রভূত্বে বিশ্বাসী। জলে ভিজে রোদে পুড়ে শরীর ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছে এ যেন বার্ধক্যের  আভাস।তবুও শক্ত হয়ে নিজের অবস্থানকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি। 

সেদিন রোদ উঠেছিল চরমে।সূর্যের আলো রাস্তায় পড়েছিল তেরছা হয়ে এলোমেলো ভাবে। বাহারি দোকান গুলো জ্বল জ্বল  করছে ঝলসানো সূর্যকিরণে।বারান্দার ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যলোক ঠিকরে এসে পড়েছে আমার উপর। রাগে আমার শরীর গরম হতে থাকে আর গরমে নরম। 

গৃহকর্তা এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দায়। বেশ কিছুক্ষণ রাস্তার ওপারে তাকিয়ে। গৃহকর্তী হেলান দিয়ে বসেছে চোখ বন্ধ করে শরীরটা এড়িয়ে দিয়ে বসেছে আমার ওপর। জন্মগত দিক দিয়ে আমি প্রভুত্বে বিশ্বাসী। গরমে নরম  হয়ে যাওয় শরীরের উপর গা এলিয়ে দিয়ে বসেছে গৃহকর্তী। প্রভূত্বে বিশ্বাসী চার পায়া তার সহন ক্ষমতা হারিয়ে অবস্থানের পরিবর্তন করছে। প্রভূত্ব আজ বড় অসহনীয়। সমস্ত শক্তি বল নিয়ে শক্ত হওয়ার অদম্য চেষ্টা। বারবার মনে পড়ছে সহজাত ভাইয়েরা বলেছিল শক্তের ছাঁচে যা।আমি হেসেছি, তারা বলেছে শক্তের ভক্ত নরমের যম। শব্দের অন্তকথা এখন টের পাচ্ছি। সৌন্দর্য্যকে প্রাধান্য দিয়ে নরমের ছাঁচে যেয়ে জীবন শুরু হওয়ার পূর্বে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছি। ভেবেছিলেম আমার ভেঙ্গে যাওয়া নিয়ে গৃহকর্তি মর্মাহিত হবে। কিন্তু হায়! তার পড়ে  যাওয়া নিয়ে তার পরিবারসহ প্রত্যেকের সেকি ব্যাঙ্গ হাসি, সেকি উল্লাস যেন যুদ্ধ জয় করে এসেছে।

আমি দুমড়ে  মুশরে পরলাম। নরমের ভক্ত প্রভুত্বে বিশ্বাসী ভাঙ্গা কেদারার জায়গা হলো চিলেকোঠায়।কদিন পরেই চলে যাব ভাঙাড়ির ময়লা মাখা বস্তায়। সৌন্দর্য যৌনতায় পরিপূর্ণ  ভাঙ্গা কেদারার জায়গা হবে রোদ জলে আর জঙ্গলে। প্রয়াতকালের একটা কথাই বলবো, জড় ভেবে তাহাদের করিও না ভুল, তুলনায় বড় তারা মহত্ত্বে অতুল।

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments