back to top
Friday, March 13, 2026
Homeসাহিত্যগল্পধোঁয়ামানব

ধোঁয়ামানব

রানা জামান

দাদি প্রস্তুত নাতিদের গল্প শোনাবার জন্য। আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছেন বিছানায়। হৈচৈ করতে করতে রায়হান ও রৌশনি ঢুকলো ভেতরে। বিছানায় উঠে দাদির দুইপাশে শুয়ে জড়িয়ে ধরলো দাদিকে। দাদি দুই নাতিকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন।

রায়হান বললো, আজ কী গল্প শোনাবে দাদি?

রৌশনি বললো, রাতে ভূতের গল্প শুনতে ভয় লাগে দাদি! পরীর গল্প শোনাও দাদি।
রায়হান বললো, হ দাদি। রূপকথার গল্প শোনাও আজ দাদি।

দাদি দুই নাতির মাথার চুল নেড়ে দিয়ে বললেন, ঠিক আছে নাতিরা! আমাকে একটু ভাবতে দে তোরা।

কতক্ষণ ভাববা দাদি?

পাঁচ মিনিট।

রৌশনি বললো, তাহলে এই পাঁচ মিনিট বেন টেন-এর ভিডিও দেখি!

ট্যাব দুই ভাই-বোনের সাথেই ছিলো। খুলে যার যার পছন্দের এনিমেটেড ভিডিও ক্লিপ দেখতে শুরু করলো। আর দাদি আছেন চোখ বুঝে: ভাবছেন। পাঁচ মিনিট পার হতেই দাদি চোখ খুললেন। শুরু করলেন দাদি গল্প বলা:

করোনাভাইরাসের কারণে স্কুল লম্বা ছুটিতে থাকায় লেখাপড়ার চাপ কমে যায় সবার। লেখাপড়ার চাপ কম থাকায় ইলেকট্রনিক ডিভাইসে আসক্তি বেড়ে যায় সকলের। রাফিও এর ব্যতিক্রম না। ও বেশিরভাগ সময় ট্যাবলেটে এনিমেটেড ভিডিও ক্লিপ দেখে। অনেক ভিডিও ক্লিপে হাসির উপকরণ থাকায় উচ্চস্বরে হাসেও। ওর হাসি শুনে পরিবারের সকলের আনন্দে বুকটা ভরে যায়।

এক রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলেও রাফি নিজ কক্ষে বেন টেন-এর ভিডিও দেখছিলো। রাফি মুভি উপভোগে এতো বিভোর ছিলো যে কাঁধে হাত পড়ায় পেছনে তাকিয়ে আরো চমকে উঠলো ও। বেন টেনের গ্রান্ড পা অর্থাৎ দাদা ওর কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দাদার হাসিমুখ দেখে রাফির মনের ভয় কেটে গেলো কিছুক্ষণ পরেই।

রাফি বললো, বেন কোথায় গ্রান্ডপা?

গ্রান্ডপা ঠোঁট উল্টে বললেন, করোনাভাইরাসের সাথে ফ্রেন্ডশিপে আছে!
মানে?
বেনের মতো করোনাভাইরাসেও কয়েকটা রূপ আছে। সেকারণে করোনাভাইরাস বেনের উপর ভর করে আছে!

ফরগেট এবাউট ইট গ্রান্ডপা! কোন্‌ এসাইনমেন্টে যেতে হবে বলো গ্রান্ডপা! আই এ্যাম রেডি!

স্মোকম্যান বড্ড ঝামেলা করছে রাফি! ওকে পানিতে ফেলতে হবে!
নো প্রবলেম গ্রান্ডপা! হোয়ার ইজ দ্যাট ধোঁয়ামানব গ্রান্ডপা?

ইনসাইড মি!

হোয়াট! কী বলছো গ্রান্ডপা?

হাঁ রাফি। ওর সাথে আমার মুখোমুখি হয়েছিলো। কাবু করে ফেলেছিলাম, তখন ও আমাকে প্যাঁচিয়ে ধরলো। ধ্বস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ধোঁয়ামানব আমার ভেতরে ঢুকতে চাইলে ওকে ঠেকাতে গিয়ে কিছু ঢুকে পড়েছে ভেতরে।

এখন কী হবে গ্রান্ডপা?

তুমি একট বোতল নিয়ে আসো। আমি ওকে বোতলে বন্দি করে ফেলবো।

রাফি ছুটে চলে গেলো রান্নাঘরে। একটা এক হাজার মিলিলিটারের প্লাস্টিকের পানির বোতল নিয়ে ফিরে এলো।

গ্রান্ডপা বোতলটা নিয়ে নাকে ঠেকিয়ে মনে মনে কী যেনো বলতে লাগলেন। আস্তে ধীরে গ্রান্ডপা’র শরীর মোচড় খেতে লাগলো। এরপর ওর ফর্সা মুখটা লাল হবার পরে নাসারন্ধ্র দুটো ফুলে গেলো সামান্য। এবং একটু একটু করে নাক থেকে ধোঁয়া ঢুকতে থাকলো ভেতরে। পুরো বের হয়ে এলে গ্রান্ডপা বোতলের মুখে ছিপি আটকে রাফিকে দেখিয়ে বললেন, এটাই এখন আমাদের ধোঁয়ামানবের কাছে নিয়ে যাবে।
রাফি বললো, ধোঁয়ামানব এখন কোথায় আছো জানো গ্রান্ডপা?

ইডিয়টটা নিডল নামের একটা পাহাড়ে লুকিয়ে আছে।

লুকিয়ে আছে কেনো?

ওর দেহের একটা অংশ আমার ভেতরে থাকায় ওর দেহে ক্ষত হয়ে গেছে। এই ক্ষতের কারণে সুস্থ নেই এখন। তোমার কোনো অঙ্গ হানি হলে তুমি কি সুস্থ থাকতে পারবে? ওরও ঐ রকম অবস্থা।

তাহলে আমাদের ওকে খোঁজার দরকার কী! ও এভাবেই মরে যাবে না একদিন গ্রান্ডপা?
সেটা হলে কোনো দুশ্চিন্তা থাকতো না। সমস্যা হলো ছয় মাস পর ওর ক্ষত আস্তে আস্তে পূরণ হতে থাকবে। তখন ও আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে! ভয়ঙ্কর!

ও খতম হবে কিভাবে গ্রান্ডপা?

ওর শরীর একটু একটু করে বোতলে বন্দি করে সমুদ্রে ফেলে দিলে সব একত্রিত হলেও বোতল থেকে বের হতে পারবে না। ধোঁয়ামানবকে এভাবে ছাড়া ধ্বংস করার অন্য কোনো উপায় নাই গ্রান্ড সান!

এক্সসেলেন্ট আইডিয়া গ্রান্ডপা! কিন্তু ঐ পাহাড়ে যাবো কিভাবে?

এই ধোঁয়া আমাদের নিয়ে যাবে!

কিভাবে গ্রান্ডপা?

দেখে যাও গ্রান্ডসান!

গ্রান্ডপা বোতলটাকে মোটা দড়ির নেটে ঢুকিয়ে নেটের মুখটা আটকে দিলেন খুব শক্ত গিট দিয়ে। একটা টেবিলের পায়া খুলে বোতলটা টেবিলের নিচে এমনভাবে বেঁধে নিলেন যাতে কোনো অবস্থায়ই খুলে বা ফসকে না যায়। বোতলের গলায় একটা দড়ি বেঁধে লাগামের মতো করে নিয়ে বললেন, তৈরি হয়ে গেলো আমাদের বাহন।
রাফি বিস্মিত হয়ে বললো, এই টেবিল!

এটা এখন আলাদিনের মাদুরের মতো টাট্টুঘোড়া হয়ে গেছে! উঠে পড়ো!
দু’জন টেবিলের উপর বসতেই টেবিলটা উঠে গেলো। লাগামের দড়ি ধরে সামান্য টান দিতেই চলতে শুরু করলো সামনে। ঘর থেকে বের হয়ে উঠতে থাকলো উপড়ে। লাগামে টান পড়তেই উপরে উঠা থামিয়ে চলতে থাকলো সামনে। মেঘ কেটে সাই সাই করে উড়ে যাচ্ছে সামনে।

রাফির খুব আনন্দ লাগছে। সে হাত বাড়িয়ে মেঘ ছুঁয়ে দেখছে। মেঘে ভেজা হাত এনে গাল স্পর্শ করছে। রাফি জিজ্ঞেস করলো, কতক্ষণ লাগবে গ্রান্ডপা?
গ্রান্ডপা বললেন, এই আর পাঁচ মিনিটে পৌঁছে যাবো।

পাঁচ মিনিটেই টেবিলের উপরের অংশটা নিডল পাহাড়ের উপরে এসে থামলো। বাস্তবিকই পাহাড়টা দেখতে সূচ-এর মতো তীক্ষ্ণ। কোনো গাছপালা নেই পাহাড়টা-একেবারে মসৃণ।

রাফি একবার নিচে তাকিয়ে বললো, পাহাড়টা দেখতে সূচের মতোই সূচালো। আমরা ল্যান্ড করবো কোথায় গ্রান্ডপা?

গ্রান্ডপা বললেন, আমরা নামবো পাদদেশে অর্থাৎ নিচে। ওখানে ভেতরে ঢুকার রাস্তা পেয়ে যাবো।

গ্রান্ডপা লাগাম ধরে মৃদু টান দিতেই টেবিলের পাটাতনটা নিচে নামতে শুরু করলো এবং নিচে এসে পাহাড়ের গা ঘেঁষে মাটিতে থামলো। দু’জন নামলো পাটাতন থেকে। গ্রান্ডপা ধোঁয়া ভর্তি বোতলটা খুলে শক্ত করে নিজ পিঠে বেঁধে নিলেন এবং পাটাতনটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। কাজ শেষে এটাতে চড়েই ফিরতে হবে ওদের।

ওরা পাহাড়ের ভেতরে ঢোকার রাস্তা খুঁজছে। সামান্য খুঁজাখুঁজি করেই পেয়ে গেলো একটা পথ। ভেতরে অন্ধকার। গ্রান্ডপা একটা টর্চলাইট জ্বেলে ঢুকলেন ভেতরে, পেছনে ওঁর গা ঘেঁষে রাফি। ভেতরে আরো অন্ধকার এবং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ওদের কাশি আরম্ভ হতেই পিছিয়ে এলেন গ্রান্ডপা।

ব্যাগের ভেতর থেকে দুটো কাপড় বের করে একটা রাফির হাতে দিয়ে গ্রান্ডপা বললেন, ইডিয়ডটা পুরো গুহায় ছড়িয়ে আছে! নাক-মুখ ভালো করে বেঁধে নাও যাতে ভেতরে ঢুকতে না পারে।

রাফি বুদ্ধি খাঁটিয়ে বললো, যদি কান দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে গ্রান্ডপা?
আলগোছে রাফির পিঠ চাপড়ে দিয়ে গ্রান্ডপা বললেন, ভালো কথা বলেছো!
গ্রান্ডপা ব্যাগ থেকে তুলা বের করে খানিকটা ছিড়ে রাফির হাতে দিয়ে বললেন, দুই টুকরো করে দুই কানে গুঁজে নাও।

গ্রান্ডপাও দুই কানে তুলো গুঁজে নিলেন। এবার সরাসরি ঢুকে গেলেন গুহার ভেতরে। গুহাটায় ধোঁয়ায় ভর্তি। নড়াচড়া করতে থাকায় মনে হচ্ছে ধোঁয়াটা জ্যান্ত। ধোঁয়া আরো গাঢ় হয়ে ওদের পেঁচিয়ে ধরলো।

গ্রান্ডপা বললেন, তুই অসম্পূর্ণ! তাই আমাদের পেঁচিয়ে ধরলেও কিচ্ছু করতে পারবি না!
তখন ধোঁয়ার ভেতর থেকে একটা আওয়াজ এলো, আমার অংশটা আমাকে দিয়ে দাও! নইলে তোমাদের ধোঁয়া খাইয়ে মেরে ফেলবো!

গ্রান্ডপা ফের বললেন, তুই দুষ্টু ধোঁয়া। তোকে বাইরে রাখা যাবে না। তোকে বোতলে বন্দি করার জন্যই আমরা এখানে এসেছি।

তখন একটা ফ্যাসফ্যাসে হাসি শোনা গেলো ধোঁয়ার ভেতর থেকে। হাসি থামিয়ে দুষ্টু ধোঁয়ামানব বললো, আমি ইয়া বড়। আমাকে পুচকে বোতলে বন্দি করবে কিভাবে তুমি বুড়ো দাদু?

দেখ কিভাবে বন্দি করি!

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

গ্রান্ডপা ব্যাগপ্যাকটা নামালেন রাফির পিঠ থেকে। ঐ ব্যাগপ্যাকে বেলুনের মতো ছোট ছোট বোতলে ভর্তি। গ্রান্ডপা একটা ছোট বোতল নিয়ে সামান্য ফুঁ দিতেই দুই লিটার সমান বড় বোতল হয়ে গেলো। রাফি একটা নিয়ে ফুঁ দিতে যাবে তখন গ্রান্ডপা বললেন, একত্রে সব বড় করা যাবে না। একটা একটা করে। একটা ভর্তি হলে আরেকটা ফুলাতে হবে।

গ্রান্ডপা পকেট ব্যাগ থেকে এক মুঠো ধূলোর মতো বস্তু বের করে বিড়বিড় করে কিছু একটা পড়ে ফুঁ দিয়ে ছুড়ে দেবার সাথে সাথে ধোঁয়ামানব আর্তচিৎকার করতে করতে মুচড়াতে লাগলো নিজকে। ধোঁয়ামানব ক্রমশঃ দূরে সরে যেতে লাগলো।
তখন গ্রান্ডপা বোতলের মুখ খুলে পানি ভরার মতো করে ধোঁয়া দিয়ে ভর্তি করে ফেললেন। এভাবে একের পর এক বোতল ভর্তি করতে থাকলেন এবং ধোঁয়ামানব যতো বোতলবন্দি হতে থাকলো ততো ওর আর্তচিৎকার বাড়তে থাকলো। শেষ বোতলটা ভর্তি করার পর ধোঁয়ামানবের আর চিৎকার শোনা গেলো না। বলা যায় গুহা ভর্তি হয়ে গেছে ধোঁয়ামানবের দেহের অংশে এবং গুহার অন্ধকারভাবও সরে গেছে পুরোপুরি।

এ পর্যন্ত বলে দাদি থামলেন।

রৌশনি বললো, দাদি থামলে কেনো? শেষ করো!

দাদি মুচকি হেসে বললেন, এর পরের গল্প খুব সোজা। রায়হান শেষ করুক, আমরা শুনবো!
রায়হান একটু নড়েচড়ে বললো, আমি কি পারবো দাদি?

অবশ্যই পারবে! http://www.teenagersbd.comশুরু করো।

রায়হান গল্পটা শেষ করলো এভাবে-

গ্রান্ডপা ও রাফি মিলে ধোঁয়ামানব ভর্তি বোতলগুলো নিয়ে এলো গুহার বাইরে। পাশেই স্প্রেড নামের একটি নদী প্রবাহিত হচ্ছিলো। ওরা একটা বাদে একটা একটা করে সব বোতল ফেলে দিলো ঐ নদীতে। যে ধোঁয়াভর্তি বোতলে করে ওরা নিডল পাহাড়ে এসেছিলো, ঐটা রেখে দিলো। কারণ ওটার সাহায্যেই ওরা ফিরে এসেছে নিজ দেশে।

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments