আবদুল্লাহ নুর আহম্মদ
মুয়াজের ঘড়িতে তখন ভোর ৫টা। ঈদের সকাল, কিন্তু তার মন কিছুতেই ঈদের মতো লাগছে না। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। ঈদের চাঁদ তো দেখা গিয়েছিল কাল সন্ধ্যায়, কিন্তু তার মনে কোনো আলো জ্বলে না।
একসময় ঈদ ছিল তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময়। এখনকার মতো ব্যস্ততা, দায়িত্ব, টাকার হিসাব-নিকাশ ছিল না। ছোটবেলায় ঈদ মানে ছিল নতুন জামা, সাদা পাঞ্জাবি, মায়ের হাতের সেমাই, আর বন্ধুদের সঙ্গে পুরো পাড়া দাপিয়ে বেড়ানো।
রায়হান চোখ বন্ধ করে একটু পেছনে ফিরে যায় মনে মনে—
চাঁদ দেখার আনন্দে সে আর তার ছোট ভাই রাসেল ছাদে ছুটে যেত। নিচের রাস্তায় যখন হঠাৎ কারো মুখে শোনা যেত, “চাঁদ উঠেছে!”, তখন চারদিক যেন এক সঙ্গে আলোকিত হয়ে উঠত। মা তখন ঘরে বসে সেমাই রান্না করতেন। বাবার মুখে থাকত প্রশান্তির এক হাসি, যেন সংসারের শত টানাপোড়েনেও ঈদের দিনটায় সবকিছু ঠিক হয়ে যেত।
ঈদের দিন সকালে বাবা-মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম, নতুন জামা পরে মসজিদে ঈদের নামাজ, তারপর একে একে বাড়ির সব আত্মীয়স্বজনের বাসায় যাওয়া—একটা দিন কেটে যেত ভালোবাসা, আনন্দ আর গল্পে।
কিন্তু এখন?
রায়হানের নিজের একটা সংসার আছে। অফিসের কাজ, সামাজিক দায়িত্ব, টানাপোড়েন সবকিছু মিলে ঈদ যেন আর সেই আগের মতো না।
সে ভেবেছিল, বয়সের সাথে আনন্দ হয়তো পরিণত হয়। কিন্তু এখন মনে হয়, ঈদটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে—শুধু স্মৃতির পাতায় টিকে আছে।
ঈদের দিনে এখনো সে সেমাই রান্না করে, নতুন জামা পরে। কিন্তু রাসেল এখন শহরে থাকে, মা-বাবা আর বেঁচে নেই, পাড়ার বন্ধুরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে যার যার জীবনে।
তার ছেলেও ঈদে খুশি হয়, কিন্তু মোবাইল গেমের মধ্যে। আগের মতো পাড়ায় দৌড়ানো, দল বেঁধে সালামি তোলা, আর সেই প্রাণখোলা আড্ডা—সব এখন গল্পের অংশ।
রায়হান গভীর শ্বাস নেয়। ছেলেকে ডেকে বলে,
— “চল, আজ আমরা মিলে ঈদের সকালে বের হই, আগের মতো কিছু বাড়িতে যাই। হয়তো কেউ এখনো অপেক্ষা করে আমাদের মতো কাউকে।”
ছেলে অবাক হয়, কিন্তু রাজি হয়।
সেই সকালে রায়হান হাঁটে পাড়ার পথ ধরে, ছেলে পাশে। বহুদিন পর পরিচিত কয়েকজনকে দেখে চোখ ভিজে আসে তার। কেউ কেউ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— “রায়হান ভাই, অনেক দিন পর! কেমন আছেন?”
আলাপে আলাপে সময় চলে যায়। চায়ের কাপ হাতে কিছু পুরোনো বন্ধু একত্র হয় এক কোণায়। গল্প জমে, হেসে ওঠে সবাই।
হয়তো পুরো ঈদের আনন্দ ফিরবে না,
তবুও রায়হান বুঝতে পারে—
ঈদের খুশি খুঁজে পাওয়া যায়,
যদি আমরা নিজেরাই একটু খুঁজি।
সেই বিকেলে বাড়ি ফিরে রায়হান ছেলেকে বলে,
— “দেখলি? ঈদ এখনো আসে, শুধু আমাদের দরজা খুলে দিতে হয়।”


