মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
রাত দশটা। রান্নাঘরের আলো তখনো জ্বলছে। চুলার ওপরে ফুটছে ভাতের হাঁড়ি। মেঝেতে বসে বসে কাঁথা সেলাই করছেন মেহজাবিন। তার কপাল ঘামে ভিজে, চোখে ক্লান্তির ছায়া—তবুও মুখে এক ধরনের প্রশান্তি। পাশের ঘর থেকে শোনা যাচ্ছে ছোট মেয়েটার হাসি, হয়তো টেলিভিশনে কার্টুন চলছে।
আলী এখনো অফিস থেকে ফেরেনি। মেহজাবিন জানেন, ফেরার সময় সে মুখ ভার করে আসবে—হয়তো অফিসে কেউ কিছু বলেছে, কিংবা আজ তেমন খেতে ইচ্ছে নেই। তবুও তিনি জানেন, গরম ভাত আর ডাল তার মন ভালো করে দেবে। এটাই তো তার ভালোবাসা দেখানোর ভাষা।
হঠাৎ করেই পেছন থেকে মেয়ে আয়েশা এসে জিজ্ঞেস করে,
— মা, তুমি সারাদিন কী করো?
মেহজাবিন মুচকি হেসে বলেন,
— আমি? আমি তো একটা স্কুল।
— স্কুল? তুমি কোথায় পড়াও?
— তোমার বাবাকে হাসতে শেখাই, তোমাকে ঠিকভাবে বড় করতে শেখাই, আর নিজের মনকে প্রতিদিন কষ্ট সহ্য করতে শেখাই।
আয়েশা বুঝে না। হয়তো বড় হয়ে একদিন বুঝবে।
মেহজাবিনের জীবনটা খুব সহজ ছিল না। বিয়ের পর স্বপ্ন দেখেছিলেন একটুখানি ভালোবাসার, একটু বোঝাপড়ার সংসার হবে। আলীকে দেখে মনে হয়েছিল, সে একজন যত্নবান মানুষ। কিন্তু বিয়ের পর ধীরে ধীরে মেহজাবিন বুঝলেন—ভালোবাসা শব্দটা শুধুই কবিতায় রঙিন। বাস্তবে সংসার মানে দায়িত্ব, বোঝা আর আত্মত্যাগ।
তবুও তিনি দমে যাননি। সংসার চালানোর জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। নিজের লেখা-পড়ার সুযোগ বিসর্জন দিয়ে শিখেছেন কীভাবে রান্না করতে হয়, কীভাবে ছেলেমেয়ের মন বোঝা যায়, কীভাবে এক টাকার মধ্যে দশ টাকার খরচ সামলাতে হয়।
স্বামী আলী ধীরে ধীরে চাকরি আর বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাড়ি ফিরে ফোনে ডুবে থাকেন, তুচ্ছ বিষয়ে রেগে যান। তবুও মেহজাবিন জানেন, তার দায়িত্ব কেবল অভিযোগ করা নয়—ঘরটা ঠিক রাখা।
একদিন সন্ধ্যায়, আলী হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,
— বলো তো, বিয়ের পর আমি কী হারিয়েছি আর কী পেয়েছি?
মেহজাবিন মুচকি হেসে বললেন,
— আপনি হারিয়েছেন একাকিত্ব, ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা, চিন্তা না করে কাজ করার সাহস।
— আর পেয়েছি?
— একজন সঙ্গী, সন্তানের মা, আর এমন একটি ঘর যা আপনাকে স্থিরতা দেয়।
আলী চুপ করে যান। হয়তো কথাগুলো তার বুকের ভেতরে কোথাও গিয়ে ধাক্কা দেয়।
— আর বলো তো, তুমি আমাকে বেশি ভালোবাসো না তোমার সন্তানদের?
মেহজাবিন এবার একটু থেমে বলেন,
— আমার সন্তানরা আমার রক্ত, আমার আত্মা। তাদের ব্যথা আমার নিজের শরীরে লাগে।
— আর আমি?
— আপনি আমার জীবনের সঙ্গী। আমার আনন্দের, আবার দুঃখের সাথী। আপনি আমার যাত্রার পথচলা। কিন্তু সন্তান… সন্তান আমার অস্তিত্ব।
আলী চুপ করে রইলেন।
পরদিন সকালে বাচ্চার স্কুলে যেতে দেরি হয়ে গেল। আয়েশার স্কুল ব্যাগ গুছিয়ে দিতে গিয়ে আলী রেগে উঠলেন,
— তুমি কী করো সারাদিন? একটা ব্যাগ গুছিয়ে দাও না ঠিকমতো!
মেহজাবিন কিছু বললেন না। শুধু আয়েশার মুখের দিকে চেয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেললেন।
দুপুরে যখন আয়েশা বাড়ি ফিরে জানায়,
— মা, স্কুলে আমি পড়ে গিয়েছিলাম। রিনা বলল, “তোমার মা কিছু শেখায় না কেন?”
মেহজাবিন মৃদু হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
এই ‘মা’ যে সারাদিন নিজেকে বিসর্জন দিয়ে শুধু শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছে, সেটা কেউ জানে না।
রাতে মেহজাবিন চুপচাপ বইয়ের তাক গোছাচ্ছিলেন। হঠাৎ আলী এসে পাশে বসলেন। কণ্ঠে একটু দ্বিধা,
— আজ তোমার উপর রাগ করেছি… জানি, ঠিক করিনি।
— রাগ না করলে তো বুঝবো না, সংসারে আমি আছি।
আলী প্রথমবার স্ত্রীর দিকে মন দিয়ে তাকালেন। সেই মুখ—যেটা দিনরাত কষ্ট সহ্য করে, নিজের মনের কথা না বলে শুধু অন্যদের খুশি রাখে। আজ সেই মুখে ক্লান্তি, কিন্তু তবুও শান্তির ছাপ।
আলী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— তুমি কি সুখী?
মেহজাবিন জানেন, এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
তিনি বলেন,
— সুখ আমাদের নিজেদের ভেতরেই। তুমি যদি আমাকে বোঝো, যদি আমার কষ্টগুলো ভাগ করে নিতে পারো, তবে আমি সুখী।
আলী এবার সত্যিই চুপ করে যান। প্রথমবার তিনি বুঝতে পারেন—এই নারী শুধু একজন স্ত্রী বা সন্তানের মা নন, তিনি এই পরিবারের ভিত্তি। এক নিঃশব্দ বিদ্যালয়, যেখানে প্রতিদিন শিক্ষা হয়—ত্যাগ, সহ্য, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের।
তিন মাস পর একদিন আয়েশা তার স্কুলে একটি রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়—বিষয় ছিল, “আমার প্রিয় শিক্ষক”।
সবাই লিখেছে স্কুলের টিচারদের নিয়ে। কিন্তু আয়েশা লিখেছে—
“আমার প্রিয় শিক্ষক আমার মা। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন ভালোবাসা কাকে বলে, কষ্ট কীভাবে লুকিয়ে রাখতে হয়, মানুষকে কীভাবে বোঝা যায়। আমার মা শুধু আমার না, বাবারও শিক্ষক। কারণ তিনি তাকে ধৈর্য শিখিয়েছেন। আমি বড় হয়ে মায়ের মতো মানুষ হতে চাই।”
রচনাটি স্কুলে প্রথম হয়। মেহজাবিন যখন মেয়ের লেখা পড়ে, তার চোখে পানি এসে যায়। এই প্রথম কেউ তাকে স্বীকৃতি দিল—তার মৌন যাত্রার, তার নিরব কষ্টের, তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসার।



