back to top
Wednesday, January 21, 2026
Homeসাহিত্যগল্পমোক্ষলাভ 

মোক্ষলাভ 

শেখ মিন্নাতুল মকসুদ অর্চি


মীরনের মনটা আজ খুব খারাপ। সে বারান্দার গ্রিল ধরে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে সূর্য অস্তের দিকে।যদিও ডিসেম্বর মাস চলছে কুয়াশায় আবছা ঢাকা সব কিছু তবুও আজ কুয়াশা ভেদ করে রোদ উঠেছিলো সেই রোদেই বিকাল থেকে বসেছিলো মীরন।তার মন আজ ঘন কুয়াশায় ঢাকা। অথচ তার মন থাকার কথা খুবই আনন্দিত। বাসায় উৎসবের আমেজ।তাদের বাসা থেকে সবাই কাশ্মীর বেড়ায় যাচ্ছে। তারা যাবে পেহেলগাম এর মনোমুগ্ধকর শীতকালীন দৃশ্য দেখতে।যাবে আরু ভ্যালি যেখানে শীতে বরফের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য।শীতকালে যখন তুষারপাত হয় তখন সেখানে স্কেটিং করার জন্য প্রচুর পর্যটকের সমাগম হয়ে থাকে।সেখানেই যাবে মীরনের ছোট ভাই মিসাত।তারই ইচ্ছে সে তুষারপাত দেখবে, করবে স্কিইং এবং স্নোবোডিং,স্লেজিং এর মতো বহিরঙ্গন কার্যকলাপ।মিসাত মীরনের থেকে বছর দুয়ের ছোট। এবার সে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাই তার পুরুষ্কার হিসেবে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার স্বপ্নের জায়গা কাশ্মীর।মীরনের বাবা-মার ও ইচ্ছে খুব কাশ্মীর দেখার। তাদের উৎসাহের সীমা নেই এখন।সারাদিন বাসায় এটা নিয়েই প্লেনিং চলছে,উৎসাহের চূড়ান্ত সীমায় মিসাত।মীরনের অবশ্য কোনো উৎসাহ হচ্ছে না বরং তার ভয় করছে ভীষণ ভয়। কেন জানি মীরনের এক অজানা সমস্যা আছে সে ঠান্ডাকে ভয় পায়।বেশি শীত পরলে তার কেমন যেন দম আটকা লাগে।ডিপফ্রিজ খুললে বা বরফ দেখলে এক ধরনের ট্রমা হয় তার খুব ভয় করে এবং প্রচন্ড দম আটকা লাগে। তার মনে হয় ডিপ ফ্রিজে তাকে কেউ জ্যান্ত ভরে রেখেছে,সে ঠান্ডায় শ্বাস নিতে পারছে না।তাই সে কখনোই ডিপ ফ্রিজ খুলে না।তাকে যে ডাক্তার দেখনো হয়নি তা নয় তবে রিপোর্টে তার এজমা,হাপানি কিছুই ধরা পরে নি।ডাক্তার বলেছেন সব নরমাল কোনো শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা তার নেই।তবে সাইকোলজিক্যাল কোনো সমস্যা হতে পারে। মীরনের পরিবার চাইলে তাকে কোনো সাইকোলজিস্ট দেখাতে পারেন।কিন্তু মীরনের পরিবার আর কোনো সাইকোলজিস্ট দেখাইনি মীরনকে।মীরনের মার মতে কাজে ফাঁকি দিতে মীরন এগুলো বলে যাতে তাকে ফ্রিজ পরিষ্কার বা এ ধরনের কাজ করতে না হয়।মীরনের বাবা মীরনকে বলেছেন,দেখো আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের, তোমাকে শখের সাইকোলজিস্ট দেখাবো এমন অর্থবিত্ত আমাদের নেই।তাছাড়া সাইকোলজিস্ট দেখনোর মানে বুঝো? তার মানে পাগলের ডাক্তার। তোমাকে সাইকোলজিস্ট দেখালে পাড়া- প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন ভাববে তুমি পাগল তখন তোমার বিয়ে দিতে খুবই সমস্যা হবে। মেয়ে হয়ে জন্মেছ যখন অনেক কিছু মুখ বোঝে সহ্য করতে হবে,এটাও সহ্য করো বা নিজে নিজে সমাধান করো।মীরনের বাবা-মা মীরনকে তেমন পছন্দ করেন না কারণ মীরন মেয়ে হয়ে জন্মেছে।তার বাবা-মার প্রধান প্রায়োরিটি তার ভাই মিসাত।মিসাতের জন্য তারা আকাশের চাঁদ আনতেও প্রস্তুত। মিসাত তাদের বংশের বাতি তাদের ভবিষ্যৎ আশ্রয়, ভরসা।তাই মিসাত কাশ্মীর যেতে চাইলেও তারা রাজি হলেন,নিজের জমানো টাকা খরচ করেই যাবেন তারা।একই বাসায় মীরন এবং মিসাত বড় হয়েছে কিন্তু একজন চরম অবহেলায় আর আরেকজন পরম যত্নে। মীরনের বয়স ২২ বছর। অনার্সে পড়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। মীরন যে ভালো রেজাল্ট করে নি তা কিন্তু নয়। কিন্তু মীরনের বাবার ধারণা মেয়ে পড়িয়ে কি হবে।সেই তো পরের বাড়ি গিয়ে ঝি এর কাজ করবে।মীরনের দিন গুলো যে কি বিচ্ছিরি যায়।মীরনের মনে হয় সে সারা জনমের অবহেলিত। মেয়ে হয়ে জন্মে সে ভুল করেছে বারবার। কেন জানি মীরনের মনে হয় তার আগের কোনো জন্মেও মীরন মেয়ে হয়ে জন্মে অবহেলিত হয়েছিলো এবং এবারও।মীরন তার ডাইরিতে লিখে,মেয়ে হয়ে জন্মে অবহেলিত আমি বারবার হাজার বছর ধরে। কেন লিখে সে জানে না।তার কল্পনায় কি যেন ভেসে উঠে আবছা,বরফে ঘেরা সে বুঝে না।তখন তার দমবন্ধ লাগে খুব কিন্তু কাউকে বলতে পারে না।কেউ তাকে বুঝে না।শুধু বুঝে একজন তার ছোটবেলার বন্ধু অভ্র।তাদের পাশের ফ্যাটেই থাকে।মীরন অভ্রকে ভালোবাসে।অভ্র বাসে কিনা মীরন জানে না।তাদের মধ্যে ভালোবাসার অনুভূতি বিনিময় হয়নি।তবুও যেন তাদের দুটো হৃদয় আত্মা এক।মীরন এই একটা মানুষের কাছেই নিজেকে ভেঙে চুরে প্রকাশ করতে পারে।মীরনের মনে হয় অভ্র তার জীবনে একটা বটগাছ যার ছায়ায় সে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে অনায়াসে। মীরন আনমনে অভ্রর কথাই ভাবছিলো তখন পিছনে অভ্র এসে দাঁড়ালো মীরন খেয়াল করেনি।অভ্র মীরনের কয়েকটা চুলে টান দিয়ে বললো, কি ভাবিস?
চমকে পিছনে তাকিয়ে মীরন দেখলো অভ্র এসেছে হাতে গোলাপি ওভারকোট।


: তোর জন্য নিয়ে এলাম।কাশ্মীর অনেক শীত না তাই।আমার জন্যও এনেছি।দেখতো তোর গায়ে ঠিকঠাক লাগে কিনা।
মীরন ওভারকোট টা নিলো কিন্তু পড়লো না।শংকিত স্বরে বললো, আমার ভীষণ ভয় করছে অভ্র।
: কিসের ভয়? ঠান্ডার জন্য?
: হ্যাঁ, ওখানে নাকি তুষারপাত ও হচ্ছে।
: আন্টিকে বলেছিস?
: হ্যাঁ, মা রাগ করেছেন।বলেছেন এসব হেয়ালি করো না।বাসার সবাই যাচ্ছে তোমাকে না নিয়ে গেলে সবাই বলবে না খরচ বাঁচাতে নিয়ে যাই নি।
: আচ্ছা কিছু হবে না ভয় পাস না।
: অভ্র আমার খুব ভয় হচ্ছে। তুষারের কথা ভাবলেই দম বন্ধ লাগে।আমি যদি ঠান্ডায় মারা যাই?
: ধুর বোকা। আমি আছি না।নিজের জমানো টাকা খরচ করে আমি ওখানে কি করতে যাচ্ছি তোকে পাহারা দিতেই তো।
: ইশ! আমি যখন জানি না তুই যাচ্ছিস তোর ফটোগ্রাফির জন্য।তুই তো বিখ্যাত ফটোগ্রাফার। ওখানে ছবি তুললে তোর আরও নাম হবে তাই যাচ্ছিস।অভ্র হাসলো আর কিছু বললো না মীরনকে।কিন্তু অভ্র জানে সে শুধু যাচ্ছে মীরনের জন্য।মীরনের সাথে কিছু সুন্দর মুহূর্ত কাটাতে।মীরনের খেয়াল রাখতে যেন কোনো অবহেলা ঐ বিদেশে মীরনকে ছুঁতে না পারে।নিদিষ্ট সময়ই মীরনের পরিবার এবং অভ্র পেহেলগাম পৌছালো। তারা উঠলো পেহেলগামের একটি রিসোর্টে। সবাই হৈহোল্লোড় করছে।মিসাতের আনন্দের সীমা নেই।আজ রাত এখানে থেকে কাল তারা যাবে আরুভ্যালি।মিসাতের আনন্দের সাথে যোগ দিয়েছেন তাদের বাবা-মা, সাথে পরিবারের অন্য সদস্যরা। মীরনের চাচা-চাচী,তাদের ছেলে – মেয়েরা।কিন্তু মীরন এদিকে শংকিত,ভীত সেদিকে কারও খেয়াল নেই।বা দেখেও তারা এড়িয়ে যাচ্ছে। মীরনকে সঙ্গ দিচ্ছে অভ্র।যতটুকু সম্ভব তাকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।কিন্তু বিপত্তি বাজলো খাবার সময়।যেহেতু মিসাতের জন্যই এই ট্যুর তাই খাবারের মেনু চয়েজ করলো মিসাত।সে অর্ডার দিলো কাশ্মীরের বিখ্যাত গরু বা ভেড়ার মাংসের পদ ওয়াজওয়ান,গোস্তরা এবং ভুট্টার স্যুপ। এগুলো কোনো কিছুই খেতে পারে না মীরন।গরুর মাংস এবং ভুট্টাতে ছোট থেকেই কেমন বিরক্তি মীরনের।দেখলেই বা গন্ধ শুকলেই বমি আসে তার।সে এগুলো খেতে পারে না। কেন যেন তার মনে হয় এই ভুট্টা ও গরুর মাংস জাতীয় খাবার তাকে দিনের পর দিন খাওয়ানো হয়েছে, এগুলোতে তার এক ধরনের অরুচি ধরে গেছে।মীরন মেনুর নাম শুনেই ভয়ে আঁতকে উঠলো।ভীত চোখে মার দিকে তাকালো এবং বললো, মা আমি এগুলো কিভাবে খাবো?
কিন্তু মীরনের মা বড্ড বিরক্ত হয়ে বললেন, সবকিছুতেই এমন নাটক করো কেন? তোমার ছোট ভাইটা খেতে চাচ্ছে খাক না একদিন।ওর ও তো মন বলতে কিছু আছে নাকি?
: কিন্তু মা আমার বমি আসে।
: তোমার জন্য এখন অন্য রাজকীয় খাবার অর্ডার দিতে পারবো না মা, দয়া করে খেয়ে নাও।
খাবার আসলে মীরনের বড্ড বমি পেলো।মাথা ঘুরাতে থাকলো, শ্বাসকষ্ট হতে থাকলো। অল্প খেয়ে আর পারছিলো না মীরন।মনে হচ্ছিল এখুনি বমি করে দিবে সে কিন্তু তাতে সবার খাওয়া নষ্ট হবে ভেবে চুপ করে বসেছিলো সে।আবার ভয়ও পাচ্ছিল যে না খেলে খাবার নষ্ট করার জন্য মায়ের কাছে বকা খেতে হবে। অসহায় মীরনের চোখের দুকূল বেয়ে কান্না ঝরছিলো।যা দেখেছিলো অভ্র।পরিস্থিতি সামাল দিতে অভ্র বললো, খাবারগুলো এতই মজা।মীরনের খাবারগুলো ও আমি খেয়ে নেই ওকে অন্যকিছু খাইয়ে দিবো নে।
বলে সে খাবার নিয়ে নিলো,মীরন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।অভ্রের টাকায় অন্যকিছু খাওয়াবে তাই মীরনের মাও কিছু বললেন না।মীরনের মা জানেন অভ্র ও মীরনের মাঝে কিছু সম্পর্ক আছে। এতে উনার আপত্তি নেই। মেয়ে বিদায় করতে পারলে তিনি বাঁচেন।অভ্রের পরিবার ভালো, যৌতুক ও দিতে হবে না। খালি হাতে খরচ বাঁচিয়ে মেয়ে বিয়ে দিতে পারলে এর চেয়ে ভালো আর কি চাই।খাওয়া শেষে অভ্র মীরনকে নিয়ে গেলো। মীরনের পছন্দের কিছু খাবার কিনে দিলো।সারাদিনের ক্ষুদার্থ মীরন হাপহুপ করে খেলো।কোনো দিকে তাকালো না পর্যন্ত। অভ্র তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে। তার যে কি মায়া লাগলো এই অভাগী মেয়েটার জন্য। তার মনে হলো তার হৃদয় চিরে গেলো, দুচোখ উপচে কান্না এলো। মীরনের জন্য একটা হাহাকার উথাল-পাথাল করে উঠলো। অভ্রর ইচ্ছে করলো সারাদিনের অভুক্ত মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরতে।কিন্তু সে করলো না নিজেকে সংজত করে সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো এখান থেকে ফিরে গিয়েই মীরনকে বিয়ে করবে সে।মুক্তি দিবে এই অবহেলিত জীবন থেকে মীরনকে।সম্পূর্ণ খাবার শেষ করে মীরন লজ্জিত স্বরে অভ্রকে বললো, বড্ড ক্ষিধে পেয়েছিলো রে।না খেলে মরেই যেতাম।
: আমি বুঝি তোকে মরে যেতে দিতাম?
: দিতি না?
: না,কখনোই না।
: কেন?
: তুই মরে গেলে আমি বাঁচবো কি করে? নিজেকে বাঁচানোর জন্যই তোকে বাঁচাতাম।
: কেন?
: কারণ তুই আমার হৃদপিণ্ড। হৃদপিণ্ড ছাড়া মানুষ বাঁচে?
মীরন হটাৎ অবাক চোখে অভ্রর দিকে তাকালো। কি বললো অভ্র তাকে।রিসোর্টের এই জায়গায় হালকা আলো সে আলোতে অভ্রর হাসিমাখা মুখটাকে কি সুন্দর লাগছিলো মীরনের চোখে। মীরনের খুব ইচ্ছে করলো, অভ্রর গাল ছুঁয়ে দিতে কিন্তু সে দিলো না। কিছুক্ষণ বসে থেকে হটাৎ দাঁড়িয়ে অভ্রর হাত ধরে বললো, আমার হাতটা ধরে কিছুক্ষণ হাটবি?
তারা দুজন হাত ধরে হাটছিলো চুপচাপ। কিন্তু অব্যক্ত অনেক কথাই বলা হচ্ছিল দুজনের। সময় এভাবেই কেটে যেতে পারতো।কিন্তু হটাৎ অঘটন ঘটলো। তারা হাটতে হাটতে চলে এলো রিসোর্টের একটা জায়গায় যেখানে কিছু লোক এলকোহল পান করছিলেন। না,উনারা কোনো অসভ্যতামী করেন নি,ভদ্র সমাজের লোক।চুপচাপ বসে আয়েস করছিলেন।কিন্তু হটাৎ মীরনের কি হলো এলকোহলের গন্ধে তার মাথা ঘুরে গেলো, দমবন্ধ লাগলো। গা গুলিয়ে বমি আসলো তার।অভ্র হটাৎ পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। লোক গুলো ও উঠে আসলো, মীরনকে নিয়ে বসালো চেয়ারে।মীরন মরার মতো বললো, আর দিও না এগুলো আমাকে। খুব গন্ধ করে। তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলো মীরন।অভ্র চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে কিছুটা সুস্থ করে মীরনের রুমে নিয়ে গেলো। মীরন বিছানায় শুয়ে অজ্ঞানের মতো পড়ে রইলো। বিষয় টা অদ্ভুত লাগলো অভ্রর। হটাৎ কি হয় মীরনের। ছোট থেকেই দেখে আসছে সে হটাৎ মীরনের যেন কেমন প্যানিক এটাক হয়।মীরন এমন করে কেন?তার কি কিছু মনে পড়ে? কিন্তু কি! ছোট থেকেই তো অভ্র মীরনের সাথেই আছে কিছু হলে তো অভ্র জানতো কিন্তু তেমন কিছু তো হয়নি।মীরন ও বলতে পারে না কিছু।পরের দিন সকালে আরু ভ্যালিতে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি রিজার্ভ করে আনা হলো। সবাই হৈচৈ করে উঠলো ট্যাক্সিতে। কিন্তু মীরন উঠলো ধীর পায়ে, খুব ভয়ে অজানা আশংকায়। যেন ওখানে ঐ তুষার দেখে সে মারা যাবে। তুষারের নিচে আটকা পড়ে যাবে।কিন্তু কাউকে কিছু বললো না সে, অভ্রকেও না।কাল রাতের ঘটনায় সে খানিকটা লজ্জিত। আর বিড়ম্বনায় ফেলতে চায় না সে অভ্রকে।ট্যাক্সিতে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলো সে।বাহিরেও তাকালো না একবার।আরু ভ্যালি যাওয়ার রাস্তা অসম্ভব সুন্দর ও মোহনীয়। এক পাশে গভীর গিরিখাত, আরেক পাশে পাহাড় কাটা রাস্তা আর সর্বত্র সঙ্গী লিডার নদী। ভয়ংকর সৌন্দর্য বলে যদি কিছু থাকে তবে তা হলো আরু ভ্যালি যাওয়ার পথ।সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো। মুগ্ধ হলো অভ্রও।সেও যেন প্রকৃতিতে হারিয়ে গেলো। মীরনকে রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সৌন্দর্য গুলো তার ক্যামেরা বন্দি করতে।কিন্তু মীরনের প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল। প্রচন্ড দম বন্ধ লাগছিলো তার।কাউকে কিছু বলে নি সে সবার আনন্দ দেখে সে চুপ করে সহ্য করছিলো সব।আরু উপত্যকার হিমালয়ের তুষারবৃত চূড়ায় যখন তারা পৌছালো তারা যেন সৌন্দর্য দেখে প্রায় পাগল হয়ে গেলো। দৌড়ে গেলো তুষারের মাঝে। সবাই হাত দিয়ে ধরলো তুষার। একজন অন্যজনের দিকে গোলা বানিয়ে ছুড়ে দিলো।কি অসাধারণ মুহূর্ত! অভ্রও এক মূহুর্তের জন্য ভুলে গেলো মীরনের কথা।মীরনের হাত ছেড়ে সে চারদিকের সৌন্দর্য দেখতে লাগলো, করতে লাগলো ক্যামেরা বন্দি। মীরন তুষার দেখে আতঙ্কে মৃতপ্রায়। তুষারের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে আর শ্বাস নিতে পারলো না, প্রচন্ড দম বন্ধ ও মাথা ঘুরানো নিয়ে সে হটাৎ পড়ে গেলো তুষারের মধ্যে। খেয়াল করলো না কেউ এমনকি অভ্রও।কতক্ষন চলে যাবার পর অভ্র বললো, দেখলি মীরন কি সুন্দর! তুই এমনিতেই ভয় পাচ্ছিলি।কই কিছু হলো তোর! মীরন জবাব দিলো না হটাৎ পিছনে ফিরে অভ্র দেখলো মীরন পিছনে নেই।নেই আসেপাশে পরিবারের সাথেও।হন্ন হয়ে অভ্রর দুচোখ যখন খুঁজছিলো মীরনকে তখন হটাৎ অভ্র দেখলো তুষারের উপর উপুর হয়ে পড়ে আছে মীরন।অভ্র দৌড়ে গিয়ে দেখলো মীরনের মুখটা ঠান্ডায় বরফ হয়ে গেছে।কতক্ষন ধরে পড়ে আছে মীরন এভাবে! যেভাবে পড়েছে মনে হয় শ্বাস ও নিতে পারেনি মীরন।অভ্র চিৎকার করে সবাইকে ডাকলো।মিসাত তখন স্নোবোডিং এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো অভ্র ডাকাতে খুব বিরক্ত হলো সে।যেতে দিতে চাইলো না তার বাবা-মাকে।তবুও অভ্রর এমন আকুল ডাকে না গিয়ে পারলেন না তারা।সবাই ছুটে গেলেন দেখলেন মীরনের অবশ শরীর। পেহেলগাম এ ভালো কোনো হাসপাতাল নেই মীরনকে নিয়ে যাওয়া হলো স্থানীয় একটা ডিসপেনসারিতে। সেখানে জ্ঞান ফিরলো না মীরনের।তারপর সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হলো অনন্তনাগে থাকা সবচেয়ে কাছের হাসপাতালে। ওই ডিসপেনসারি থেকে অনন্তনাগের ওই হাসপাতালে পৌঁছাতে গাড়িতেই অন্তত এক ঘন্টা সময় লাগে।এই এক ঘন্টা অভ্রর কিভাবে গেলো তা কেমন আল্লাহ ই জানেন।কি প্রচন্ড অস্থিরতা মনে সাথে অনুশোচনা। সে কেন মীরনের হাতটা ধরে রাখে নি।আসলেই সে মীরনকে প্রাধান্য না দিয়ে ছবি তুলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো।সকাল থেকেই মীরন চুপচাপ ছিলো। তবে কি সকাল থেকে ই মীরনের শরীর খারাপ করছিলো? কেন তাকে জিজ্ঞেস করে নি অভ্র,কেন মীরনের খেয়াল রাখেনি।এক অজানা অনুশোচনা ঘ্রাস করছিলো অভ্রকে।অভ্র মীরনের শরীরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। যেন কিছুটা ওম পায় মীরন। কিন্তু কিছুই বুঝা যাচ্ছে না এমন কি মীরনের হৃদস্পন্দন ও পাচ্ছে না অভ্র।মিসাতের বড্ড রাগ হচ্ছে। এখানে এসেও মীরন নাটক করছে।কোথায় সে মজা করবে না তাকে নিয়ে হাসপাতালে যাও। মিসাতের বাবা-মা ও যেন ভাবলেশহীন। কেমন বোকা বনে গেছেন।কি করবেন বুঝতে পারছেন না।অনন্তনাগ ও লাভ হলো না নিয়ে।রোগীর অবস্থা শোচনীয় জানিয়ে তারা পাঠিয়ে দিলেন কাশ্মীর।অভ্র,মীরনের বাবা, চাচা ও চাচাতো ভাই সাথে গেলো। মীরনকে ভর্তি করানো হলো শ্রী নগরের শেরি- কাশ্মীর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস ( SKIMS)।সেখানে জানা গেলো কোমাতে চলে গেছে মীরন।৪৮ ঘন্টা পেরিয়ে ও যখন জ্ঞান ফিরলো না মীরনের তখন মীরনের বাবা হটাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকায় ফিরে যাবেন তারা।সেখানের কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা করাবে মীরনের। এখানে বিদেশ পরে চিকিৎসা করানোর মতো এত টাকা তার নেই।মীরনের দেশে তেমন চিকিৎসা হবে না জেনেও তারা মীরনকে নিয়ে ঢাকা চলে এলেন এবং ভর্তি করলেন ঢাকার পিজি হাসপাতালে।কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি ই হলো না মীরনের। পিজি হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট,নিউরোসার্জন নিবিড় পরিচর্যায় (ICU) থেকেও মীরন যেন নিথর পাথরে পরিনত। টাকা যাচ্ছে পানির মতো। মীরনের বাবা-মা কতদিন কুলাতে পারবেন কে জানে।মীরনের পিছনে সব সঞ্চয় খরচ করলেই তো হলো না মিসাত ও তাদের ভবিষ্যৎ এর কথাও তো ভাবতে হবে। এমন সময় মীরনের সব দায়িত্ব নিলো অভ্র।প্রতিজ্ঞা করলো যে করেই হোক মীরনকে সে সুস্থ করবেই।সময়ের ডানায় ভর করে চলে গেলো পাঁচটি বছর। মীরন এখনো কোমায়। অবস্থার উন্নতি তো হলো ই না বরং দিন দিন মীরনের শরীর আরও খারাপ হচ্ছে। ডাক্তাররাও হাল ছেড়ে দিয়েছেন।বলেছেন এখন যদি কোনো মীরাক্যাল হয় তাহলে হয়তো..। হাল ছেড়ে দিয়েছেন মীরনের বাবা-মা ও। তারা যেন খানিক বিরক্ত ও।মীরনের বাবার চাকরির টাকার তিন ভাগের একভাগ চলে যায় মীরনের চিকিৎসার খরচে। এটা তাদের মোটেও ভালো লাগে না। আর দুইভাগের এক ভাগ দিয়ে মিসাতের পড়াশোনার খরচ আর এক ভাগ দিয়ে সংসার চালাতে বড্ড অসুবিধা হয় তাদের।মীরন যেন তাদের কাছে একটা বাড়তি বোঝা। তারা এখন মীরনের মৃত্যুর অপেক্ষায়।মীরনের মা বিরক্ত হয়ে প্রায় বলেই উঠেন,হতভাগী মরেও না আমাদের বাঁচাতে ও দেয় না। তার পিছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে আমরা এখন পথের ফকির। সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই।কিন্তু আসলে মীরনের বাবা যা টাকা দেয় তা দিয়ে মীরনের ওষুধ পত্র,হাসপাতালের বিল কিছুই মিটে না। মীরনের চিকিৎসা মূলত চলছে অভ্রর টাকা দিয়ে।এই পাঁচ বছরে অভ্র হাড়ভাঙা খাটুনি করেছে টাকা রোজকার এর জন্য।টাকা অবশ্য মোটা অঙ্কের পায় ও অভ্র।তার সবটাই যেন মীরনের জন্য। পাঁচ বছরে অভ্র এখন মস্ত বড়ো ফোটোগ্রাফার।দেশে বিদেশে সুনাম তার।তার ফটোগ্রাফি বিক্রি হয় চড়া দামে।সাথে ফটোশুটিং,বিভিন্ন ইভেন্ট করে ভালো টাকাই হাতে আসে।দিন রাত পরিশ্রম করে সে মীরনকে সুস্থ করার জন্য।তার ইচ্ছে মীরনকে নিয়ে বিদেশে যাবে উন্নত চিকিৎসার জন্য।অভ্রর পরিবার খুব খুশি বা সন্তুষ্ট তা নয় কিন্তু ছেলের ভালোবাসার মূল্য দিয়ে তারা চুপ থাকেন।কিন্তু সবাই জানে অভ্র আসলে মীরন নামের মৃতপ্রায় এক মোহের পিছনে ছুটছে।যার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকার। কিন্তু অভ্র তা মানতে রাজি নয়।অভ্র ধারণা একদিন মীরন ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে। তার হাতটা আবার ধরে বলবে, আমাকে নিয়ে একটু হাটবি?তখন অভ্র মীরনের হাতটা শক্ত করে ধরে বলবে তার মনের কথা,ভালোবাসার কথা,সারাজীবন এক সাথে থাকার কথা।অভ্র অবশ্য প্রতিদিনই মীরনের সাথে কথা বলে। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যে সময় টা পায় অভ্র মীরনের কাছে গিয়ে বসে থাকে।কত কত কথা বলে সে মীরনকে। তার ফটোগ্রাফির কথা,তার এওয়ার্ড পাওয়ার কথা। কিন্তু মীরন কোনো কথা বলে না, সারা দেয় না।স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে উপরের দিকে।তখন কি ভীষণ অস্থির ও অসহায় লাগে অভ্রর নিজেকে। সে ভিতর থেকে ভেঙে চুরে চুরমার হয়ে যায়।মনে হয় ঝড়,জলোচ্ছ্বাস সব এক সাথে তার বুকের ভিতর চলছে।তীব্র বেদনা ঘ্রাস করে তাকে।তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। প্রবল একটা অনুশোচনা ও কাজ করে তার মনে।তার মনে হয়,ঐদিন যদি সে মীরনের হাতটা না ছাড়তো বা মীরনকে নিয়ে না গিয়ে রিসোর্টে থাকতো তাহলে হয়তো এমন হত না।কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটা অভ্র ভাবে বার বার অসংখ্য বার।মীরনের এমন কেন হলো? কেন মীরন মাঝে মাঝে এমন অস্বাভাবিক আচরণ করতো। কেন মীরনের এত দমবন্ধ, এত অস্থির লাগতো কিন্তু কোনো জবাব পায় না অভ্র।অভ্রর মনে হয় পিছনে লুকিয়ে আছে ঘটনা, কাকতালীয়, অসাধারণ, অবিশ্বাস্য কোনো ঘটনা। যা জানতে পারলে মীরন সুস্থ হয়ে যেত।কিন্তু হাজার ভেবেও অভ্র সেই রহস্যের তল খুঁজে পায় না।একদিন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। অভ্র তার এক বন্ধুর সাথে মীরনের হাসপাতালে গেলো। কেবিনে ঢুকে দেখলো কেউ নেই একা মীরন শুয়ে।যে নার্সটাকে রাখা হয়েছিল মীরনের দায়িত্ব সে নেই।রুমটা যেন একটু বেশিই ঠান্ডা হয়ে আছে।এসি একটু বেশিই জোরে ছাড়া। অভ্রর যেন শীত লাগলো একটু।সে মীরনের কাছে গিয়ে দেখলো অক্সিজেন নল লাগানো সত্ত্বেও মীরনের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখে সেই আগের ভয়টা।শরীর ও যেন একটু কেঁপে কেঁপে উঠছে। অভ্র যেন পাগল প্রায় হয়ে উঠলো। ডাক্তার, নার্সকে ডেকে আনলো।তারা বুঝতে পারছিলেন না কি হচ্ছে। মীরন কি মারা যাচ্ছে। হটাৎ অভ্রর মনে হলো মীরনের কি সেই প্যানিক এটাকটা হলো যা আগে হতো ঠান্ডা লাগলে।সে এসি অফ করে দিলো।এবং অবিশ্বাস্য ভাবে কিছুক্ষণ পর মীরন স্বাভাবিক হয়ে উঠলো। অভ্রর সাথের বন্ধুটা সব কিছু দেখলো এবং জিজ্ঞেস করলো ব্যাপারটা আসলে কি হয়েছিলো।অভ্রর বন্ধুটা একটু আধ্যাত্মিক ধরনের ছিলো, একটু অন্য রকমের। কিছুক্ষণ চিন্তা করে অভ্র খুলে বললো মীরনের ব্যাপারে সব।সব শুনে অভ্রর বন্ধু বললো তার যেন মনে হচ্ছে ব্যাপারটা সাধারণ কিছু নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে রহস্য। আধ্যাত্মিক ধরনের কিছু যা ঘটছে কিন্তু চোখে দেখা যাচ্ছে না। অভ্রর বন্ধু বললো সে একজন খুব বিখ্যাত সাধক বাবাকে চিনেন যিনি অনেক রহস্যময় সমস্যার সমাধান করেন।অভ্র চাইলে তাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারে সে।অভ্র ভাবলো, এতদিন চিকিৎসা করেও যেহেতু কিছু হয়নি শেষবার না হয় সাধক বাবার কাছে ই যাওয়া যাক যদি মীরাকেল কিছু ঘটে। তারপর নিদিষ্ট দিনে অভ্র ও তার বন্ধু সাধক বাবার কাছে গেলো।সাথে নিয়ে গেলো সাধক বাবার কথা অনুযায়ী মীরনের ব্যবহার করা কিছু জিনিস,যেগুলো মধ্যে ছিলো মীরনের চিরুনি, চুল,জামা, তার পানি খাবার গ্লাস এবং মীরনের সেই ডাইরি যেটাতে মীরন মনের কথা লিখতো।সাধক বাবা ব্যবহৃত জিনিস নিয়ে যেতে বলেছিলেন বলে অভ্র বুদ্ধি করে এগুলো নিয়ে গেলে সাথে নিয়ে গেলো মীরনের একটা ছবি।সাধক বাবা আধ্যাত্মিক মানুষ।তিনি নাকি জিন সাধনা,পূর্বজন্ম বিশ্বাসী এবং আলৌকিক কিছু ক্ষমতার অধিকারী। এমন অনেক রহস্যজনক ঘটনা তিনি নাকি সমাধান করেছেন যা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বর্ননা করা যায় না। যে কারনেই হোক মানুষ যখন উনার কাছে গিয়ে উপকার পান,সমস্যা থেকে নিরাময় পান তাহলে গিয়ে সমস্যার সমাধান চাইতে ক্ষতি কি!সাধক বাবা থাকেন গাজীপুরের ভাওয়াল জঙ্গলের একটি নির্জন বাড়িতে।ওখানে সব সময় যে মানুষের ভিড় লেগে থাকে তা কিন্তু নয়।তিনি সবার সাথে দেখা করেন না এবং অল্পভাষী। অভ্রর বন্ধু অভ্রকে নিয়ে গেলো ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে অনেক ছোট, পায়ে হাটা পথ দিয়ে।অনেক পুরনো ভাঙা একটা বাড়ি।ভিতরে আবছা অন্ধকার। অভ্রের বন্ধু গিয়ে কথা বললো সাধকবাবার শিষ্যদের সাথে। কোনো এক বিশেষ কারণে সাধকবাবা সেদিন অভ্রের সাথে দেখা করতে রাজি হয়ে যান।অভ্র রুমের ভিতরে ডুকলো।এই রুমেই বেশির ভাগ সময় সাধকবাবা ধ্যানমগ্ন থাকেন বা গবেষণা করেন।পুরনো দিনের রূপকথার গল্পের মতোই সাধকবাবার সামনেও যজ্ঞের আগুন জ্বালানো।তিনি কিসব মন্ত্র পড়ে যজ্ঞে ফু দিচ্ছেন আর আগুন দাও দাও করে জ্বলে উঠছে।অভ্রের কেমন গা ছমছম করে উঠলো। সাধকবাবা তাকে হাতের ইশারা দিয়ে কাছে গিয়ে বসতে বললেন। ঢোক গিলে অভ্র কাছে গিয়ে বসলো। সাধকবাবা আগুনের দিকে তাকিয়েই বললেন, আমাকে ভয় পেয়ো না,আমি ও তোমার মতোই মানুষ। অভ্র অবাক হলো সে ভয় পাচ্ছে তা উনি জানলেন কি করে। মনে হয় তার চোখে মুখে ভয় ফুটে উঠছে।সাধকবাবা অভ্রর দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললেন, সমস্যা বলো।অভ্র তখন মীরনের সমস্ত কথা খুলে বললো। সাধকবাবা মন দিয়ে সব শুনলেন কোনো কথা বা প্রশ্ন করলেন না।তারপর মীরনের চিরুনি ও চুল একটা পানির পাত্রে রাখলেন। স্বচ্ছ কাচের পাত্র।কিছুক্ষণ পর অদ্ভুত ভাবে ওখান থেকে কেমন যেন এলকোহলের মানে এক ধরনের মদের গন্ধ বের হলো। সাধকবাবা কোনো কথা বললেন না। পত্রটা পাশে রেখে দিয়ে মীরনের পানি খাওয়ার গ্লাসটা শুকে দেখলেন এবং কি যেন একটা আন্দাজ করলেন।তারপর ডাইরিটা হাতে নিলেন এবং পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলেন একটা পৃষ্ঠায় একটা লাইন দেখে তিনি অভ্রের দিকে তাকালেন এবং অভ্রকে লাইনটা পড়ে শুনালেন।
-মেয়ে হয়ে জন্মে আমি অন্যায় করেছি জনমে জনমে,সব সময়।
কেন এমন লিখলো মীরন অভ্র তা বুঝলো না।সাধকবাবা আরও কিছু পৃষ্ঠা অভ্রকে দেখালেন সেখানে চিহ্নের মতো লেখা। যেনো পুরনো কোনো সভত্যার ভাষা লেখার অক্ষর। অভ্র বললো, হ্যাঁ মীরন এগুলো লিখতো যখন তার খুব দম বন্ধ লাগতো তখন।আমি আজগুবি লেখা হিবিজিবি ভেবে হেসে উড়িয়ে দিতাম। সাধকবাবা মাথা নাড়লেন,বললেন, এগুলো আজগুবি লেখা নয়।তারপর মীরনের ছবিটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন,চোখে কি ভীষণ ভয়, উৎকন্ঠা, শঙ্কিত চোখ দুটো অনেক অজানা বলে দিচ্ছে। তারপর হটাৎ তিনি বলতে শুরু করলেন,ইনকা সভ্যতা ছিলো দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা অঞ্চলে গড়ে উঠা একটা বিখ্যাত সভ্যতা। সেখানে বাস করতো পনের বছর বয়সী একটা ইনকা মেয়ে যার নাম ছিলো ‘ লা ডনসেলা’।তাকে ইনকাদের ‘ ক্যাপাকোচা’ নামক একটি ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে বলি দেওয়া হয়েছিলো। ইনকারা বিশ্বাস করতো, পর্বত দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে এবং সম্রাটের মঙ্গল নিশ্চিত করতে এই ধরনের বলিদান প্রয়োজন ছিলো। বলিদানের আগে তারা শিশুটিকে কোকা পাতা এবং এলকোহল দিয়ে মাদকাসক্ত করতো এবং তারপর তাদের মাটির নিচে একটা ছোট চেম্বারে রেখে দেওয়া হতো, যেখানে তারা ঠান্ডায় জমে মারা যেত।বলিদানের কয়েকমাস আগে থেকে ডনসেলার খাদ্যভাসে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যেখানে ভুট্টা ও লামার মাংসের মতো অভিজাত খাবার যোগ করা হতো।
সাধকবাবার কথা অভ্র কিছুই বুঝলো না হটাৎ তিনি এগুলো বলছেন কেন? এগুলোর সাথে মীরনের কি সম্পর্ক!
: আমার কথার অর্থ বুঝলে না তাইতো?
: জ্বি! ঐ মেয়েটির সাথে মীরনের কি সম্পর্ক! আপনি হটাৎ ঐ মেয়েটির প্রসঙ্গ তুলে আনলেন কেন?
: কারণ ডলসেলাই আজকের মীরন।
অভ্র চমকে উঠলো, মানে!
: ডনসেলার মৃত্যুর পর পুর্নজন্ম হয়েছে তার,যাকে এ জনমে তোমরা মীরন ডাকো।
অভ্র আশ্চর্য হলো, বিস্মৃত হলো, এ ও সম্ভব!
: ভেবে দেখো মীরনের আচরণ গুলো, কখন তার আচরণ অস্বাভাবিক হতো।
অভ্র ভাবলো, মিলিয়ে দেখলো ডনসেলার সাথে। কি করুন মৃত্যু হয়েছে তার ছোট চেম্বারে ঠান্ডায় শ্বাস আটকে।তার জন্যই কি ডিপ ফ্রিজ দেখলে এমন করতো মীরন।ফ্রিজ ও তো ঠান্ডা ছোট চেম্বারের মতো। ডনসেলাকে রোজ ভুট্টা ও লামার মাংস খেতে দেওয়া হতো ঐ জন্যই কি এত অনিহা,অরুচি লাগতো মীরনের এই খাবার গুলোতে।এলকোহল জাতীয় মদের গন্ধ তার এজন্য এত বিশ্রি লাগতো। এজন্মেও তার চুল থেকে এলকোহলের গন্ধ বেড়িয়ে এসেছে এইজন্য! সাধকবাবা মীরনের চুলের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করেছেন যা থেকে পষ্ট যে তার শরীরে এলকোহল সেবনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এজীবনে তো মীরন কোনো দিন এলকোহল সেবন করে নি।এমন কি ঘ্রান শুকলেও সে অস্বাভাবিক আচরণ করতো। অভ্রর কাছে সবটা পরিষ্কার হলো। সে সত্যিই বিশ্বাস করলো ডনসেলাই মীরন।এমন কষ্ট করে এমন করুন মৃত্যু হয়েছিল পূর্বজন্মে।সত্যিই পূর্বজন্ম হয়! অভ্রর চোখ ভিজে উঠলো। মীরন তো তাহলে এই জন্মেও তার পূর্বজন্মের কষ্ট ভোগ করছে।এত কষ্ট সহ্য করছে দিনের পর দিন।কিন্তু এ থেকে বাঁচার কি উপায় নেই! অভ্র সাধকবাবার দিকে তাকালো। বললো, এই অবস্থা থেকে কি পরিত্রান নেই মীরনের?
: আছে।কিন্তু……
: কিন্তু কি বাবা বলেন প্লিজ…
: বড্ড কঠিন সে উপায়,কষ্টসাধ্য,অনেকটা দূরসাধ্য ও বটে।
: আমি মীরনের জন্য সব করতে রাজি।বলুন কি করতে হবে আমাকে।
: মোক্ষলাভ…
: মোক্ষলাভ! মানে?
: মানে আত্মার মুক্তি অর্জন।জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মীরনের মুক্তি। তার পুর্নজন্মের কার্য থেকে মুক্তি। যা এখনো মীরনকে তাড়িয়ে বেড়ায়।একমাত্র মোক্ষলাভ ই করতে পারবে মীরনকে তার এই জীবনে স্বাভাবিক করতে।
: মোক্ষলাভ করতে কি করতে হবে বাবা? বলুন আমি সব করবো।
: অবিশ্বাস্য, কষ্টসাধ্য এক কাজ করতে হবে।একটা জিনিস যোগাড় করতে হবে।
: কি জিনিস?
: কামধেনু গাছ….
: কামধেনু গাছ! কি এটা? কোথায় পাওয়া যাবে? বলুন পৃথিবীর যে প্রান্তে ই হোক আমি নিয়ে আসবো।
: আমেরিকার ভেনেজুয়েলাতে ব্রোসিয়াম নামের এক ধরনের গাছ আছে যা থেকে সারা বছরই গরুর দুধের মতো দুধ পাওয়া যায়। খেজুর গাছের মতো গা কেটে নল বসিয়ে দিলে চুয়ে চুয়ে দুধের মতো রস পড়ে যা গরুর দুধের মতোই স্বাদ ও গন্ধ। ঐ গাছ থেকে একফোঁটা রস যদি তুমি মীরনের মুখে দিতে পারো তবেই মীরনের পিছু ছাড়বে তার পূর্নজন্মের স্মৃতি কষ্টময় মৃত্যুর যন্ত্রণা। মীরন ভুলে যাবে সব, সুস্থ হয়ে উঠবে। আর কখনো তাকে তাড়া করবে না ডনসেলার কষ্ট ময় দিনগুলো, তার জীবনে মিলবে মোক্ষলাভ।
: আচ্ছা যদি তাই হয় আমি তাই করবো।
সাধকবাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অভ্র খোঁজ লাগাতে লাগলো সেই কামধেনু বা ব্রোসিয়াম গাছের রসের।কিন্তু তা সহজলভ্য নয়।কোথা থেকেই যোগাড় করতে পারলো না অভ্র সেই রস।মীরনের অবস্থা এখন আরও শোচনীয়। বাঁচার চান্স কমছে।বিদেশ নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাতে চাইলো অভ্র।ডাক্তার রা বললেন নাভ হবে না শুধু অর্থ ব্যয় হবে। তার চেয়ে উপর ওয়ালার হাতে ছেড়ে দিন, যদি মীরাকেল হয়। হটাৎ এক বিকেলে অভ্রর কি মনে হলো,দুর সাহসিক এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো অভ্র।সে নিজেই যাবে আমেরিকার ভেনেজুয়েলাতে।সেখানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় নিয়ে আসবে কামধেনুর রস।হ্যাঁ ব্যাপার টা অনেক কঠিন,দুরসাধ্য বটে কিন্তু অসাধ্য নয়।আর মীরনের জন্য অসাধ্য সাধন করতেও রাজি অভ্র।মীরনের উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেক টাকাই জমিয়েছিলো অভ্র। সেগুলো দিয়ে সে ঘুরে আসতে পারবে মনে হয়। তাছাড়া ফটোগ্রাফির কারণে সে বিভিন্ন দেশ-বিদেশ ঘুরেছে এই ক’বছর। পাসপোর্ট ভিসা জোগাড় করা এতটাও কঠিন নয়। দৌড়াদৌড়ি করে অভ্র যোগাড় করলো ভেনিজুয়েলার টিকেট। হটাৎ একদিন চলে গেলো কাউকে কিছু না বলে।অসাধ্য সাধন করে তিনমাস পর কামধেনুর রস নিয়ে ফিরে এলো সে।এসে জানতে পারলো মৃত্যুর দুয়ারে মীরন।লাইভ সাপোর্ট এ আছে। অভ্র আসতেই মীরনের মা ছোটে আসলেন,অভিমানী কন্ঠে বললেন, কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে তুমি? তুমি না মীরনের সুস্থ করার দায়িত্ব নিয়েছিলে!পারবে না তাই দায় এড়াতে লুকিয়ে পড়েছিলে? গিয়ে দেখ আমার মীরন সত্যিই আজ মারা যাচ্ছে। বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি।

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে


অভ্র অবাক হলো, খুশিও হলো। মীরনের প্রতি তার মার লুকানো ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছেন না তিনি শক্ত খোলসে।নিজের মেয়ের মৃত্যু মুখে দেখে সত্যিই তিনি ভেঙে চুরে হয়ে উঠেছেন মমতাময়ী মা।অভ্রর মাও এসে জড়িয়ে ধরলো অভ্রকে।পাগলের মতো বললেন,কই ছিলি এত দিন? অভ্র মাকে জড়িয়ে ধরে বললো, মা এখন একটু মীরনের কাছে যাই।ডাক্তাররাও না করলেন না।মৃত্যু পদযাত্রী যদি কোনো মীরাকেল এ ভালো হয় তো হোক।অভ্র গেলো মীরনের কাছে। গিয়ে বললো, এ মীরন তোর জন্য অসাধ্য সাধন করেছি।কি করেছি শুনবি না? আচ্ছা পরে শুনবি।আগে এই দুরসাধ্য করা,দুর্লভ রসটা খা।দেখবি ভালো হয়ে গেছে সব।বলে দেরি না করে কয়েক ফোটা রস অভ্র ঢেলে দিলো মীরনের মুখে। মাত্র কয়েক মিনিট ব্যবধানে ই যেন মীরাকেল ঘটলো। মীরন কেঁপে উঠলো। জোরে শ্বাস নিতে শুরু করলো। চোখ দিয়ে পানি পরতে শুরু করলো। তার শরীরের সাথে লাগানো তারের মেশিন গুলো শব্দ করতে শুরু করলো। ডাক্তাররা দৌড়ে এলেন।বের করে দিলেন অভ্রকে রুম থেকে। তারপর চার-পাঁচ ঘন্টা সময় চলে গেলো। মীরনের জ্ঞান ফিরে এলো। কোমা থেকে জেগে উঠলো সে।হাসপাতালে মীরনের পরিবারে যেন খুশির বন্যা বয়ে গেলো। সবাই হৈচৈ করতে লাগলো। কিন্তু অসাধ্যসাধনকারী অভ্র দাঁড়িয়ে রইলো দূরে চুপচাপ। এক সময় মীরনের মা এলেন।বললেন, তুমি ভিতরে যাও বাবা,মীরন তোমাকে খুঁজছে।
অভ্র আস্তেধীরে মীরনের কাছে গিয়ে বসলো।মীরন খুব আস্তে স্বরে বললো, তুমি নাকি আমাকে বাঁচাতে আমেরিকা চলে গিয়েছিলি?
অভ্র হেসে বললো, হ্যাঁ।
: ওখানে কেন?
: তোকে বাঁচাতে…
: কেন?
: তুই যে আমার হৃদপিণ্ড, তোকে ছাড়া আমি বাঁচতাম!
: এখন যদি আমি মারা যাই তখন?
: আর মরবি না।আর কোনো দিন তোর ঐ রকম হবে না।দম বন্ধ লাগবে না।তুই ভয় পাবি না,তুই এখন থেকে ঠান্ডায় ও বুক ভরে নিশ্বাস নিবি।
: সত্যিই? কিন্তু কিভাবে?
: তোর মোক্ষলাভ হয়েছে।
: মোক্ষলাভ!
: হ্যাঁ, মোক্ষলাভ।
: কি বলিস কিছুই বুঝি না।
: এত কিছু বুঝতে হবে না। তুই এখন আমার হয়ে থাকবি।আমার জীবনসঙ্গী হয়ে সারাজীবন আমার কাঁধে মাথা রেখে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিবি।এসির ঠান্ডা হাওয়া বইছে।কিন্তু মীরনের একদম দম বন্ধ লাগছে না বরং আরাম লাগছে।তার জানতে ইচ্ছে করছে কি সে মোক্ষলাভ যার জন্য সে সুস্থ। কিন্তু তার অভ্রকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে অভ্রের রহস্যময় হাসি মাখা মুখটার দিকে।
-সমাপ্ত

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments