back to top
Wednesday, January 21, 2026
Homeসাহিত্যগল্পশেষ না হওয়া পরীক্ষা

শেষ না হওয়া পরীক্ষা

আল পারভেজ


পরীক্ষার শেষ ঘণ্টাটা বাজার সাথে সাথেই যেন বুকের ওপর থেকে একটা পাথর নেমে গেল। খাতাটা স্যারকে জমা দিয়ে বেরিয়ে এলাম করিডোরে। এক পৈশাচিক স্বস্তি! বন্ধুদের সাথে একটু বাজি ধরেছিলাম, কে কত আগে শেষ করতে পারে। আজ আমিই জিতেছি। আমার চোখ দুটো আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আয়ানকে খুঁজছিল। ও নিশ্চয়ই এখনো লিখছে। বরাবরই শেষ বেঞ্চে বসে, গুছিয়ে লেখে সবকিছু। হয়তো বেরও হতে পারে।

বন্ধু-বান্ধবদের হাসাহাসি আর হট্টগোলের মধ্যে আমি স্কুলের গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ছুটির সময় হয়ে এলো। ছোটো ছোটো ভাই-বোনেরা তাদের ক্লাসরুম থেকে বেরোতে শুরু করেছে। গেটের কাছে অভিভাবকদের ভিড়। একটা পরিচিত, কোলাহলপূর্ণ দৃশ্য।

ঠিক তখনই, আকাশটা যেন কানে তালা লাগিয়ে দিল। একটা ভয়ংকর, তীব্র গর্জন! প্রথমে ভেবেছিলাম মেঘের ডাক, কিন্তু এ শব্দ পৃথিবীর নয়। মাটিটা থরথর করে কেঁপে উঠল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চোখের পলকে দেখলাম, একটা ধাতব দানব—একটা যুদ্ধবিমান—আগুন ছড়াতে ছড়াতে আমাদের জুনিয়র সেকশনের বিল্ডিংটার ওপর আছড়ে পড়ল।

একটা বিস্ফোরণ। তারপর সব অন্ধকার।

কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কানে কোনো শব্দ আসছিল না, শুধু একটা ভোঁ-ভোঁ আওয়াজ। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম নরক। দাউদাউ করে জ্বলছে আমাদের ছোট্টো ভাই-বোনদের ক্লাসরুম। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশটাকে গিলে ফেলেছে। বাতাসের প্রতিটা কণায় পোড়া গন্ধ আর মানুষের আর্তনাদ।

আমার মাথা কাজ করছিল না। শুধু মনে পড়ল, আয়ান! আয়ান কোথায়? আমি ওকে খুঁজছিলাম। ছুটির আগে ও প্রায়ই জুনিয়র সেকশনের সামনে এসে দাঁড়াত, ওর ছোটো বোনটাকে নিয়ে একসাথে বাড়ি ফিরবে বলে।

আমি পাগলের মতো সেদিকে দৌড়ে গেলাম। যা দেখলাম, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আগুনের লেলিহান শিখার সামনে, গেটের কাছেই পড়ে ছিল আয়ান। ওর শরীরটা নিথর, কিন্তু চোখ দুটো খোলা। মনে হলো, ও শেষবারের মতো আমাকেই খুঁজছিল। ওর পাশে পড়ে থাকা ওর স্কুলব্যাগটা জ্বলছে। যে ব্যাগে আমাদের কত স্বপ্ন, কত লুকোনো গল্পের খাতা ছিল, তা আজ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

আমার পৃথিবীটা সেখানেই থেমে গেল। আমি ওর নাম ধরে চিৎকার করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোল না।

ছোটো ছোটো বাচ্চারা আগুনের ভেতর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। ওদের কচি শরীরে আগুন লেগে গিয়েছিল। প্রজাপতির মতো ডানা ঝাপটে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল ওরা, কিন্তু আগুন ছিল নির্দয়। সেখানে অনেক শিক্ষক, আমাদের দেবদূত, সেই আগুনের ভেতর থেকে ছোটোদের বাঁচাতে চেষ্টা করছিলেন। চাইলে নিজেরা বেঁচে ফিরতে পারতেন। কিন্তু শিক্ষক হওয়ার আগে যে তারা মা, আমাদের মা। সন্তানদের রেখে কীভাবে নিজের প্রাণ বাঁচাবেন!

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

সেদিন আমি আমার বন্ধুকে হারিয়েছি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু হারিয়েছি। আমি আমার স্কুলের সেই চেনা বারান্দা, বন্ধুদের হাসি, আর নিরাপদ আশ্রয়টুকু হারিয়ে ফেলেছি। আমার কানের ভেতর থেকে সেই ভয়াবহ শব্দটা আর আয়ানের শেষ চাহনিটা কোনোদিনও মুছে যাবে না।

২১ জুলাই আমার পরীক্ষা শেষ হয়েছিল, কিন্তু জীবন আমার জন্য যে কঠিনতম পরীক্ষাটা সাজিয়ে রেখেছিল, সেটা সবে শুরু হয়েছিল মাত্র। সেই পরীক্ষার কোনো শেষ নেই। সেদিন শুধু আয়ান বা আমাদের স্কুলের শিশুরা নয়, ওদের সাথে নীরবে মরে গিয়েছিল আমাদের ভেতরকার অনেকটা অংশও। কেঁদেছিল পুরো বাংলাদেশ।

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments