সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম মুজাহিদ
ছোট্ট একটা বাচ্চা আমাকে বলল, জানেন হুজুর? আমি বললাম,কী?
তখন তার চোখ পানিতে ছলছল করছিল।
-বলল, আমার কাছে যদি এক টাকা থাকত,তাহলে আল্লাহকে কিনে নিতাম।আমি বললাম, আপনি আল্লাহকে কিনতে চান কেন?
-সে বলল,আল্লাহকে কিনলে তো তিনি আমার হয়ে যাবেন। তাই আমি যা বলব তিনি তাই শোনবেন।
আপনি আমাকে একটাকা দিবেন?
-আমি বললাম,আমি আপনাকে এক টাকা দিব। আগে আমাকে বলুন,আপনি আল্লাহকে কেনার পর তার কাছে কী চাইবেন?
(প্রিয় পাঠক, আমি ছোট্ট বাচ্চাদেরকে আদর করে আপনি বলি)।
-সে বলল,আল্লাহকে কেনার পর আমি তাকে আমার বিছানায় শোয়াব। আর তার পা টিপে টিপে বলব,আমার প্রিয় আল্লাহ! আমার ঘরে চাল নেই। ১ বস্তা চাল দাও না। আমাকে না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়। আমার কোনো জামাকাপড় নেই।পাঁচবছর ধরে বাবা কোনো কাপড় কিনে দেননি। বাবার মাত্র একটি লুঙ্গী ;তাও সেলাই করা। আমার আম্মুর তো মাত্র একটা শাড়ি। অনেক বছরের পুরাতন। আমাদের ঘরটাকে কাপড়ের দোকান বানিয়ে দাও। দেখছো আল্লাহ,আমার পায়ে জুতো নেই।
গরমের দিনে পাকা রাস্তাগুলো কী গরম থাকে! আমার খুব কষ্ট হয়। কত দিন হয়ে গেল ;ভালো কিছু খেতে পাই না।আম্মুটা খুব দুষ্টু ; শুধু কাঁদে। আর আমাকে ভাতের কথা বললে মাইর দেয়। আচ্ছা হুজুর….মা ডাকছেন। পরে কথা বলব।
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি আর বাচ্চাটির চলে যাওয়া দেখছি। মসজিদের মাইকে আসরের আযান শোনা গেল।নামাজের জন্য হাঁটা শুরু করলাম। আর পিছন ফিরে ফিরে ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে তাকাচ্ছিলাম। হয়তো তার জীবনের সাথে আমার জীবনের উপন্যাসের মিল থাকতে পারে।
পরদিন সকাল বেলা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। শীতের সকাল।ভাবলাম এক কাপ চা খেলে শীত থেকে অন্তত কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যাবে। দোকানে গিয়ে চায়ের ওর্ডার করলাম।কিছুক্ষণ পর একটা ছোট্ট বাচ্চা চা নিয়ে আসলো।দেখেই তো আমি অবাক।
বললাম- বাবু আপনি এখানে কি করছেন? আপনি চা দিচ্ছেন কেন?
সে বলল- জানেন হুজুর, কালকে না আম্মু আমাকে খুব মেরেছেন। এই দেখেন পিঠের অবস্থা। (পিঠের দাগ দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না।এইভাবে কেউ বাচ্চাকে কেউ মারে! আমার চোখে পানি চলে এসেছে।)
আমি- আম্মু আপনাকে মারল কেন?
সে বলল- আমার প্রিয় আব্বুটাও কোনো কিছু করতে পারে না। আমার জান্নাতের অধিকারী আম্মুটা অন্যের বাড়ি কাজ করে।অ ন্যের বাড়ি থালাবাসন মাঁজে।এইসব দেখলে কোন সন্তানের ভালো লাগে বলুন? (এই ছোট্ট বাচ্চার বিবেক দেখে পাঠক নিশ্চয়ই অবাক হবেন! আমিও অবাক হয়েছি)
বিকেল বেলা আম্মু একটা রুটি দিয়েছিল।
সারা দিন কিছু খাইনি। তাই রাতে ভাতের জন্য খুব জ্বালাতন করেছিলাম। আমার জান্নাতটা আমাকে মারল। আর বলল, ছেলে মানুষ।কাজ করে খেতে পারিস না?
জানেন হুজুর,তারপর আম্মুকে কী বলেছিলাম??
-জি, শোনতে চাই। আপনি বলুন।
- সারাদিনে কিছু খাইনি একটা পাউরুটি খেয়েছি। আম্মু আমার পেট তো তোমার থেকে অনেক ছোট। ক্ষুধার যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি। আচ্ছা আম্মু,বলুন তো,পেট বড় হলে কি ক্ষুধা লাগে না? তাইলে এক কাজ করেন। আল্লাহকে বলেন,যেন আল্লাহ আমার পেটটাকে বড় করে দেন। তাহলে আর ক্ষুধা লাগবে না। (ছোট বাচ্চা ; নিষ্পাপ মুখ দিয়ে কথাগুলা বের হচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল,নিজেই আল্লাহকে এক টাকা দিয়ে কিনে নেই।)
এক পর্যায়ে বাবুটা আমাকে প্রশ্ন করল করে বসলো,আচ্ছা হুজুর,আপনার পেট তো আমার থেকে বড়। আপনার কী ক্ষুধা লাগে না?
(প্রশ্নটা শুনে আমি পুরো বরফের মতো শক্ত আবার গলেও যাচ্ছি । কোথাও তার উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হয়তো গুগল বা চ্যাটজিপিটি তার উত্তর দিতে পারবে না।)
চোখের পানিকে ঘোমটা পরিয়ে বাবুটাকে মিথ্যার ঝুড়ি থেকে উত্তর দিলাম, না বাবু,বড় পেটে ক্ষুধা লাগে না।
-আচ্ছা হুজুর,যখন আল্লাহকে ১ টাকা দিয়ে কিনে নিব তখন তাকে বলব,আল্লাহ আমার পেটটাকে বড় করে দাও।
আমি-জানেন বাবু,আল্লাহ আপনাকে খুব বেশি ভালোবাসেন।।
সে বলল-আপনার সাথে কি আল্লাহর দেখা হয়েছে? তাহলে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসলেন না কেন? জানেন হুজুর, আমার একটা মিন্টু আছে। ওইটাকে কেঁটে আল্লাহকে দাওয়াত খাওয়াইতাম।আল্লাহকে মুখে তুলে খাওয়াইতাম।
দোকানের মালিক হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলে উঠল,ওই ব্যাটা,কাম করতে আইছস নাকি গল্প করতে আইছস?
আমি- ছোট মানুষ।একটু সুন্দর করে কথা বললেই তো হয়।বাচ্চাটা ভয় পেয়েছে।
দোকানদার: আপনার যখন এত দরদ লাগছে আপনি ওরে নিয়া যান। ওরে নিয়া খাওয়ান। আমি এরে কাজে রাখমু না।
-আমি খাওয়াব তো। আপনাকে বলতে হবে না। বাচ্চাদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় জানে না।
দোকান থেকে বাবুটাকে নিয়ে ভালো একটা হোটেলে ঢুকে পড়লাম। ময়লা জামা কাপড়। লোকেরা একবার বাচ্চাটার দিকে তাকাচ্ছে। একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে। খাবার টেবিলে বসে জিজ্ঞেস করলাম- বাবু কী খাবেন?
সে বলল-আপনি যা খাওয়াবেন তাই খাব।
ওয়েটারকে মাংসের ওর্ডার করলাম। টেবিলে মাংসের তরকারি রাখা। যা দেখে জিবে জল আসার মতো অবস্থা।লক্ষ্য করলাম,বাবুটার চোখ থেকে বেয়ে বেয়ে পানি পড়ছে।
বললাম- আপনি কাঁদছেন কেন?
বলল- জানেন হুজুর, জন্মের পর আজ গরুর মাংস দেখলাম। তাই চোখের জলটাকে বাঁধ দিয়েও ধরে রাখতে পারিনি। আবেগের কাছে লজ্জার ঘোমটা হেরে গেছে। হুজুর মাফ করবেন। এত দামী খাবার আমি খেতে পারব না। আম্মু বলেছেন এইগুলা বড় লোকের খাবার। আর আমরা তো কোন লোকে পর্যায়ভুক্ত তা আল্লাহ ভালো জানেন। অবশ্য তাকে (আল্লাহকে) এক টাকা দিয়ে কেনার পর তাকে এই প্রশ্ন করব।
না খেয়ে হঠাৎ হাঁটা শুরু করলো। হাতে মাংসের বাটিটাও নিল। কিছু বললাম না।পিছু পিছু হাঁটছি। যতটুকু মনে হলো সে বাটিটা নিয়ে রেল লাইন পেরিয়ে কলোনিতে যাবে।ভাবলাম তার জন্য কয়েকটা চকলেট কিনে নেই। আর সে আনমনে রেল লাইন দিয়ে হাঁটছে। হঠাৎ মানুষের চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পেলাম। (যাক ট্রেনটা এতসময়ে আসলো)
হাতে চকলেট ছিল। চকলেট ফেলে দৌড় শুরু করলাম।গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে ডাক দিতে শুরু করলাম।বাবু! বাবু! বাবু! মুজাহিদ! মুজাহিদ! এই সরে যা। পিছনে ট্রেন।কে শুনে কার কথা। নিয়তি হয়তো তার কানের পর্দায় পাহারা বসিয়েছে। এইজন্য কানে আওয়াজ যাচ্ছে না। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে হুঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম।
হঠাৎ একটা বাচ্চার গলার বিকট শব্দ শুনতে পেলাম।
যেদিক থেকে শব্দ আসছিল সেদিকেই লোকেরা দৌড়াচ্ছে।
আহারে! কাঁটা পড়ছে রে! কাঁটা পড়ছে। কার কোল খালি হলো রে! আহারে বাচ্চা মানুষ! মাংসের বাটি নিয়ে মা-বাপরে খাওয়াতে যাচ্ছিল মনে হয়! (এইসব বলে সবাই আহাজারি করছিল)
আমি লক্ষ্য করলাম,আমার পা কেঁটে রক্ত বের হচ্ছে। কোনো রকমে ভীড় ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলেম। যা দেখলাম…….সহ্য করতে পারছিলাম না। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে পড়লো। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম।চোখ ফেটে কান্না আসছিল।
নিতর দেহটার পাশে মাংসের বাটিটা পরে আছে। আর চোখ দুটো মাংসের বাটির দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো তার আত্মাটা মাংসের স্বাদ নিতে চাচ্ছে। তার চোখ থেকে ঝরনার মতো পানি পড়ছিল। হাত,পা,মাথা সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে আছে। আমার ঠোঁট কাঁপছিল। কিছু বলার শক্তি পাচ্ছিলাম না। গলার পানিটা সেই শক্তিটা কেড়ে নিয়েছে। সমস্ত শরীরের শক্তি দিয়ে বললাম
চলে গেল রে!! চলে গেল। আজ সে শান্ত। জনমের মতো তার মাংসের সাধ মিটে গেছে। এমন মাংস খেয়েছে, তার কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেছে। হাহাহা! আল্লাহকে নাকি এক টাকা দিয়ে কিনবে! কিনে নাকি তার পা টিপে দিবে। টিপে টিপে বলবে-১ বস্তা চালের কথা,কাপড়ের কথা,জুতার কথা,বলবে তার দুঃখের কথা। আল্লাহকে নাকি তার প্রিয় ছাগল মিন্টুকে জবেহ করে খাওয়াবে। আজ সে জনমের মতো আল্লাহকে কিনে নিলো রে! আজ আর কোনো টাকা লাগবে না রে।আজ সে আল্লাহর সাথে ইচ্ছে মতো দাওয়াত খাবে রে। প্রিয় পাঠক, সে ছিল তার মা বাবার একমাত্র উপন্যাস,যার শেষ পৃষ্ঠা মৃত্যু দিয়ে সমাপ্ত হলো।



