আহমাদুল্লাহ আশরাফ
নদীমুখ—a village cradled in the green arms of nature. পাহাড় ঘেরা, ছোট্ট নদী আর অরণ্যের ছায়া এই গ্রামের সৌন্দর্য যেন কবিতার পঙ্ক্তি হয়ে বয়ে চলে। আর ঠিক গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝর্ণাটি ছিলো এই সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ অলংকার। ঝর্ণার নাম—অমৃতধারা।
কিন্তু সময় সব কিছু বদলায়। অমৃতধারাও বদলাতে শুরু করল। তার স্বচ্ছ জল কালচে হয়ে উঠলো, চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো আবর্জনা। কেউ আর ঝর্ণার পাশে বসে গান গায় না, গল্প করে না, শিশুরা আর খেলতে আসে না। একদিনের প্রাণকেন্দ্র এখন যেন দগ্ধ প্রকৃতির আর্তনাদ।
এই বদলটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে এক কিশোরীর—আরিয়ার।
আরিয়া নদীমুখ হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী। গ্রামের সাধারণ মেয়েদের মতো না সে। নিজের বইখাতা, স্কুল, সংসারের কাজের বাইরেও সে ভাবে গ্রামের মঙ্গল নিয়ে। তার মা ছিলেন চিত্রা আম্মা—একজন স্বনামধন্য মহিলা, যিনি অসহায় মানুষদের পাশে থাকতেন, নিজ হাতে গাছ লাগাতেন, সবার মা হয়ে উঠেছিলেন। চিত্রা আম্মা বছর দুই আগে মারা গেছেন, কিন্তু তার আদর্শ বয়ে নিয়ে চলছে আরিয়া।
একদিন আরিয়া স্কুল থেকে ফিরে ঝর্ণার পাশে গিয়ে দেখে—তিনজন লোক ট্যাংকির মতো কিছু বসাচ্ছে, ঝর্ণার পানি প্লাস্টিক পাইপ দিয়ে নিচ্ছে নিচের দিকে।
সে রাগে কেঁপে ওঠে। “এভাবে যদি পানি তুলে নিয়ে যায়, কিছুদিন পর তো ঝর্ণা থাকবে না! আমরা তো পানিও পাবো না!”
তার প্রতিবাদে কেউ কান দেয় না। বরং বলে, “তোমার পড়াশোনার বয়সে ঝর্ণা নিয়ে মাথা ঘামাতে এসেছো কেন?”
আরিয়া হতাশ হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু সে থেমে যায় না।
২.
পরদিন স্কুলে গিয়ে সে এই ঘটনা বলে তার প্রিয় শিক্ষক প্রেমলাল স্যারকে। প্রেমলাল স্যার ছিলেন সেই মানুষ, যিনি শুধু বইয়ের পড়া পড়াতেন না, শেখাতেন জীবনের শিক্ষা।
তিনি বলেন, “তুমি একা কিছু করতে পারবে না, আরিয়া। আমাদের সবাইকে সচেতন করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে ঝর্ণার প্রয়োজনীয়তা, পরিবেশের গুরুত্ব।”
আরিয়া বলল, “আমি চাই স্যার, আমরা সবাই একত্রে কিছু করি।”
প্রেমলাল স্যার হাসলেন, “তাহলে শুরু হোক তোমার প্রথম প্রকল্প—‘অমৃতধারা বাঁচাও অভিযান’।”
৩.
এর কয়েকদিন পরেই গ্রামে আসে এক যুবক—বীর। শহর থেকে এসেছে, একটি এনজিও-র প্রতিনিধি হিসেবে। তার উদ্দেশ্য—পল্লি অঞ্চলে পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্প চালানো।
বীর প্রথম থেকেই আরিয়াকে দেখে অবাক হয়। একজন কিশোরী, যেভাবে পরিবেশের কথা ভাবছে, প্রতিবাদ করছে, সেটা শহরের অনেক প্রাপ্তবয়স্কও করে না।
বীর ও আরিয়া মিলে শুরু করে ঝর্ণা বাঁচানোর প্রচার। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাতে শুরু করে কেন ঝর্ণা শুধু জল নয়—এটি গ্রামের অস্তিত্ব। তারা স্থানীয় ভাষায় লিফলেট তৈরি করে, স্কুলে নাটিকা করে।
একদিন গ্রামের মেলা বসে। আরিয়া ও বীর সেখানে আয়োজন করে একটি ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা—বিষয়: “আমার অমৃতধারা।”
ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ছবি আঁকে ঝর্ণাকে ঘিরে। কেউ আঁকে নারকেল গাছের নিচে বসে গল্প করা, কেউ আঁকে পাখিদের জল খাওয়া।
মেলার শেষে একজন বৃদ্ধ এসে বলে, “মা, অনেকদিন পর মনে পড়লো—এই ঝর্ণার ধারে আমি আমার প্রথম প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করেছিলাম।”
গল্পের এই মানবিক দিক ছুঁয়ে যায় সবার মন। মানুষ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে।
৪.
কিন্তু সব সহজে ঘটে না।
গ্রামের কিছু লোক, যারা ঝর্ণার জল বিক্রি করে মুনাফা করছিল, তারা এই প্রচারণায় বিরক্ত হয়। এক রাতে আরিয়ার বাড়ির সামনে কেউ ফেলে যায় একটা চিঠি—“চুপ না থাকলে বিপদ আছে।”
আরিয়ার মা নেই। বাবা, একজন গরীব কাঠমিস্ত্রি, চিঠি পড়ে খুব ভয় পান। মেয়েকে বলেন, “থেমে যা মা, আমাদের ক্ষমতা নেই। ভালো চাওয়াটাই অনেক সময় শত্রু তৈরি করে।”
কিন্তু আরিয়া জানে, ভয় পেলে কিছু হয় না। চুপ থাকলে একদিন ঝর্ণা থাকবে না, থাকবে না গ্রামের প্রাণ।
সেই রাতে সে চুপচাপ চিত্রা আম্মার ছবির সামনে বসে থাকে। আম্মা যেন চোখ দিয়ে বলে, “লড়াই কর মা। ভালো কিছুর জন্য যদি কষ্ট না থাকে, তবে তা টিকে না।”
৫.
পরদিন সকালে সে যায় প্রেমলাল স্যারের কাছে। সব খুলে বলে। স্যার বলেন, “আমি আছি তোমার পাশে।”
সেই দিন থেকে স্কুলে শুরু হয় “প্রকৃতি সপ্তাহ”। গাছ লাগানো, নদীর তীর পরিষ্কার, ঝর্ণার ধারে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান, লোকসংগীত—সব মিলিয়ে পুরো গ্রামে যেন এক নতুন জাগরণ।
বীর তার সংস্থার সহায়তায় ঝর্ণার চারপাশে একটি বায়ো-ফেন্সিং প্রজেক্ট চালু করে। সেখানে স্থানীয় মানুষ নিয়োজিত হয়, বিশেষ করে বয়স্ক ও বিধবা মহিলারা।
৬.
একসময় সব প্রচেষ্টা সফলতা পেতে শুরু করে। ঝর্ণার চারপাশ পরিষ্কার হতে থাকে। মানুষ বুঝতে পারে—ঝর্ণা শুধু পানি নয়, তা জীবনেরই অংশ।
একদিন জেলা প্রশাসনের এক প্রতিনিধি গ্রামে আসে। সব দেখে মুগ্ধ হয়ে বলে, “আমরা চাই এই প্রকল্পকে জেলার অন্য গ্রামেও ছড়িয়ে দিতে।”
আরিয়া তখন বলে, “আমরা শুধু প্রকৃতি বাঁচাইনি। আমরা নিজেদের হৃদয়কেও একটু বিশুদ্ধ করেছি।”
৭.
এর বছরখানেক পর।
ঝর্ণার ধারে এখন ছোট্ট একটি পাঠাগার গড়ে উঠেছে—চিত্রা পাঠাগার। সেখানে বসে শিশুরা পড়ে, গান শেখে।
আরিয়া এখন কলেজে পড়ে। কিন্তু ছুটিতে এসে গ্রামের সকল কাজে অংশ নেয়। বীর তার সঙ্গে মিলে গ্রামের অন্য সমস্যাগুলো নিয়েও কাজ করছে—নারী শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানীয়, স্বাস্থ্য সচেতনতা।
ঝর্ণা আবার গান গায়, বয়ে চলে নির্ভরতার গল্প নিয়ে।
শেষ কথা:
এই গল্পটি শুধুমাত্র একটি গ্রামের নয়, এটি হাজারো আরিয়া, বীর ও চিত্রা আম্মাদের গল্প। আমাদের সমাজে আজ যখন ব্যক্তিস্বার্থের সামনে হার মানে নৈতিকতা, তখন এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি, মানুষ ও মূল্যবোধকে একত্রে বাঁচিয়ে রাখতে পারে একঝাঁক সাহসী মন।
ঝর্ণার জলের মতোই যদি আমাদের মানবতা অবিরত প্রবাহিত হয়, তাহলে পৃথিবীটা আরও একটু বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।



