back to top
Friday, December 12, 2025

সুর নাকি স্বর

নাবিলা জামান সুধা 

রিসার্চ এর কাজে বেশ ব্যাস্তসময় কাটাচ্ছে নীলাম। টেবিলে কফির মগটা নিয়ে ভাবছে,
“লাস্ট কবে যে কোনো ফ্যামিলি প্রোগ্রাম বা গেট টুগেদারে গিয়েছি তা ও মনে করতে পারি না! ছোটো বেলায় ভাবতাম কবে বড় হবো? আর এখন ভাবি কেন যে বড় হলাম! আবার যদি পারতাম ছোটবেলায় ফিরে যেতে!”
আসলে মানুষের চাওয়ার অনুভূতি গুলো আপেক্ষিক! মন কখন কী চায় বলা বড় দায়!
এসব ভাবতে ভাবতে আনমনে জল রং এ একের পর এক বিমূর্ত ছবি এঁকেই চলেছে নীলাম। আঁকতে গিয়ে বার বার যেন হারিয়ে যাচ্ছে কোথাও! চোখের সামনে অদ্ভুত সব রং ভেসে উঠছে তার, যে রং এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। তবুও সেই রং এর পিছেই ধেয়ে চলছে নীলাম। তার মনে হচ্ছে এতদিনের তার সব আঁকা যেন মিথ্যে, যদি না সে তার কল্পনার রং কেই চিনতে না পারে। প্রায় রোজই এমন সব ভাবনা চিন্তা রিসার্চ এর কাজ, খানিকটা অস্থিরতায় আর লো ভলিউমে “চৈত্রের কাফন” শুনতে শুনতে রাত পার করে দেয়!
কিছু দিন ধরেই নীলাম খানিকটা অস্বাভাবিক ফিল করছে, কখনো ফিনিক্স পাখির মতো, দেহটা যেন ভারশূন্য—পুড়ে গিয়ে আবার যেন জন্ম নিচ্ছে নতুন আলোয়.. আবার কখনো হিমালয়ের বরফ পাহাড়ের মতো আরক্ত শীতল হয়ে যাচ্ছে.. সাইকোলজির ভাষায় সিনাস্থেসিয়া বলে একটা টার্ম আছে যেখানে বলা হয় কেউ কেউ শব্দ শুনলে ঐ শব্দের রং দেখতে পায়, কেউ আবার কোনো রং দেখলে নাকি তার মনে নানান শব্দ কিংবা ওই রং কে ঘিরে কোনো ভাবনা উঁকি দেয়! নীলাম সাইকোলজি নিয়ে পড়ছে, ছোটবেলা থেকেই তার মনের এমন সব জটাংকের সমাধান করতে সে সাইকোলজি র বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রিসার্চ করে। কিন্তু আজকাল সে যেন নিজেই নিজেকে বুঝতে পারছে না! সে কী চায়? কোন অজানার পেছনে সে ছুটে বেড়াচ্ছে? নিভৃতে জমে থাকা এক রক্তিম শীতলতা! সে বুঝতে পারে না, কেনই বা শরীরের কোণে কোণে
এমন অনুভূতির অনুনাদ সৃষ্টি হয়,যার ভাষা নেই, ব্যাখ্যা নেই—
শুধু নিঃশব্দে কাঁপে আত্মার ভিতরটা…
হঠাৎ তার কানে অদ্ভুত এক সুর ভেসে এলো, রাত তখন ৩টা বেজে ১৫ মিনিট এখন কোথা থেকেই বা আসছে সেই সুর! মনে হচ্ছে পাহাড়ি সুরে কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে, যে সুর সে আগে কখনো শোনেনি। সে জানলার কাছে যায় সুর টা শোনার জন্য। কেউ যেন আপন মনে বাজিয়েই যাচ্ছে, আর নীলাম যেন মোহ নিদ্রায় তলিয়ে যাচ্ছে।সময় থেমে যায়, শব্দ হারায় কিন্তু সুর বেজে যায়। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে নীলাম অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করছে। কোনো অস্থিরতা কোনো জটাংকের শেকলে বাঁধা নেই তার মন।পর দিন আবার ঘড়ির কাঁটায় যখন রাত ৩ টা বেজে ১ মিনিট নীলাম ব্যাকুল হয়ে যায় সেই সুর শোনার জন্য। কখন ভেসে আসবে সেই সুর! অপেক্ষায় কাটছে প্রহর। অনিশ্চিত আশায় বসে থাকে নীলাম। আবার তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে অদ্ভুত সেই রং উদভ্রান্তের মতো জল রং এর প্রত্যেকটা টিউব এর রং মিলিয়ে সেই রং আবিষ্কার করতে যায়, কিন্তু পারে না, এমন সময় ভেসে আসে আবার সেই বাঁশির সুর! নীলাম জানলার কাছে ছুটে যায়। নিলামের কাছে সেই সুর
সাপের ভেনমের নেশার মতো,
ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে শিরা-উপশিরায়,
মাথার ঘোরে, নিঃশ্বাসের ভেতর! কিন্তু হঠাৎ নীলামের মনে প্রশ্ন জাগে কে বাঁজায় এই সুর? আর অন্য কেউ কী শুনতে পায় এই সুর? তাই সেদিন ইউনিভার্সিটি থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাদেরই এক প্রতিবেশী তরু কে জিজ্ঞেস করে,”আচ্ছা তুই তো অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করিস, তাই না? ” তরু বলে ওই আরকি না পড়লেও রাত জাগা টা এখন বদঅভ্যেস হয়ে উঠেছে.. তা তুমি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে যে? “
নীলাম একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল,” না এমনি ই বললাম, আচ্ছা তুই কখনো মধ্য রাতে কোনো বাঁশির সুর শুনতে পাস? এই ধর ৩ টা ৪ টার দিকে? “
তরু বলে,” কই না তো। বাঁশির আওয়াজ তাও এখানে!! আমি তো শুধু মশার গান শুনি! এখন বলো তুমি বাঁশি টাশি বাজাও নাকি রাতে?”
নীলাম বলে, “না, না, আমি কীভাবে বাজাবো আমার কাছে তো বাঁশি ই নেই আর তার চেয়ে বড় হলো আমি পারলে না বাজাবো! ” তরু হেসে বলে ওঠে,” তাই বলো! কিন্তু তুমি হঠাৎ বাঁশির কথা জিজ্ঞেস করলে তুমি শুনেছো নাকি??”
নীলাম বলে আসলে হ্যাঁ আমি কিছুদিন ধরেই শুনছি। কিন্তু কে যে বাজায় তা জানি না! এবার তরু একটু কনফিউজড হয়ে বলে কী বল আমি তো কোনোদিন শুনি নি, আর এদিকে এমন কোনো বাঁশিওয়ালা আছে বলেও তো জানি না! কারণ তোমাদের বিল্ডিংয়ের পরেই আমাদের বিল্ডিং আর তার পরে তো ওই যে বড় বালুর মাঠ আর মাঠের পর স্কুল তাহলে তুমি যেমন বলছো ক্লিয়ারলি শুনতে পাও, তা তো বেশি দুর থেকে হলে শুনতে পাওয়ার কথা না! নীলাম বলে আচ্ছা যাই হোক তুই যা এখন পরে কথা হবে একসময়! তরু চলে যায়।
বাসায় এসে নীলাম জানলার দিকে তাকিয়ে ভাবছে লজিক্যালি ভাবলে তো আসলেও এখান থেকে ওতো রাতে বাঁশির আওয়াজ শোনার কথা না। তাহলে কী আমি হ্যালুসিনেশন করসি? নাকি কেউ রাতের বেলায় ফোনে বাঁশির সুর শোনে? কিন্তু তাই বলে ওতো জোরে আর যে সুর টা ও যেন কেমন কোনো ট্রেডিশনাল কিংবা ক্যাজুয়াল না মনে হয় সত্যিই যেন কেউ আবেগ নিয়ে রাতের বেলায় বাঁজায়। তাহলে আর কেউ কেন শোনে না বাবাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, আমি পাগলের ডাক্তার হতে গিয়ে নিজেই পাগল হয়েছি। কিন্তু আজ তো তরু ও বলল শোনে না।তাহলে কী? এমন সময় একটা ক্ষীণ আওয়াজ ভেসেএলো, সবসময় এতো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাও ই বা কেন?
নীলাম চমকে উঠে ঘুরে তাকায়, ওমা কেউ তো নেই, তাহলে এক্ষুনি কেউ একটা কিছু বলল!তখনি আবার সেই অজানা স্বর বলে ওঠে, সবসময় এতো দেখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠো কেন? মাঝে মাঝে তো শুনতেও পারো! দেখা আর শোনার মাঝে এক অপার্থিব ব্যবধান রয়েছে—যেটা দেখেছি, সেটা যেন আগ্রহের রঙ হারায় তাই কৌতূহলী সত্তায় মরচেধরে যায়!
নীলাম, ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। ঘরে তো কেউ নেই তাহলে কে বলছে এসব?? নীলাম বলে ওঠে কে তুমি? কী হচ্ছে আমার সাথে!
হাসতে হাসতে অজানা সেই স্বর বলে,” আহ, নীলাম! নদীর নামে নাম তোমার, নদীর জলের মতো স্বচ্ছ- স্তব্ধ -শীতল বৈশিষ্ট্যেই তো তোমাকে মানায়।নীলাম অবাক বিস্ময় এ ভাবে এই স্বরের উৎস কী আমার জানা নেই। কিন্তু কেন জানি না, আমার আর সেই হাড় হিম করা ভয় টা অনুভব হচ্ছে না!
আবারও অদৃশ্য স্বর বলতে লাগলো কি এখন আর ভয় লাগছে না তাই তো? ভয় লাগবেই বা কেন আমি তো তোমারই অভিন্ন সত্তা!
নীলামের সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। সে প্রথমে ভাবে, না এসব তার কল্পনা কিন্তু তৎক্ষনাৎ শীতল এক ঝাঁকুনি শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, যেন বাতাস ফিসফিস করে কোনো গোপন কথা বলে গেল। এদিকে নীলামের কাল সেমিস্টার ফাইনাল, মনে মনে বলতে লাগলো কাল পরীক্ষায় কি লিখবো ভালো সিজিপিএ না থাকলে তো থিসিস ও করতে পারব না। এইসবের চক্করে আমার পড়াশোনা রিসার্চ কিচ্ছু হচ্ছে না! ঘরের মধ্যে কেউ বলে ওঠে কালকের পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা করো না ভালোই করবে।শুধু শেষ প্রশ্নটা ঠিকঠাকভাবে শেষ করতে পারবে না। তবে চিন্তা নেই তাতে তোমার থিসিস আটকাবে না!
নীলাম হকচকিয়ে বলে ওঠে তুমি কী করে জানলে আমি এসব ই ভাবছিলাম?
“আমি হয়তো তোমার সাব-কনশাস মাইন্ডের ই অংশ, আবার হয়তো না! “
পরদিন সত্যি ই নীলাম শেষ প্রশ্নটা সম্পূর্ন করতে না পারলেও এক্সাম মোটামুটি ভালোই হয়েছে! বাসায় ফিরে নীলামের মনে পড়ে যায় এমন টাই তো বলেছিল কাল!
” কী এবার আমার কথা বিশ্বাস হলো তো? তুমি যতই চাও আমাকে তুমি ভুলতে পারবে না, কারণ আমি যে এখন তোমার মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস থেকে অ্যামিগডেলায় মিশে গেছি,আর তুমি তো জানোই সেখানেই জমা থাকে সব স্মৃতি আবেগ! “
” হয়তো তুমি আছো, হয়তো তুমি নেই! তবুও তোমার উপস্থিতি যে আমার মন্দ লাগে না, তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। ” (নীলাম)
“কাল তোমার জন্য একি সাথে একটা ভালো ও একটা খারাপ অভিজ্ঞতা হতে চলছে! একটু সতর্কতা অবলম্বন করো”
নীলাম থতমত চেহারায় বলল, এমন কেন বললে? আর খারাপ দিকটাই বা কী?
“দেখলে মানুষের মস্তিষ্ক কেমন প্রথমেই নেগেটিভ ফ্রিকোয়েন্সি টা গ্রহণ করে! আমি কিন্তু বলেছিলাম একটা ভালো দিক আরেক টা খারাপ, ভালো অভিজ্ঞতা তো জানতে চাইলে না!”
আচ্ছা ঠিকাছে তবে আগে ভালো টাই না হয় বলো!
“কাল কাকতালীয়ভাবে তোমার এক পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে যাবে! কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত তার সাথে খুব বেশি ভালো সময় কাটানো টা হয়ে উঠবে না এই আরকি!”
নীলাম বলে, ওমা পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা হবে কিন্তু একসাথে ভালো সময় কাটাব না তা আবার হয় নাকি! আর এখন যখন আমি জেনেই গেছি যে আমার বন্ধুর সাথে দেখা হবে, এখন তো আমি আরও প্রিপারেশন নিয়েই যাব কালকে দরকারে আমি সিডিউলে অন্য সেরকম কোনো প্ল্যানই রাখব না!!
“তাই বুঝি? তা তুমি কী আদোও জানো ;কালকে কী হবে বা হতে চলছে? এমনও তো হতে পারে তুমি সব সরকম প্রিপারেশন নিয়ে গেলে তখনই একটা অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে গেল তোমার সাথে!”
নীলাম উৎকন্ঠার সুরে বলে, তুমি তো ভারী বাজে লোক! তুমি সবকিছু এমন ঘুরিয়ে পেচিয়ে বল কেন? আর তুমি কী ভাবছো আমি ভয় পাচ্ছি? মোটেই না বরং তোমার কোনো কথাই আমি বিশ্বাস করি না।
” প্রথমত আমি তো মানুষ নই তাহলে বাজে লোকই বা হবো কী করে বল! আর রইল বাকি বিশ্বাস! বিশ্বাস তো আপেক্ষিক! কখন কাকে বিশ্বাস করি, কখন অবিশ্বাস করি এর ওপর কী কারো হাত আছে? এ তো হলো কেবল ই এক অদ্ভুত অধরা অনুভূতি! “
উফ! তুমি আমাকে পাগল করে দিচ্ছো ক্রমে ক্রমে.. তুমি কে তাহলে? সাইকোলজির স্টুডেন্ট হয়েও আমি তোমার মিস্ট্রি উদঘাটন করতে পারছি না! শুধু তাই নয়, দিন দিন তুমি আমার মগজে মস্তিষ্কে মিশে যাচ্ছো, আশংকার ঘন্টা বাজিয়ে চলেছো প্রতিনিয়ত! আমি যতই চাইছি তোমাকে মাথা থেকে বের করতে, তুমি যেন ততই আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছো! কী চাও তুমি?

অস্ফুটস্বরে কেউ বলে উঠল,
“সমুদ্রের ঢেউ আসে, যায়… কিন্তু কেউ কি জানে অপর প্রান্তে ঠিক কী আছে?
হয়তো এক অন্য জগত কিংবা শুধুই শূন্যতা।
সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না—
ঠিক যেমন এই প্রশ্নটারও নেই সোজা উত্তর:
‘সমুদ্রের অপর পাড়ে কী আছে?’ ” আর সব সময় সব সত্যি খুঁজতে নেই!
আজ নীলামের লাস্ট এক্সাম! মনের মধ্যে আকাশ সমান উৎকন্ঠা – শংকা! সত্যিই কী আজ তার সাথে এমন কিছু ঘটতে চলছে যা গতকাল সে শুনেছিল? ভয় ভয় এক্সাম দিতে গেল নীলাম। এক্সামের প্রশ্ন দেখে খানিকটা আস্বস্ত হলো যে এই মুহূর্তের জন্য হয়তো তার কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা হবে না! কোনোভাবে পরীক্ষা দিয়ে বের হয় নীলাম। পরীক্ষা যেমন দিয়েছে তাতে মনে হয় না রেজাল্ট এর উপর কোনো ইফেক্ট পড়বে!
হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে বাইরে, কোনোকিছু না ভেবে বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে আর আনমনে কিছু একটা ভাবছে নীলাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেও তার চোখ চেপে ধরে বলল এত আকাশ পাতাল চিন্তা না করে, যা আছে বের কর! হকচকিয়ে পেছন ঘুরতেই নীলাম দেখে তার পুরানো এক বন্ধু!
বছর চারেক পর বন্ধু কে দেখে দুজনেই আবেগঘন হয়ে গেল।
“সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া সেই বন্ধুকে হঠাৎ সামনে পেয়ে দুজনেই থমকে গেলাম।
এক ঝটকায় যেন ফিরে এলো সব হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখ, রাগ, অভিমান… আর অজস্র না বলা কথা! ভাবলাম, যাক, আজকের দিনটা বেশ ভালোই কাটছে।
রিকশায় চড়ে শহর জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি দুজনে।
হাসি, গল্প, পুরোনো স্মৃতি — সব মিলিয়ে দিনটা যেন এক টুকরো বসন্ত।
কিন্তু হঠাৎ…
এক বিকট চিৎকার!

আমার হৃদপিণ্ড যেন এক লাফে হাতে উঠে এলো!
দেখলাম, বন্ধুর ওড়নাটা রিকশার চাকার সাথে পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস লেগেছে!
সে ছটফট করছে নিজেকে ছাড়াতে, কিন্তু যতই ছাড়াতে চায়, ততই যেন পেঁচিয়ে যাচ্ছে!

আমি রিকশাওয়ালাকে চিৎকার করে বললাম, “থামাও রিকশা!”
কিন্তু থামতে থামতেই বন্ধু আমার রাস্তায় পড়ে গেল!
নিজেকে তখন ভীষণ অসহায় লাগছিল। চোখের সামনে সব কিছু ঘটছে, অথচ কিছুই করতে পারছি না — যেন সবকিছুই আমার হাতের বাইরে…

কোনোমতে রিকশা থামিয়ে ওড়নাটা খুলে ওকে নিয়ে ছুটে চললাম হাসপাতালের দিকে।
সে ছটফট করতে করতে একসময় আমার হাতের উপর নিস্তেজ হয়ে গেল…
এক লহমায় যেন রঙিন মুহূর্তটা পরিণত হলো হিমশীতল বিভীষিকায়।
এমন সময় আমার কানে ভেসে এলো সেই অদ্ভুত, অস্ফুট আওয়াজ!
সেই ভয়াল শব্দ যেন বলছিল,
“বলেছিলাম না, আজকের দিনটা যতটাই আনন্দের হবে ঠিক ততটাই বিষাদময় হয়ে উঠতে পারে !”

আমার হৃদকম্পন যেন ৩৬ হার্জ বেড়ে গেল!
যে সুর একসময় মন ভরিয়ে দিত, এখন তা মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কিছুর আগমনী বার্তা —
একটা বিকট মুখ দাঁত, নখ বের করে ভয়ানক হাসি দিয়ে যেন আমায় ব্যঙ্গ করছে!

বন্ধুর এই অবস্থা, তার মধ্যে এমন বিভীষিকাময় হাসি —
আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম! মনে হচ্ছিল, এবার বোধহয় সব শেষ…
চোখ বন্ধ হয়ে যাবে আর সব অন্ধকারে ঢেকে যাবে।

কিন্তু কে জানে, কোথা থেকে যেন একটা পজিটিভ শক্তি আমায় বারবার জাগিয়ে তুলছিল!
মনে করিয়ে দিচ্ছিল —
“তোমায় জেগে থাকতে হবে, তোমার বন্ধুর জন্য!”
এই পজিটিভ এনার্জিটাই হয়তো বন্ধুত্বের পবিত্রতা, বন্ধুত্বের শক্তি!

হাসপাতালে পৌঁছলাম, ওকে ভর্তি করালাম।ডাক্তাররা দেখছেন, আর আমি অন্যান্য ফরমালিটিজ সম্পন্ন করছি।

এইসব করতে করতে আমার মাথায় আবার সেই অদ্ভুত কম্পন অনুভব হচ্ছিল।
চারপাশের শব্দ যেন আমার কানে পৌঁছাচ্ছে না, শুধু একটা বিকট আওয়াজ বারবার বাজছে!

আবার ও ভাবতে লাগলাম, এই শব্দের উৎস কী?
এটা কি কেবল আমার মনের ভুল?
নাকি আমি কি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি?
নাকি সত্যিই এই শব্দের কোনো অলৌকিক অস্তিত্ব আছে?

ঠিক তখনই আবার সেই অজানা সুর বলল,
“তুমি আমায় মাথা থেকে, মন থেকে সরাতে পারবে না — যতই চাও!
কারণ, তোমার কন্ট্রোল এখন আমার হাতে!
তুমি যতই বলো আমার অস্তিত্ব তুমি মানো না, তবু প্রতিনিয়ত আমায় ভয় পাও!
গতকাল রাতে যখন আমি তোমাকে আজকের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম, তখন তুমি আমায় বার বার জিজ্ঞেস করছিলে কী হবে? তোমায় আচ্ছাদন করেছিল অদ্ভুত এক শংকা! কারণ তুমি নিজের অজান্তেই আমাকে প্রবলভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে ছিলে!
সারাদিন যতই আনন্দ করো না কেন, তুমি বারবার থেমে যাচ্ছিলে — ভয় পেয়ে যাচ্ছিলে।
তাহলে বলো তো, আমি কি তোমায় নিয়ন্ত্রণ করছি না?”

নীলাম তখন যেন মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে মরীচিকার পেছনে ছুটছিল!

সে ভাবছিল, এই সুর এই স্বর কি কোনো super natural entity? সাধারণ মানুষের কাছে যার অস্তিত্ব নেই। তবে কী লৌকিকতার ভীড়েও থেকে যায় কিছু অলৌকিক স্মৃতি!
নাকি নীলাম নিজেই ধীরে ধীরে স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগী হয়ে উঠছে ? তাই বলেই কী সে এইসব হ্যালুসিনেট করছে? কোনো কল্পনার জীবন যাপন করছে?

লিখুন প্রতিধ্বনিতেলিখুন প্রতিধ্বনিতে

কিন্তু যাই হোক না কেন, নীলাম তীব্রভাবে অনুভব করছিল যে,
সে নিজের নিয়ন্ত্রণ অলক্ষ্যে তুলে দিয়েছে অন্য কারো হাতে — নিজের অজান্তেই।
নিজেকে বাঁচাতে, বাস্তবের চাপ থেকে পালাতে, সে যেন নিজের সত্তাটাকেই ছেড়ে দিচ্ছিল…

কিন্তু সত্যিই কি পালিয়ে বাঁচা যায়?
একদিন না একদিন, তাকেই এই সব কিছু ফেস করতেই হতো।

নীলাম জানে না এই সুর, এই সত্তার রহস্য কী।
কিন্তু সে বিশ্বাস করে ছোট্ট বেলায় পড়া The Alchemist গল্পের Paulo Coelho-র সেই কথা:
“When you want something with all your heart, that’s when you are closest to the Soul of the world. It’s always a positive force.”

হাসপাতালের করিডোরে নীলাম চুপচাপ বসে আছে।
ডাক্তার বললেন, “আপনার বন্ধু এখন বিপদমুক্ত তবে বেশ কিছুক্ষন শ্বাস রোধ হয়েছিল তো, তাই মানসিকভাবে ভীষণ ধাক্কা খেয়েছে।
ওর চেতনা ফিরলেও, চোখে যেন এক অদৃশ্য ভয় জমে আছে।”
নীলামের চোখে তখনো সেই দৃশ্য — বন্ধুকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা, ছেঁড়া ওড়না, থেমে থাকা নিঃশ্বাস…
তার ভেতরে নিঃশব্দে জমে গেছে সবটা!
না কাঁদছে, না চিৎকার করছে — কিন্তু ধীরে ধীরে এই নিস্তব্ধতা ই যেন ওর ভেতরটাকে দখল করে নিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের এক নার্স রিপোর্টের খামটা ওর হাতে দিয়ে গেল।

নীলাম অস্পষ্ট চোখে পড়ে দেখল —
“Patient shows signs of dissociation and auditory hallucinations. Recommend psychiatric evaluation.”
তার বুকের ভেতরটা যেন হালকা কেঁপে উঠল।
এই রিপোর্ট কার জন্য?

বন্ধুর?
নাকি ওর নিজের?

ঠিক তখনই, চারপাশের কোলাহলের মাঝখান থেকে যেন একটা নিঃশব্দ কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে উঠে আসে—
“তোমার ভয় পাওয়াটাই আমার অস্তিত্ব…
তুমি আমাকে তাড়াতে পারবে না,
কারণ আমি সেই তুমি…
যাকে তুমি সবচেয়ে বেশি লুকাতে চাও।”
নীলামের শরীরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
সে উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু পায়ের তলায় মাটি যেন নেই।
হাসপাতালের আয়নায় চোখ পড়ে তার।
— আয়নার প্রতিফলনে চোখদুটো যেন আজ বড্ড
অচেনা!
মুচকি হাসে নীলাম
একটা খুব নিঃশব্দ হাসি —
যেটা শুধু সেই আয়নাই দেখে।
[শেষ নয়! হয়তো এটাই আরেক শুরু… অথবা, সেই যাত্রা, যা শুরুই হয়নি কখনও।]”

প্রতিধ্বনি
প্রতিধ্বনিhttps://protiddhonii.com
প্রতিধ্বনি একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। শিল্প,সাহিত্য,রাজনীতি,অর্থনীতি,ইতিহাস ঐতিহ্য সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম কী ভাবছে তা এখানে প্রকাশ করা হয়। নবীন প্রবীণ লেখকদের কাছে প্রতিধ্বনি একটি দারুণ প্ল্যাটফর্ম রুপে আবির্ভূত হয়েছে। সব বয়সী লেখক ও পাঠকদের জন্য নানা ভাবে প্রতিধ্বনি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিভাবান লেখক আড়ালেই থেকে যায় তাদের লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মের অভাবে। আমরা সেই সব প্রতিভাবান লেখকদের লেখা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। আমরা চাই ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীনচিত্ত্বে তুলে ধরতে। আপনিও যদি একজন সাহসী কলম সৈনিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে স্বাগতম। প্রতিধ্বনিতে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলুন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments