নুজহাত তাবাসসুম ইপ্সিতা
৮ বছরের মিনির মনটা ইদানিং বেশ ভালো। কারণ মিনি তার মা-বাবা ও ছোট চার বছরের ভাই মিতুলের সাথে কিছুদিনের মধ্যে নতুন এক বাসায় উঠবে। সেই তো জন্ম থেকে আট বছর পর্যন্তই এক বাসাতেই মিনি রয়েছে। তাই বোধহয় খুশি টা একটু বেশি। কয়দিন কেটে গেল পরশুদিনই তারা নতুন বাসায় নতুন জীবন শুরু করতে চলেছে। তিন মাস আগে একটি শরদ দুর্ঘটনায় মিনি বাবা দুটো পায়ে চলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। মিনির বাবাকে সারাজীবন এখন পঙ্গুত্ব নিয়ে কাটাতে হবে।
আজ সকালে মিনি মায়ের সাথে বাজারে এসেছে। কিছু টুকটাক জিনিস নতুন বাসার জন্য প্রয়োজন।আগে মিনিদের সংসার খুব ভালোভাবেই চলত । কিন্তু মিনির বাবার সে দুর্ঘটনার পর থেকে তার চাকরিটা চলে যায় সবকিছু এখন মিনির মাকেই সামলাতে হয়। খুবই দুষ্টু এবং চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে মিনি। সে বাজারে এসে বারবার বলছে মা এটা নেব, ওটা নেব। মায়ের কি আর ইচ্ছে হচ্ছে না মেয়ের সব চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে? কিন্তু সংসারের সব খরচ সামলে এখন হাতে আর টাকা বাচলো কই?
তাই আজকের মিনির মায়ের মনটা খুব বিষন্ন থাকে। মিনিকে সংসারের দুর্দশার কথা বোঝাতে চাইলেও মিনি বুঝতে চায় না। মিনি ও তার মা বাজারে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে মিনির চোখ পরে একটা বড় জুতোর দোকানে। সেখানে সবার উপরের দিকে আছে মিনির পছন্দের রং বেগুনি রঙের এক জোড়া জুতো।
জুতো জোড়া দেখে মিনির যে কত ভালো লাগলো তা আর মুখে বলে প্রকাশ করা যাবে না। ওই জুতো ঝগড়া যে করেই হোক না কেন দুষ্টু মিনির চাই-ই চাই।মিনি তখন তার পরনের জুতোর দিকে তাকিয়ে দেখল,না জুতো দু’টো মোটামুটি ভালোই আছে। এই তো সাত মাস আগে কিনল।এখন যদি সে মাকে জুতোর কথা বলে তবে মা নিশ্চয়ই মানা করবেন।
তাই যখন মিনির মা দোকানে চাল,ডাল কিনছিলেন,তখন সেই ফাঁকে মিনি তার পরনের জুতোয় কাঁদা ও ময়লা লাগিয়ে জুতোজোড়া নষ্ট করে দেয়। হঠাৎ করে মিনি কান্না শুরু করে।তখন মিনির মা মিনিকে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে মা?কাঁদছ কেন?” মিনি বলল,”মা দেখনা,আমার জুতো কেমন নষ্ট হয়ে গেছে! “
মিনির মা বুঝতে পারলেন যে জুতোর এই খারাপ অবস্থা মিনিই করেছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও তার জুতো খুব ভালোই ছিল।
তবুও মিনির মা রাগ না করে বললেন,”এখন তুমি কি চাও মিনি?”
মিনি শেষমেশ বলেই ফেলল, “মা আমাকে নতুন জুতো কিনে দাও।”আমি যদি এই পুরনো জুতো পরে নতুন বাসায় যাই তাহলে নতুন বাসা নোংরা হয়ে যাবে।মা আমায় নতুন জুতো কিনে দাও। দাও না,দাও না মা।মা অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থাকলেন।নিশ্চুপ হয়ে।মা বললেন”,মিনি সোনা আজ হাতে টাকা নিয়ে আসিনি।তোমায় কিছুদিন পরেই জুতো কিনে দেব!”
মিনি কোনো কিছু না বলে মুখ ফুলিয়ে দৌড়ে চলে গেল।মিনির মাও সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে চলে গেছেন।হঠাৎ এমন সময় মিনির বাবার কল আসে।মিনির বাবা মিনির মাকে বললেন,”আমার ঔষধ গুলো শেষ হয়ে গেছে তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো।”
এমন সময় একটা ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ছোট্ট মিনি শেষ হয়ে যায়
কয়েক মাস পর,
মিনির মা মিনির কবরের সামনে মিনির পছন্দের বেগুনি রঙের জুতো নিয়ে বসে থাকেন।তাদের আর নতুন বাসায়ও যাওয়া হলো না।মিনির মা মিনির অপেক্ষায় আজীবন থাকবেন।পছন্দের জুতো কেনা তো হলো কিন্তু মানুষ টা হারিয়ে গেলো।
সব চাওয়া–পাওয়াই
একদিন পূরণ হয় জীবনে।
শুধু মানুষ হারিয়ে যায়
সময়ের ব্যবধানে!